কম্পানীর ব্যারাক ছেড়েতো নুতন বাসায় উঠলাম কিন্তু মনটা পড়ে রইলো সেখানেই। একসাথে খাওয়া,গল্প করতে করতে ঘুম আর একধরনের বুনো উদ্দামতা আর পাই না। একই অনুভূতি মিজান,রাশেদেরও। ওরা অন্য কম্পানী থেকে এসেছে। কথায় কথায় উঠে আসেও সেই কথা। তিনজন তিন কম্পানীর। জানলাম অন্যসব কম্পানীর কথাও। অয়েল আল নসীব(Wael al-nisf),কুয়েত প্রিচার্ড,আল আওয়ার্দী,আল আলামিয়া,তানজিফকো ক্লিনিং,ন্যাশনাল ক্লিনিং ইত্যাদি ছিল তখন কুয়েতের নামকরা কম্পানীগুলির অন্যতম। জিনিসপত্রের দামও কম থাকাতে তখন যে ৪০ থেকে ৬০দিনার যারা বেতন পেত তার সাথে পার্টটাইমের বেতন মিলিয়ে সবার মোটামুটি ভালই চলে যেত। কিন্তু পর্যায়ক্রমে এই দিন আর রইলো না। ধীরে ধীরে নিত্যসামগ্রীর দাম বাড়তে লাগলো। যে দুম্বার মাংস কিনেছি হাড়ছাড়া ৬০০ ফিলসে (মানে পয়সায়,১,০০০ফিলসে ১দিনার ),আর হাড়সহ ৪০০ ফিলসে, তা ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে আজ তিনদিনার প্রতি কে.জি তে এসে দাড়িয়েছে। কিন্তু কোন কম্পানীই শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দিকে নজর দেয় নি। এরমাঝে জন্ম নিল অনেক নুতন নুতন কম্পানী,যাদের কাছে ভিসা বিক্রয়সহ মুনাফাটাই ছিল মূল।সাথে কিছু বাংলাদেশীও নিজেদের স্বার্থের খাতিরে যোগ দিল। এযেন ঠিক “কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার”মতই। প্রায় প্রতিটা কম্পানীতেই মূল পরিচালনাকারীরা হতো মিসরী,সিরিয়ান বা লেবাননী সহ আরবী ভাষাভাষীরা। আর শ্রমিকদের পরিচালনা করার জন্য ম্যানেজার,সুপারভাইজার,প্রোজেক্ট ইনচার্জ ইত্যাদি মুখরোচক নামে অভিহিত পদস্থ কর্তারা। যাদের প্রায় বেশীর ভাগেরই প্রধান কাজ ছিল কিভাবে শ্রমিকদের ওভারটাইমের টাকা না দিয়ে,বেতন কমিয়ে কম্পানীকে লাভ দেখিয়ে নিজের সুব্যাবস্থা করা।।
ধীরে ধীরে এটাই নিয়ম হয়ে দাড়ালো। এই সুদুর প্রবাসেও সুযোগপ্রাপ্ত ব্যাক্তিরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে ছাড়তো না। পাসপোর্ট রিনিউ করার জন্যও ঘুষ দিয়ে আনতে হতো। তারপর ছুটিতে যাবে তারও নিস্তার নেই,ঘুষ। দুদিন দেরী করে এলে জরিমানার নামে পরবর্তি বেতন থেকে টাকা কেটে নেওয়া। বলা যায় মহামারীর মত ছড়িয়ে পড়লো। এর মাঝে আমি এও দেখেছি আল তৈয়ীক নামের কম্পানীটির বাঙ্গালী ম্যানেজারের নিজস্ব জেলখানাও ছিল।অবাধ্য শ্রমিকদের সেই রুমে বদ্ধ করে রাখা হতো সোজা না হওয়া পর্যন্ত!!আর সামান্য সুযোগ-সুবিধার লোভে তাকে সহযোগীতা করার লোকেরও অভাব ছিল না!!!ধীরে শ্রমিকদের মাঝে বিক্ষোভ শুরু হলো।তুষের মত জ্বলতে জ্বলতে কয়েকবছর আগে তা বিস্ফোরিত হলো। বাঙ্গালী ব্যারাকগুলি সহ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে তারা বিক্ষোভে ফেটে পড়লো।প্রায় সব কয়টি কম্পানীর লোকই যোগ দিল এই বিক্ষোভে। প্রথমদিকে নিজ নিজ ব্যারাক এবং নিজ লোকদের বিরুদ্ধে ছিল বলে এখানকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি বে-আইনী হওয়া সত্বেও কিছু না বলে শুধু দেখেই যাচ্ছিলো।প্রথমে ধর্মঘট,বিক্ষোভ থেকে তা নেমে পড়লো রাস্তায়ও। ব্যারাকের সামনে বা রাস্তায় রাখা এই ম্যানেজার,সুপরভাইজারদের গাড়ী উল্টে দেওয়া সহ কিছু ক্ষেত্রে আগুন ধরানোর ঘটনাও ঘটলো।এই পর্যন্ত পুলিশ প্রকারান্তরে তাদের সহযোগীতাই করে আসছিলো।চারিদিকে ময়লার স্তুপ,অফিসে চা দেওয়ার লোকও নেই।এককথায় বলা যায় সমগ্র দেশটা যেন থমকে দাড়িয়ে গেল। বিক্ষোভ এবং এর ধরনও দিনদিন বেড়েই চললো।সাথে কম্পানীর চামচাদের বেধরক পিটানীসহ সহিংস্রতা যখন তুঙ্গে,সেসময় পুলিশ সহ আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে নামলো। হয়তো মালিকপক্ষ তথা প্রভাবশালীদের চাপেই হোক বা আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রনেই হোক,তারা নেমেই শুরু করলো বেধরক গ্রেফতার। কেউ বাদ গেল না। অভিযুক্ত কিছু ম্যানেজার,সুপারভাইজার আর তাদের চামচা কেহই বাদ গেল না। এমনকি নীরিহ লোকও। জালে যে ধরা পড়লো তাকেই জেলে। এমন লোকও আছে যে কিনা ডিউটি করে আসার পথে,বা রুমে ঘুমন্ত অবস্থায়,বা শুধু দেখতে চাওয়া অবস্থায়।আর পরের দিকে জেলে না রেখে শুরু হলো পাইকারী ডিপোর্টেশন।যে, যে অবস্থায় ধরা পড়লো তাকে তর দেশে সেই এক কাপড়েই পাঠিয়ে দেয়া হলো।পড়ে যারা ছিল তারা চেষ্টা করে তাদের জিনিষপত্রগুলি পাঠিয়ে দিয়েছিল সাধ্যমত। পাঠকদের অনেকের কাছে বোধহয় সেদিনের স্মৃতি এখনো জাগরুক। বিশেষ করে যারা সময়ের এই হতভাগাদের টিভিসহ মিডিয়াগুলিতে দেখেছেন।ঘটনাটা সেসময়ে আলোড়ন তুলেছিলো বাংলাদেশে। এদেশেও।। আইন-শৃংখলা রক্ষার সাথে সাথে এদেশীয় সরকার দৃষ্টি দিল মূল ব্যাপারটি তথা বেতনসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দিকে। করা হলো অনেক আইন। তারমাঝে বেতন ৬০দিনারের কম হবে না(মানে ক্ষেত্রবিশেষে তা তিনগুনে দাড়ালো)বেতন তদারকিতে বাধ্যতামূলক ভাবে ব্যাংকে প্রত্যেক শ্রমিকের নামে এ্যাকাউন্ট খুলে,সেখানে জমা দেওয়া। ব্যারাকের তথা থাকার উন্নতিসহ বিভিন্নদিক। যা ছিল শ্রমিকদের অনেকদিনের দাবী। কয়েকহাজার দেশে ফিরে গেলেও তাদের এই ত্যাগের সুফল ভোগ করছে বাকী প্রায় বর্তমান হিসাবমত প্রায় ১,৫০,০০০লক্ষ শ্রমিক। কিন্তু দুঃখজনক এই ঘটনার সমাপ্তি টানছিও দুঃখজনক ভাবেই যে,আজ আর তাদের কথা কেউ মনেও করে না।যাদের ক্ষোভ আর আন্দোলনের সুফল আজ যারা পাচ্ছে, তাদের কথা বলছি। দুঃখ নিয়েই বলতে হচ্ছে সেই পুরাতন কথা,নুতনভাবে “বাঙ্গালী সবকিছুই খুব অনায়াসে-সহজে ভলে যায় নিজের দুঃখ-দুর্দশা,অত্যাচারীত হবার কথা। সাথে যাদের ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে তার সুদিন আসে,তাদের কথাও”।।
আজও অনেক কম্পানীগুলিতে অন্যায়-অত্যাচার আছে,তবে তা আগের মত মহামারীর রূপে না।এমন অনেক কম্পানী এখনও আছে যারা ছুটির সময়,রেসিডেন্স পারমিট বদলের সময়(তানাজুল)শ্রমিকদের সার্ভিস বেনিফিটের টাকা না দিয়ে উল্টো শ্রমিকদের কাছ থেকে “সম্পুর্ন পাওনা বুঝিয়া পেয়েছি যা আবার বিচার বিভাগ থেকে সত্যায়িত করে নেওয়া” নোট নিয়ে নেয়। বেশীর ভাগ অশিক্ষিত,দরিদ্রলোকগুলি পরিবারের সান্নিধ্য পাওয়ার ব্যাকুলতায় বা ভবিষ্যত সুফলের আশায় এই নোট দিতে দ্বিধা করে না। আইনে এসবই তার পাওনা,ন্যায্য অধিকার। কারন দুবছরের বেশী কোন শ্রমিককেই কম্পনী আটকে রাখতে পারে না।(কিন্তু আইনী জটিলতা এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই আইন না জানা,সাহসের অভাব,দীর্ঘসুত্রিতার কারনে কেহই এই পথ মাড়ায় না। তবে মাঝে মধ্যে এর ব্যাতিক্রমও দেখা যায়।) যদি না তা আকদ হুকুমা বা প্রোজেক্ট ভিসায় আনীত লোক না হয়। এটা ভিসার ক্যাটাগরির একটি। আমাদের সাধরনের কাছে ভিসা মানে ভসা অর্থাৎ ছাড়পত্র। কিন্তু না। এখানেও রকমভেদ আছে। উট-ঘোড়া,তথা পশুপাখী পালনের জন্য যে ভিসা তার নম্বর হয়ে থাকে ২০।কম্পানীর ভিসা হয়ে থাকে ১৮ নম্বর। আর সরকারী কর্মচারীদের ১৭ নম্বর। ফ্যামলী ভিসা মনে হয় ২২ নম্বর।
এরমাঝে কিছু কিছু মালিক তার কাজের লোকের জন্য ভিসার আবেদন করলে সরকার তাকে সে অনুমতি দেয়। কিন্তু শর্ত থাকে যে ২/৪বছর পর কাজ ফুরালেই কম্পানী তাকে নিজ খরচে ফেরত পাঠাবে। যা প্রায় মানাই হয় না। কিন্তু এই আইনের গ্যাড়াকলে ফেসে যায় নীরিহ শ্রমিক। ভাল সুবিধা পেলেও আটকে যায় নিজ কম্পানীতেই।
আর এক প্রকার ভিসার কথা আমাদের দেশে বহুল প্রচারিত।। তা হলো “ফ্রী ভিসা”!! অর্থাৎ নিজ পছন্দমত মত কাজ করা। আমিও তাই শুনেছিলাম দেশে থাকতে। এখানে এসে দেখলাম কাজীর গরু কিতাবে আছে কিন্তু গোয়ালে নেই মানে এধরনের কোনপ্রকার ভিসর অস্তিত্বই নেই। শুধু আছে আদম ব্যাবসায়ীদের কাছে। যা দিয়ে তারা নীরিহ,সরল মানুষগুলিকে বোকা বানায়।প্রসঙ্গক্রমে আর একটা ব্যাপার না বললেই আজকের লেখা অপূর্ন থেকে যাবে তা হলো,এখানে যে, যে কম্পানীর ভিসায় আসুক তাকে শুধু সেই কম্পানীর চুক্তিভুক্ত স্থানেই সেই কম্পানীর অধীনেই কাজ করতে হবে।অন্যত্র কর্মরত অবস্থায় ধরা পড়লে,আইনানুযায়ী তার জেল-জরিমানাসহ দেশেও পাঠিয়ে দেয়া হতে পারে।কিন্তু ৯০%ভাগ লোকই একটু বাড়তি আয়ের জন্য এই ঝুকি নিয়েই পার্টটাইম জব করে থাকে। তাদের একই কথা,নিয়তির লেখন খন্ডানো যায় না।
বিঃদ্রঃ সেই থেকে বন্ধ ভিসা আজও খুলে নাই। যাও খুলেছে শুধুমাত্র ২০ নম্বর আর মালীর কাজের।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




