মোটামটি অভ্যস্থ হয়ে উঠলাম নুতন জীবনে। আরেক অর্থে বলা যায় খাপ খাইয়ে নিতে হলো। শুধু মনটা বিদ্রোহী হয়ে উঠতো কোম্পানী তথা মিসরীয় ফোরম্যান এবৎ তার কয়েকজন চামচাদের (যারমাঝে বাঙ্গালীও ২/৪জন ছিল) সারাক্ষন খবরদারী করতো। অফিসে ব্যাপারটা মেনে নেওয়া যায় কারন ভাষার সাজুজ্য। যেখানে আমরা প্রায় সবাই ইয়েস,নো,ভেরীগুড এর মত। তাই অফিসের নিয়ম,কাজের ধরন,এমনকি চলা-ফেরাও ওরাই নিয়ত্রন করতো। কিন্তু গাড়িতে ভাল সীটগুলি,বাসায় এলে বাথরুম,পাকঘর ওদের আগে ছেড়ে দিতে হবে এটা অনেকেই মেনে নিতে পারলো না। পরিনতিতে ঝগড়া-বিবাদ প্রায় নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাড়ালো। যুক্তি ওদেরও ছিল। কারন আমাদের ডাল,ভাজি বা মাছ-মাংস যাই হোক না কেন তা হতো তেল-মসল্লায় কড়া কষানো আর ডালের বাগাড় দিলেতো কথাই নেই। বিল্ডিংতো দুরের কথা,সামনের রাস্তায়ও তার ঘ্রান ছড়িয়ে পড়তো। অন্যদিকে মিসরী তথা আরবী রান্নায় তেল-মসল্লার বালাই নেই। তেলের ব্যবহার থাকলেও কষানোর মামলা নেই।তাই তাতে থাকতো না কোন ঘ্রান। তাই ওরা আগে-ভাগে শেষ করে,দরজা আটকে বসে থাকতো। আর ওরা ভাতও তেমন খায় না। মুল খাওয়া আরবীতে খবুজ(রুটি),(পনির জাতিয়) জীবনা,লেবানেহ,আর ফলমূল। মাংস শুধু সিদ্ধ করে টমেটোর পেষ্ট। ব্যাস এই। এখন ভাবি সংখ্যালঘু না হলে আমাদের অর্ধেক না খেয়েই মারা যেতাম। কারন আমাদর রান্নায় যে,মনের মাধুরী মেশানো থাকতো। সচরাচর রান্নার বাহিরেও প্রায় প্রতিটি জেলারই রান্নার নমুনা এক বিল্ডিংয়েই পাওয়া যেতো। মাঝে একটা কথা না বললেই নয়। আমাদের কফিল মানে কোম্পানীর মালিক ভদ্রলোক মাঝেমধ্যেই নিজে চলে আসতেন আমাদের দেখতে। শুনতেন অনুযোগ। সমাধান করে দিতেন,সাধ্যমত। যা আজকাল বায়নোকুলার দিয়ে খুজলেও পাওয়া যাবে না। বর্তমানের ৯৯%ভাগ মালিকই তার কোম্পানীর ভার মিসরীয়,লেবনানী,সিরিয়ানদের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজেরা ইউরোপ,আমেরিকায় ঘুড়ে বেরাচ্ছেন। আর উল্লেখিতরা ভাষাগত জটিলতা বলি আর সংখ্যাধিক্যের কারনেই বলি,কিছু বাঙ্গালীদের প্রজেক্ট ম্যানেজার,ইনচার্জ, আর সুপারভাইজার বানিয়ে মাছের তেলে মাছ ভেজে নিজেরা ধরা-ছোয়ার বাহিরে থেকে যাচ্ছে। আর উল্লেখিত বাঙ্গালীদের অবস্থাও উজার করে দে মা, লুটেপুটে খাই এর মত। সাধরন শ্রমিকরা ছুটিতে যাবে নিদেনপক্ষে ২০দিনার ঘুষ না দিলে হবে না। পাসপোর্ট প্রতিটি কোম্পানী নিজেদের কাছে রাখে বলে তা আনতে গেলেও আবার সেই ঘুষ। ক্ষেত্রবিশেষে ৫০ দিনার জমা রাখতেও হয়। সময়মত না এলে এই টাকা স্যারদের পকেটে। বিশীর ক্ষেত্রেই এটা হয় কারন স্বল্পবেতনের কারনে ৪/৫বছরের আগে কারো যাওয়া হয় না তাই গেলেও সবাই নির্দিষ্ট সময়ে ফিরতে পারে না। তবু প্রিয়জনদের সান্নধ্যের কারনে এই ক্ষতিটুকুও সবাই হাসিমুখে মেনে নেয়। যাক এসব কথা। এতো লিখতে গেলে মহাভারতও হার মানবে বিধায় বিরত থেকে নিজের কথায়ই ফিরে যাই।
অফিসে আমার কাজে সবাই খুশী। একদিন অফিসের ডাইরেক্টর আমাকে ডেকে বললেন মন্ত্রী স্বয়ং আমার সাথে কথা বলতে চান। ভয় পেয়ে গেলাম। তবুও বলির পাঠার মত দুরু দুরু বক্ষে রুমে ঢুকলাম। সাথে ডিরেক্টরও। কিন্তু স্যারের মুখে মৃদু হাশি দেখে একটু ভরসা পেলামা নামটা আগে থেকেই জানতেন তাই সেদিক বাদ দিয়ে পারিবারিক আর শিক্ষাজীবনের কথা টুকটাক জিজ্ঞাসা করলেন আমিও বললাম। কথাবার্তা চলছিলো ইংরেজীতেই। উনি আবার একজন ডক্টরেট ডিগ্রীধারী। সুতরাং ইংরেজীর জ্ঞান যথেষ্ট। আর আমার দৌড় নটরডেমে যতটুকু শিখেছি। মনে পড়ে গেল প্রিন্সিপাল ফাদার পিসাতোর একটি অমোঘবানী। বারবার উনি বলতেন “ইংরেজী যা জান,তা কথাবার্তা চালানোর জন্য যথেষ্ট। শুধু মুখে আসে না। এরজন্য চর্চার দরকার। আয়নার সামনে অথবা বাসায় টুকটাক করে বলতে থাকলে দেখবে একদিন ঠিকই ভাষাটা রপ্ত হয়ে যাবে”। তাও হয় নি। বাসায় বললে ভাই-বোনরা আর বাহিরে বললে বন্ধুরা হাসাহাসি করতো। এখানে তা কাজে লেগে গেল। কেউ ব্যাকরনের ভুলও ধরে না বা পারে না তাই হাসেও না। সুযোগ পেয়ে অফিসে কুয়েতীদের সাথে ইংরেজীর এক্সপ্রেস ট্রেন ছেড়ে দিতাম। ফলাফল কিছুদিনের মাঝেই পেলাম। যাইহোক সেদিনের সাক্ষাৎকার শেষ হতেই বাহিরে এসে হাফ ছাড়লাম দুজনেই। কারন এই ৬মাসের মধ্যেই ডিরেক্টরেরও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলাম ব্যাবহার আর কাজের গুনে।
দেখতে দেখতে ৯২ শেষ হয়ে ৯৩র মাঝামাঝি হয়ে এলো। নিয়মানুসারে মন্ত্রনালয়ের সাথে কোম্পনীর চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে এলে কফিল রিনিউ করতে রাজী হলেন না চুক্তির অর্থের পরিমান নিয়ে। ভদ্রলোকের যুক্তি হলো কাজের ছয়মাসের মাথায় আমি আমার ষ্টাফদের বেতন ১০দিনার করে বাড়িয়ে দিয়েছি। আর এই টাকাটা গেছে আমার লাভের অংশ থেকে। আর আজ যদি একবছর পর আরো ১৫/২০ দিনার না বাড়াতে পারি,তাহলে এই ব্যাবসাই আমি ছেড়ে দেবো নিজের সন্মানরক্ষার্থে। ভদ্রলোক অবশ্য এমনিতেও বিরাট ধনী। এই কোম্পানী ছাড়া তার আরো ৮/১০টি প্রতিষ্ঠান ছিল। তবে চুক্তি অনুযায়ী মন্ত্রনালয়কে তিনমাসের সময় দিয়ে রাতে ব্যারাকে এলেন। আমরা প্রায় সবাই অনাগত দুরবস্থার কথা ভেবে চিন্তিত। সবাইকে ডেকে অভয় দিয়ে বললেন কাজ ছেড়ে দিলেও তোমাদের আর এই ব্যারাক আমি ছাড়ছি না। তোমরা নিজেদের পছন্দমত কাজ খুজে নাও আমি তানাজুল মানে ট্রান্সফার লেটার সই করে দেবো,যেকোন সময়। শুধু আর্থিক দিকটা তোমরা নিজেই ব্যবস্থা করবে। ৫জন থাকা পর্যন্ত এই ব্যারাক তোমাদের ছিল,থাকবেও। ভাড়া আমার। অনেককে সেদিন খুশীতে কাঁদতে দেখেছি। যা এখন কেউ স্বপ্নেও দেখবে না। এমনকি বলার পরও কুয়েতপ্রবাসী পাঠকরা বিশ্বাস করতে চাইবে না। তাই কোম্পানীটির নাম আগেই জানিয়ে দিচ্ছি তাদের জ্ঞাতার্থে হাবিব বেদের ক্লিনিং কোঃ।। খাইতান নামক স্থানে অবস্থিত ছিল। তবে সে সময়ের নামকরা কোঃগুলির মাঝে ছিলো আল আওয়ার্দী, আল আলামিয়া, কুয়েত প্রিচার্ড এবং ওয়ায়েল আল নিসফ বা নসীব।। তবে ম্যানেজম্যান্ট, এ্যকোমেডশনের দিক থেকে কুয়েত প্রিচার্ডের তুলনা ছিলো না।
যাক কফিল তো যা বলার বলে বিদায় নিলেন। এখন এই তিনমাস পর আমাদের দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে। কেউ কেউ নিশ্চিন্ত পারটটাইম জবের ওখানেই চলে যাবে বলে। কেউ কেউ ভাল কাজের সন্ধানে লেগে গেল। মানে মূলকথা যা করার এই তিনমাসের মধ্যেই। পেলে ভালই না হলে অন্ততঃ রুটি রুজিরতো ব্যাবস্থা করতে হবে। আমি শুধু ক্যামেরা,লাগেজ কেনার প্রস্তুতি নিলাম। কেননা এমন স্থান ছাড়া অন্য কাজে আমার মন বসবে না। তো ক্যামেরাটাই সবার আগে কিনে একদিন অফিসে নিয়ে গেলাম। উদ্দশ্য যাদের সাথে,যে পরিবেশে এতদিন কাজ করেছি তা সেলুলয়েডের ফিতায় আটকে রাখা। এক এক করে সবার সাথে ছবি তুলছি দেখে এ্যাসিস্টেন্ট ডিরেক্টর (নাম ঈশা সালেহ আল জামাজ) জানতে চাইলেন ব্যাপরটা। বললাম বস আর মাসদয়েকের মধ্যে চলে যাচ্ছি তো-তাই। কারন জানতে চাইলে সব খুলে বললাম সাথে এও জানালাম কোম্পানীর জবে আমি আর মানসিক শান্তি পাবো না। কারন সেখানে এটা করো,সেটা করো অর্থাৎ নিজস্ব স্বকীয়তা বলতে কিছুই থাকে না। আর বেতনটাও একটা ফ্যাক্টর। উনি বুঝলেন আমাকে। শুধু বললেন ভাল সুযোগ পেলে কি করবে। জানালাম তাহলে থাকার কথা চিন্তা করতে পারি। ডিরেক্টর এবং মন্ত্রী মহোদয় দুজনেই তখন দেশের বাহিরে। ঈশা বললেন ওরা আসা পর্যন্ত যেভাবে কাজ করছো,করে যাও। ব্যাস পুরো কোম্পানীতে রটে গেল আমার চাকুরী হচ্ছে। এমনকি মিসরী যে কয়জন ছিল সবাই শুভেচ্ছা জানিয়ে না না প্রশ্নে ব্যাতিব্যাস্ত করে তুললো। এই আশ্বাসটাই যে চাকুরী হবার প্রথমধাপ তখনই তা অনুধাবন করলাম।
ডিরেক্টর এবং মন্ত্রীমহোদয় আসার পর ঈশা আমাকে সাথে নিয়ে ঢুকে সব খুলে বললেন। ডিরেক্টর আমার সার্টিফিকেটের কথা জানতে চাইলে বললাম কাল আনতে পারবো। নিয়ে এসো বলে একটা ধরিয়ে দিলেন। দুপুরে বাসায় এসে খাওয়ার আগে অযত্নে ব্যাগের এককোনে ফেলে রাখা সেগুলি বের করে পরমযত্নে হাত বুলালাম। এই একবছরের মধ্যে এগুলির কথা কেউ জানতে চাইলো। কোন গুরুত্বই ছিল না এতদিন এগুলির। মুড়ি-মুড়কি একদামের মধ্যেই ছিলাম।
সাথে করে নিয়ে দিলাম পরের দিন। উনি অফিসের মন্দুপ (অর্থাৎ যে অফিসের বাহিরের কাজগুলি করে), তার হাতে দিয়ে আমাদের দুতাবাস থেকে সত্যায়িত করে আনতে বললেন। সেদিন হলো না,পরের দিন সব শেষ করে উনার হাতে দেওয়ার পর একটু মুচকি হাসি দেখতে পেলাম বলে মনে হলো। পাসপোর্ট এবং সিভিল আই ডির ফটোকপি অফিসেই ছিল। টাইপিষ্টকে বলে দরখাস্ত টাইপ করে এনে আমার স্বাক্ষর নিয়ে সোজা মন্ত্রীর রুমে ঢুকলেন। আমি তখন টেনশনে একাকার। পুলিশের দৌড়ানীও ডাল-ভাতের মত লেগেছে তখন। পনের মিনিট পর হাসিমুখে বেড়িয়ে আমাকে ডেকে জানালেন মন্ত্রীর স্বাক্ষর হয়ে গেছে,মানে আজ থেকে তুমি আমাদের লোক। কাল ট্রান্সফার লেটার নিয়ে তোমার কোম্পানীতে পাঠাবো কফিলের অনুমোদন আর পাসপোর্টের জন্য। সাথে শুভেচ্ছাও জানালেন। আমি জানতাম আমার এই উপকার করতে পেরে পুরো অফিসই ভীষন খুশী। কেউ পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে,কেউ হাত মিলাচ্ছে। আর মেয়েরা সবাই হেশে স্বাগতম জানালো। অন্ধকার থেকে নুতন জীবনের আলো শেষ পর্যন্ত ধরা দিল। যা কল্পনারও অতীত ছিল দুইদিন আগেও।
……………………..চলবে…………………………..

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


