আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ?? প্রায় চিৎকার করে উঠল জয়িতা । ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে থেমে গেল হুইলচেয়ার , পেছন থেকে সামনে এলো শুভ ।
আপনাকে কিছু কথা জানানো দরকার বোধ করছি ... , সামান্য ইতস্তত লাগছে শুভর ।
করিডোর ধরে এগিয়ে যাচ্ছে শুভ , জয়িতার হুইলচেয়ার ঠেলে নিয়ে ...............
ভাবনার রাজ্যে ডুব দিল জয়িতা ...... খুব বেশি দিন হয়নি কোম্পানি তে চাকরি শুরু করেছে , ছোট দুই ভাই , মা , নিজের খরচ তাকেই বহন করতে হয় । ছোট পোস্ট দিয়েই শুরু করেছিলো সে ...... ভাল কাজের জন্য সবাই তাকে সমীহের চোখে দেখে ...... কিন্তু সবকিছুই বোধহয় শেষ হয়ে গেল ........................
বিখ্যাত একটি এম এন সি এর জি.এম রায়হান চৌধুরী শুভ ......... যদিও বাবা কোম্পানির head , তারপরও নিজের যোগ্যতায় অনেক খানি পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন ২৭ বছর বয়স্ক মানুষটি , অবিবাহিত , বিয়ের জন্য পরিবার থেকে অনেক চাপাচাপি করার পরও রাজি হন নি ... খুবই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন , smart , dashing ( মেয়েরা যা পছন্দ করে আর কি ) , কলেজ , বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এ অনেক মেয়েই পিছনে ঘুরাঘুরি করেছে , নিজেও কম যান নি , সবাই কে নাচিয়ে ছেড়েছেন । শেষ পর্যন্ত অবশ্য একজনের জন্য দুর্বলতা অনুভব করলেও নিজের career এর কথা ভেবে পিছিয়েছেন , যদিও সেটা প্রধান কারন নয় ......... রুবির বিয়ে হয়ে যায় পরিবারের মতামতে ......... তখন কিছুই করার ছিল না তার । এরপর আর হয়ে ওঠে নি এসব নিয়ে চিন্তা করার ............ নিজের private firm আর চাকরি তেই ভালোভাবে মনোনিবেশ করেন ।
আর এদিকে ফারীন তাবাসসুম জয়িতা ......... সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাসকৃত ২৪ বছর এর তরুনী , সারাজীবন ই দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছে , খুব বেশি ভালো ফলাফল নেই কিন্তু আত্মবিশ্বাস এ ভরপুর , বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায় , সংসার চালিয়েছেন মা , এখন আর মাকে কষ্ট দিতে চায় না ......... ms করেই একটা private firm এ ঢুকেছিল , কিন্তু নিজেকে আরও অনেক বড় প্রতিষ্ঠানে দেখতে চায় সে ...............
কনফারেন্স রুম এ এসে ঢুকল শুভ জয়িতাকে নিয়ে , আমাকে এখানে কেন ......... থেমে গেল জয়িতা ............ পুরো রুম টা সুন্দর করে সাজানো ... বেলুন , ফুল , জরির ছড়াছড়ি সর্বত্র ......... accident এর পর এই প্রথম office এ এলো জয়িতা , শুভ সাহেব তাকে গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে এসেছেন , জয়িতা ভাবেনি কখনও এরকম কিছু হবে ............ হয়ত আর কখনও office এ আসাই হবে না ......... হয়ত বিদায় জানানোর জন্য ডেকেছে ............ আর ভাবতে পারছে না সে ...............
জানালার কাছে এসে বাম হাত টা নিজের পকেট এ ঢুকিয়ে দাঁড়ালেন শুভ , কিছু নিয়ে চিন্তা করছেন হয়ত ......... কনফারেন্স টেবিল এর কাছে জয়িতার হুইলচেয়ার রেখে কিছুক্ষণ হেঁটে জানালার কাছে স্থির হলেন ............ মিস ফারীন , আপনার সাথে আমার ফরমাল কিছু কথা ছিল আপনার চাকরি এর বেপার এ , আমি কি শুরু করতে পারি ?? গলায় অস্বস্তি তার ।
বুক টা কেঁপে উঠল জয়িতার ......... গলা শুকিয়ে গেলো মুহূর্তেই ......... কপালে ফুটে উঠল বিন্দু বিন্দু ঘাম ............ আর হয়ত বেশি সময় বাকি নেই office থেকে বের হবার ............... অজানা আশঙ্কায় ভরে গেলো তার মন ............
অবশ্যই স্যার , অবশ্যই ............ কাঁপা গলায় উত্তর দিল জয়িতা ।
আপনি আমাদের office এ মাত্র ১ বছর ২ মাস চাকরি করেছেন , আপনার fund এ তেমন কোনও টাকা জমা হয় নি যেটা দিয়ে আপনি আপনার চিকিৎসার খরচ চালাতে পারবেন ... থামলেন শুভ ।
I am sorry mr shuvo , এখানে আর কিছু এ করার নেই , patient এর যে অবস্থা , উনার তো tendon achilis মোটামুটি পুরোটাই damaged ………… কোনও সম্ভাবনা নেই যে উনি আগের মত আবার হাঁটতে পারবেন ...............
কিন্তু doctor , কিছু তো একটা করতে হবে ............ কোনও তো উপায় নিশ্চয়ই আছে ......... অশান্ত হয়ে গেছেন শুভ ।
বাংলাদেশ এ এর কোনও চিকিৎসা নেই ............ আপনি দেশ এর বাইরে চেষ্টা করে দেখুন ............
দরজার ওপাশ থেকে সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছে জয়িতা ............ চোখ থেকে নেমে এলো পানি ..................
হাসপাতাল এর স্মৃতি গুলো মনে এলো জয়িতার ............... বাস accident এ পড়েছিল ......... এরপর আর মনে নেই ............... চোখ খুলে আবিস্কার করে হাসপাতাল এ ......... হাত , মুখ এ stitch …………. কিন্তু বাম পা টায় জোর কেন নেই ............... কিছু বুঝার আগেই আবার ঘুমিয়ে গেলো সে ............
হ্যাঁ স্যার ......... আমার তো পা আর ভালো হবেও না ............... তাই ......... চোখে পানি জয়িতার ।
এক দৃষ্টি তে জয়িতা কে দেখছেন শুভ ............ আপনাকে দেশ এর বাইরে পাঠানো হবে company এর খরচে ......... যদি কিছু করতে পারে তবে তো ভালোই ......... থামলেন তিনি ............... আর দেশ এ ফিরে এসে আবার join করবেন আপনি ...... পা ভালো হোক আর নাই হোক ............... থামলেন তিনি ।
অবাক দৃষ্টিতে শুভর দিকে তাকালো জয়িতা ......... এরকম কিছু হবে, তার কল্পনাতেও ছিল না ............
আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন ...... আমি একটু আসছি ...... রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন শুভ ।
সব কিছু স্বপ্ন স্বপ্ন বোধ হচ্ছে জয়িতার ......... খুশি হবে না কান্না করবে কিছুই বুঝে উঠছে না সে ............ ভাবনার জগতে হারিয়ে গেলো যেদিন প্রথম দেখা হয়েছিল শুভ সাহেব এর সাথে ............
আপনি এই job কেন করতে চান ??
স্যার , এই ধরনের কাজ করতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি ...... আর family responsibility এর বেপার টা তো আছেই ......
বাইরে আরও ২৬ candidate বসে আছেন ......... আমরা কেন post টি আপনার জন্য নির্বাচিত করবো ?? আপনি তো তাদের মতই ......??
অবশ্যই স্যার , আমি তাদের থেকে খুব অন্যরকম কিছুই না ............ কিন্তু এই post এর জন্য আপনাদের আমাকেই select করতে হবে কেননা , এই post এ কাজে সাফল্য আমি তাদের থেকে অনেক বেশি আনতে পারবো ।
আপনি এর আগে অন্য একটি নামি দামী company তে কাজ করেছেন , ছেড়ে দেবার কারন টা কি জানতে পারি ??
কেনও নয় ?? কিন্তু সেটা জানতে হলে তো আমাকে আগে আপনার company এর appointment letter আমার হাতে থাকতে হবে ......... আর তারপরে ছেড়ে দেবার জন্য ঐ company এর সব দুর্বলতা আপনি জানতে পারবেন ......... হাসল জয়িতা ।
প্রশ্নকর্তা বিব্রত বোধ করলেও মুখে সেটা প্রকাশ করলেন না ... রায়হান সাহেব , এবার আপনার পালা ......... প্রশ্ন করুন , থামলেন প্রশ্নকর্তা ।
ভালো মত candidate এর দিকে তাকালেন ...... গায়ের রঙ শ্যামলাই বলা যায় , মাঝারি উচ্চতা , সাধারন পোশাক আসাক , smart বলা যায় ............ দেখি ques করে .........
আগামী ৫ বছর এ আপনি নিজেকে কোথায় দেখতে চান ??
জয়িতার মুখ শুভর দিকে ঘুরে গেলো ......... কেমন যেন একটু আনমনা হয়ে গেলো সে .........
৫ বছর তো খুব কম সময় স্যার ...... ততদিনে নাহয় আপনার post এই আসলাম ............ আর তারপরের ৫ বছরে company এর কোন part এর হেড হওয়ার চেষ্টা করবো ............... আত্মবিশ্বাসী জয়িতার উত্তর ............
ঠিক আছে মিস ফারীন তাবাসসুম ......... আশা করি আপনার সাথে আমাদের আবার দেখা হবে ......... হাসি মুখে বললেন শুভ ।
অনেক দিন পরে , দিনটা ছিল জয়িতার জন্মদিন , সকাল বেলায় নিজের ডেস্ক এ এসে অনেক গুলো গোলাপ দেখতে পেল সে , অনেক রঙের ...... বিভিন্ন আকারের ......... সাথে একটা কার্ডও ছিল ......... খুব খুশি হয়েছিল জয়িতা ...... কিন্তু পাশের ডেস্ক এর কলিগ দের কথা শুনে যখন বুঝতে পারল ফুলগুলো শুভ সাহেব পাঠিয়েছেন , মুখ অন্ধকার হয়ে গেলো তার ............ অফিস এর অবিবাহিত সব মহিলা কর্মচারী যেচে কথা বলে শুভ সাহেব এর সাথে ......... এক মাত্র বলে না সে ......
আপনাকে স্যার সালাম দিয়েছেন , ফারীন ম্যাডাম ......... পিয়ন বলে গেলো ......
হাত থেকে পার্স রাখার আগেই এত কিছু হয়ে গেলো ......... কি করবে বুঝে উথতে পারে না সে ............
আজ আপনার কি প্লান ?? special কিছু প্লান নেই ??
স্যার আমার মা হয়ত রান্না করবে আমার পছন্দের খাবার গুলো .........
আমি বলছিলাম ......... আপনার যদি আপত্তি না থাকে ............আমি আপনাকে নিয়ে কি আজ বাইরে লাঞ্চ করাতে পারি ?? রীতিমতো হিমশিম খেয়ে গেলো শুভ কথাগুলো বলতে যেয়ে .........
Sorry স্যার ......... সম্ভব নয় ............ আমি এখন উঠি ............ তাড়াতাড়ি রুম থেকে বের হয়ে গেলো সে .........
দরজা খোলার শব্দে আবার ফিরে এলো জয়িতা , শুভ সাহেব রুম এ ঢুকেছেন ......... তার এক হাতে একটি ডায়েরি , অন্য হাত পিছন দিকে ......
জয়িতার হুইলচেয়ার এর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন তিনি , হাতের ডায়েরি টা তিনি জয়িতাকে দিলেন ............ এটা আমার একমাত্র ডায়েরি , এখানে অনেক কিছু লেখা পাবে ......... আর ...... পিছনের হাত টা সামনে আনলেন তিনি , একটা গোলাপ আর একটা রজনীগন্ধা ফুল সুন্দর করে বাঁধা ......... এই ফুল আপনার জন্যে ......... উঠলেন তিনি .........
প্রচণ্ড রকম চমকে গেছে জয়িতা ... এরকম কিছু হওয়ার কি কথা ছিল ?? স্বপ্ন দেখছে সে ......... শুভ সাহেব পাগল হয়ে গেছেন ............ নাকি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এ সবকিছু অভিনয় .........
আমি আপনাকে জীবনসঙ্গী করতে চাই জয়িতা ......... আপনি একদিন বলেছিলেন ...... একজন জীবনসঙ্গী তার জীবনসঙ্গী কে পূর্ণতা দান করে ...... আমি আপনাকে পূর্ণতা দিতে চাই ......... আর আপনি তো অনেক দূর যেতে চান ......... আমি সবসময় আপনার পাশে থাকতে চাই ............
জয়িতার চোখ থেকে টপ টপ করে নোনা জল বেয়ে নামছে ............ কোলের উপর রাখা ডায়েরিটার পাতা উল্টে দেখছে সে ..................

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



