১ম পর্ব ২য় পর্ব ৩য় পর্ব
(গল্পটিকে এবার ছোট আকারের উপন্যাসের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। পূর্ববতী পর্বগুলোতেও কিছুটা পরিবর্তন আসবে)
আনাড়ী হাতে বৈঠা নিয়ে নৌকাটাকে নিয়ে গেলো পালবাড়ির বাগানের ভিতর। সাথে থাকা সঞ্জয় তখনও খুব হাসছে, যে হাসির শুরু হয়েছিলো বাগানের শুরুতে। বাগানের গাছের দূরত্ব বেশ আছে, তাই নৌকা চালাতেও অসুবিধা হেচ্ছ না। কিন্তু এবার যে বৈঠাটিই হাত ফসকে পড়ে গেলো। কোথা থেকে যেন একটা পেয়ারা জয়’র মাথায় এসে পড়লো। তা অবশ্য এখন নৌকাতেই পড়ে আছে। কিন্তু বৈঠা পড়লো পানিতে। পেয়ারার আগমন স্থলের সন্ধান না মিললেও একটা হাসির শব্দ জয়’র কানের কাছে এসেই মিলে গেলো। যেকোন কারণেই হোক হাসিটা বিঁধে গেলো আশ্চর্য স্বার্থকতায়। আমনমনা হওয়ার পুরো প্রমান জয়'র চেহারায় ফুটে উঠলো। সুযোগ বুঝে সঞ্জয়ও বলতে লাগলো - হে দাদা আপনিতো এখন পরী দ্বারা আক্রান্ত। বাঁচার কোন পথ নেই। এ পাড়ার সবচে’ দুষ্টু মেয়ের হাতে পড়লেন। ওপারে আর যেতে হবে না... এপারেই বসত গড়তে হবে। পরীর বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে জয় বললো - তুমিতো খুব রস করে কথা বলতে পারো! আমিতো ভাবতাম এপারে কোন রসই নেই, সব রস ভানু দা আর গোপাল ভাঁড়ের দেশে।
- চলো ফিরে যাই, সন্ধ্যা নামলো বলে।
- আরে না না দাদা; আর একটু সামনে যাই, তবে পেয়ারা খাওয়া যাবে”- ।
- পেয়ারা কি বাদুরে খাওয়াবে?
- কেন, বাদুরে খাওয়াবে কেন? পরী খাওয়াবে। কথাটি বলেই হো হো করে হেসে উঠলো সঞ্জয়। হেসেই থেমে নেই, নৌকা ভেঁড়ালো ফুলকুমারীদের ঘরের পেছনে পেয়ারা বাগানে। নৌকার মাথা ডাঙ্গায় উঠিয়ে যেই নৌকা থেকে নামতে গেল, অমনিই এক কুঁজো এসে অপ্রত্যাশিত অভ্যর্থনায় বিরক্ত করলো জয়’দের। অনিচ্ছায় হেসে উঠে প্রণাম সেরে নিজের পরিচয় দিতে গেলে তখনও কুঁজো কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হলো জয়। এবার কিঞ্চিৎ অবাকই হলো জয়। এ বুড়ো দেখি সবই জানে! তবে অবাক হলেও কোন সন্দেহের খোঁজে নামেনি জয়।
জয়’র দাদা এ গ্রামের পত্তন করেছিলেন, বেজায় ভালো লোক ছিলেন, কুঁজো তখন মন্দিরে কাজ করার জন্য দূর অশ্বদিয়া গ্রাম থেকে আসতো, প্রিয়লাল সেন একগ্লাস দুধ না খাইয়ে কুঁজোকে ছাড়তো না... এরকম কতো কথা বলতে লাগলো কুঁজো। জয়কে তো একপ্রকার জোর করেই এনে ঘরে বসালো। অবশ্য জয়ও এখন বিষয়গুলো আন্তরিকতার ছকে আঁকতে লাগলো। আবার কুঁজোর কথায় গভীরভাবে মনোনিবেশ করতেও পারছে না। কানের কাছে এসে মিলে যাওয়া হাসির শেষ রেশটুকুকে ধারণ করার প্রাণপন চেষ্টায় আছে। সেই হাসির জননীকে খোঁজার চেষ্টায় পুরো বাড়ির একটি ছায়াও যেন জয়’র দৃষ্টির অগোচর হচ্ছে না। একবার যদি মেয়েটিকে দেখা যায়! মেয়েটিকে দেখার ইচ্ছের পেছনে হৃদয় ঘটিত কোন কারণ নেই। তবে বিশেষ একটা কারণ তো অবশ্যই আছে। বাংলাদেশে আসার সময় বিমানবালার কর্কশ হাসি শুনে তার সমালোচনা করতে গিয়ে যে কথা শুনেছিলো , এখন সেই কথার প্রমাণ খুজতে লাগলো জয়। যেসব মেয়ের হাসি সুন্দর তারা নাকি দেখতে অতটা শ্রীযুক্ত হয় না। আবার যাদের হাসি সুন্দর নয়, তারা নাকি বেশ মনোরমা হয়। যদিও হাসি থেরাপী নিয়ে কাজ করার চাইতেও অধিক ম্যাচুরিটি জয়’র মাঝে আছে, তবুও বিদেশ বলেই হয়তো একটু ভিন্নতায় মনোনিবেশ ঘটিয়েছে।
কিন্তু কোনভাবেই তো হাসির কেন্দ্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একটা কিছুতো করতে হবে...। বুদ্ধি করে কুঁজোকে বললো-“ এ বাড়িতে মেয়ে নেই বোধহয়”। প্রতিবাদে দেরী করলো না কুঁজো। আরে কি যে বলো দাদু! পুরো পাড়ার সব মেয়ের রূপ এক করলে চোখে যে সুখ পাবে, তারচে’ ঢের সুখ পাবে আমার নাতনীর এক চোখে! এ কথা বলেই ডাকতে লাগলো- ফুলকুমারী... ফুলকুমারী... দেখে যা এ পাড়ার ভূমিপুত্র এসেছে। তোকে দেখতে চাইলো... আয় বুড়ি, তাড়াতাড়ি আয়। আশির্বাদ নিয়ে যা। যে মাটিতে চেরে বেড়াস সে মাটির ভোগ দিয়ে যা, পেন্নাম করে যা...। জয় কুঁজোকে বুজাতে চাইলো, সেতো ফুলকুমারীকে দেখার কথা বলেনি... কিন্তু শেষ শব্দটি উচ্চারণ করার আগেই পেয়ারা খেতে খেতে ফুলকুমারীর উদয় হলো। গালে জমা পেয়ার চিবানো অংশ পেটে পুরে দুহাত জোড়ে প্রণাম করে বললো- আমি ফুল কুমারী। বসা থেকে দাড়িয়ে গেলো জয়। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো ফু..ল..কু..মা..রী...। জয় তার পরিচয় দিতে গেলে কুঁজোটা আবার সেই পৌরাণিক কাহিনীর মতো ইতিহাস বলতে শুরু করলো। দাদুর এই তৎফরতায় ফুলকুমারী নিজেই ঠোট কুঁচকানো হাসি হাসতে লাগলো। কিন্তু তার প্রতি জয়’র বেশি আগ্রহ না দেখে সেও আর দাড়ালো না। চলে গেলো চঞ্চলতায়। আর ঐদিকে বিমানবালার মাথার চুলগুলো ধরে ভীষন ঝাঁকুনি দিতে ইচ্ছে হলো জয়’র। হাতের কাছে পেলে অবশ্য তারচেয়েও বেশি কিছু হয়ে যেতো। কি সব বাজে বকেছিলো মূর্খটা। ফুলকুমারীর হাসির সাথে চেহার হুবহু মিল। স্রষ্টা মনে হয় তার হাসির ভঙ্গি আর চেহারা একই সাথে সৃষ্টি করেছিলো। যময সৃষ্টি।
সান্ধ্যকালীন পুজোর উলুধ্বনী কানে বাজতেই উঠে দাড়ালো জয়। কুঁজোকে বলেই বেরিয়ে পড়লো ঘর থেকে। উঠোন পার হতে না হতে কুঁজো আবার ডাক দিলো। এবার খুবই বিরক্ত হলো, ভীষন একটা ভালোলাগায় ব্যঘাত ঘটিয়ে কুঁজোটা সত্যিই অপকর্ম করলো। হাসির শব্দ, চেহারা আর উলুধ্বনির মাঝে একটা সমান্তরাল রেখাপাত ঘটানোর প্রচেষ্টার শেষান্তেই ধ্যান বিচ্যুতি ঘটে গেলো। কুঁজো এক প্রকার দৌড়ে এসেই হাতে একটি পলিব্যাগে কতগুলো পাকা পেয়ারা হাতে ধরিয়ে দিলো। বললো- এগুলো হোটেলে ফিরে খাবেন। ফুলকুমারী নিজে খাওয়ার জন্য পেড়েছিলো, এখন আপনাকে দিতে বললো। পলিব্যাগটি হাতে ধরে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আগের চাইতে জোরেই হাঁটা দিলো জয়।
যখন খুব জটিল কোন বিষয়ে গভীর ভাবনায় মশগুল হয় তখন আর জোরে হাঁটা যায় না। জোরে হাটলে যেন ভাবনাতে কোন স্বাদই পাওয়া যায় না। তার উপর ভাবনা যদি হয় নারীর অঙ্গ বা রূপাঙ্গ নিয়ে। সৌন্দর্যটা যদি এখন জয়’কে এখন গিলে খেয়ে ফেলে তবে সঞ্জয় অবাক হলেও জয় কিন্তু কোন আফসোস করবে না। কারণ, এমনটি হতেই পারে। কৃষ্ণমহুরীর সৌন্দর্য যখন প্রত্যহ নৌকায় চড়ার অভ্যেস করিয়ে ছাড়লো, তখন এক রমনীর সৌন্দর্য যে খাদ্য তালিকায় পেয়ারার অন্তর্ভূক্তি ঘটাবে না তার নিশ্চয়তা কে দিবে? উচ্ছাসকে চেপে রাখার মাঝেও একধরনের কৃতিত্ব রয়েছে। আজ সেই চূড়া অবলীলায় অতিক্রান্ত করে জয়ানন্দ মাহারাজ হতে চাইছে প্রাণপনে। অবশ্য উচ্ছাস প্রকাশের ফুলকুমারী হয়তো পুরো রাতের জন্য ঘুমকে ছুটি দিতে পারতো। কিন্তু এখনও যে জেগে জেগে মধ্য রাত পার করে দিবে তা বলতে মহাজ্ঞানী হবার কোন প্রয়োজন নেই।
বহুবিধ ভাবনায় পড়ে রূপবিলাসী ক্ষণটাকে স্বল্পতায় রূপ দিতে কষ্ট হলো বৈকি। এ কষ্ট মেনে নিতে হয়, কারণ কুঁজোর আচরণে স্বার্থের একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তার উপর সঞ্জয় বললো, কুঁজো নাকি ভারী শয়তান প্রকৃতির লোক। কিন্তু জয়কে দিয়ে কোন ধরনের শয়তানি করতে পারে? অবশ্য বিষয়টা যদি নাতনীকে নিয়ে হয় তবে, বাড়িতে একটা নারায়ন সেবা দিতে আপত্তি থাকার কথা নয় জয়’র। কারণ এতোক্ষণে হাসি-চেহারা-উলুধ্বনি-সংসার এভাবেই একটা প্রান্তরেখার অংকন হয়ে গেছে। যদিও বিষয়টা সেরকম নাও হতে পারে। কিন্তু কুঁজোর ভেতরের রহস্যটা কি ধরনের? কেনই বা সে এতো আগ্রহী জয়’কে নিয়ে?
......চলবে
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


