আমার প্রিয় শিক্ষক
‘’শাস্তি কি শুধু এক হাতে ই নিবা ?? ‘’
ভয়ে ভয়ে বাম হাতটিও বাড়িয়ে দিলো ৫ম শ্রেণী পড়ুয়া মেয়েটি ............ এমনিতেই ডান হাতে ২বার চিকন বেতের পিটানি খেয়ে হাতটি জ্বলছিলো তার ............
‘’যাও এখন .........ঠিক মতো পড়াশুনা কর , বুঝছ ?? ‘’
বিমর্ষ মুখে পরীক্ষার খাতা হাতে নিয়ে নিজের বেঞ্চে বসলো মেয়েটি ......... ‘’এতো কি খারাপ করলাম যে ৩ টা বেত মারতে হবে ?? ‘’ ‘’ উফফু রে ......... ধুর ও ‘’ ‘’ থাক বাবা , ক্লাস এর সবাই তো বেতের অমৃত সাধ গ্রহন করছে , বাঁচলাম , বাসা থেকে কিছু বলবে না ............... ‘’
ক্লাস ৫ এর যে মেয়েটির কথা বললাম সেই অমৃত সুধা গ্রহণকারী মেয়েটি হলাম আজকের আমি .................. আর আমি যে শিক্ষক এর কথা বলছি , তিনি এখন পর্যন্ত আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক , আমি আমার আজকের জীবন পর্যন্ত যাকে শিক্ষকের আসনে বসিয়ে সবচেয়ে সম্মান করেছি , তার নাম রমিসা খানম , বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এর সিনিয়র শিক্ষিকা , আমার পদার্থবিদ্যার প্রথম হাতে খড়ি যার কাছে ............... যদিও পদার্থবিদ্যা থেকে এখন আমি অনেক দূরে .........
নবম শ্রেণীর প্রথম সাময়িক পদার্থবিদ্যা পরীক্ষা , অর্থাৎ জীবন এর প্রথম পদার্থবিদ্যা পরীক্ষা , যেখানে আমি সম্মান এর সাথে লিখিত অংশে ফেইল করলাম , কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার আমার একটুও মন খারাপ ছিল না , তার কারন আজ আমি জানি না ......... কিছুদিন পর বোধোদয় হল যে এই সাবজেক্টটাকে একটু সাইজ করা উচিত , কাঁচুমাচু মুখে হাজির হলাম ম্যাডাম এর কাছে , কাহিনীর সবটা সুনে ম্যাডাম বললেন , ‘’ তুমি তো অনেক ভালো ছাত্রী , এই অবস্থা কি করে হল ?? উত্তরে কি বলেছিলাম , তা ঠিক মনে নেই , তবে ম্যাডাম আমাকে পদার্থবিদ্যা পড়াতে রাজি হলেন ............
কাহিনীর শুরু হল যখন আমি দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় পদার্থবিদ্যায় সর্বাধিক নম্বর পেলাম , এর পর থেকে আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি , পরবর্তী জীবনে যত পদার্থবিদ্যা পরীক্ষা দিয়েছি সবগুলোতেই সর্বাধিক নম্বর পেয়েছি ............... পুরো কৃতিত্ব আমি আমার প্রিয় শিক্ষককে দেই ............
তিনি অনেক নিয়মনিষ্ঠ , সময়নিষ্ঠ , হাবিজাবি হেনাতেনা ছিলেন , এসব আমি বলতে চাই না , তবে এতুকু বলতে চাই উনি এমন কিছু কথা বলেছেন আমাকে যা আমি এখনও পালন করে চলতে চেষ্টা করি , আমার প্রিয় এই মানুষটি অনেক ধর্মভীরু ছিলেন, যেই গুনটি এখন আর খুব একটা দেখা যায় না ............
আমার দেখা প্রিয় এই মানুষটি একটি শিশুর উপর যে মায়া দেখিয়েছেন , সমাজের খুব কম মানুষ ই পারেন .....................
কোন একটা পরীক্ষায় জানি একটু কোন নম্বর পেয়েছিলাম , ম্যাডাম আমার ডান গালে কষে একটা থাপ্পড় লাগিয়েছিলেন , এরপর থেকে ওই সাবজেক্ট এও ........................ থাক , নিজের এত প্রশংসা ঠিক না ...............
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রায় শেষ দিকে এখন , ম্যাডাম এর সাথে এখন ও যোগাযোগ আছে , একজন মানুষের বড় হওয়ার পিছে যদি মা বাবার পর কেউ থেকে থাকেন , তবে তিনি হলেন একজন শিক্ষক , আমি জানি না আমি কতদূর যাবো , যদি অনেক দূরে যেতে পারি , তবে অবশ্যই আমার সফলতার ভাগীদার আমার এই প্রিয় শিক্ষক .........
এখন যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলো তে অনেক কম নম্বর পাই , তখন মনে হয় , ম্যাডাম এসে গালে ২ টা থাপ্পড় দিয়ে যেতেন .................. একজন শিক্ষক শুধু তার শিক্ষার্থীকে পড়াশুনা ই শিখাবেন না , জীবন চলার পাথেয় হিসেবেও কিছু শিখাবেন , রমিসা খানম সে দিক থেকে অনেক এগিয়ে আছেন ।
আমি আমার প্রিয় এই মানুষটির দীর্ঘায়ু কামনা করি ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



