somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ কখন সকাল হবে

২৫ শে মার্চ, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




০১.

সন্ধ্যেটা সবে আসতে শুরু করেছে;
আবছা হচ্ছে আলোটা। সূর্য এখন অনেকটা সময় নিয়ে আকাশটাকে মাতিয়ে রাখে; তাই সন্ধ্যেটা আসতে দেরি হয়। আর সন্ধ্যেটা পা ফেলতেই ঝুপঝাপ আঁধার নামতে শুরু করে। আঁধার নামতে যখন শুরু হয় তখন আবার পাশের নালাটায় ডাক শোনা যায় ঝি ঝি পোকার। একটানা ঝি পোকার শব্দে কান মাতায়।
সেই সাথে ডোবার ধারে করাত করাত করে ডেকে উঠে ব্যাঙ। আজ জোনাক গুলোও বড্ড ছন্নছাড়া হয়ে আছে; পাঁচ-দশটি এক জায়গাতে থাকেই না; বড়োজোর দু’চারটেকে দেখা যায় এদিক-ওদিক উড়ছে। কেন ওরা এমন তা ভাবতে বসে আছে জয়িতা।
সন্ধ্যের প্রদীপটা এখনো জ্বলেনি সে;
আলসেমিটা পেয়ে বসেছে আজ আবার; মা’র বকুনি নির্ঘাত। মেয়েটা যে বড় হয়েছে মায়ের সে খেয়াল থাকেই না; সেই ছোট্টটি কি আর আছে কাল বাদে পরশু যে তার বিয়ে; তাকে কি বকুনি দেয়া যায়? সন্ধ্যে ছেড়ে কিছুতেই মনটা তার উঠতে চায়না আরেকটু বসে থাকতে ইচ্ছে করে কিন্তু সে জো নেই এখুনি সন্ধ্যা ফুরোলো বলে।
ভাবনার তেপান্তর থেকে মনটাকে টেনে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায় জয়িতা।
সন্ধ্যে প্রদীপ জ্বালতে হবে; বাবা চলে এলো বলে; সন্ধ্যে মরে যাচ্ছে কিন্তু প্রদীপ জ্বলেনি দেখলে বাবা রাগ করবে।

০২.

ধ্রুব গেছে শাড়ী, গয়না, আর টোপর কিনতে।
কালকের পরদিন সাতাশ তারিখ জয়িতার বিয়ে। একটা মাত্র বোন। তাকে রাজ রানীর মতো সাজিয়ে বিয়ে দেবে।
সুখ কষ্ট যাই হোক বাবার ঘরে; কিন্তু স্বামীর ঘরটা যেন দুঃখের না হয় যেন কষ্টটা ওকে আঁকড়ে ধরতে না পারে কখনো। একটা ভালো পাত্রের সন্ধানে কেটে গেছে তিনশত পয়ষট্টি দিন। চাট্টি খানি কথা। ভালো না হলে চলে।
সে রাতে ঘরে ফিরে ধ্রুব বলে বাইরের পরিবেশটা বেশ থমথমে; দেখেছিস জয়িতা ?
জয়িতা বলে শুধু কি তাই আজ এই রাতেও কাক ডাকছে বিষাদ স্বরে খুব খারাপ লাগছে রে বুঝতে পারছিনা!! না জানি কোন বিপদ আসছে ধেয়ে কে জানে। বিষণ্নতায় মনটা ভরে গেলেও মুখে সেটা ফোটাতে পারেনা; ভয় হয় ধ্রুব’র যদি পাছে জয়িতার মনে জাগে সংশয়। না তেমন কিছু না এটা; চাপা হাসিতে বলে ধ্রুব।
জয়িতা বলে দাদা বিয়েটা শেষ হলেই চল আমরা এ দেশ ছেড়ে চলে যাবো ? এখানে শান্তি নেই। পাশ বালিশটা টেনে সোফায় বসতে বসতে ধ্র“ব বলে নাহ্ এটা আমার জন্মভূমি আমি ছাড়তে পারবো না সোদা মাটির গন্ধ এই প্রকৃতি আমাকে ছাড়বে না; তাছাড়া আমি ভালবাসি দেশকে একদিন দেশের এই হাল থাকবে না আমরা সেদিন সাজাবো নতুন করে; ভরে দেব আলোয় আলোয়।
জানিস এই প্রকৃতি এই হাওয়া আমাকে শক্তি দেয়। পথ চলার প্রেরণা পাই মানুষের ভালোবাসা থেকে। আমি ছাড়তে পারবো না।
জয়িতা বলে তাই বলে এভাবে কি থাকা যায়!!
না জানি কবে মারা পড়বো। সোফা থেকে উঠে দাড়িয়ে ধ্রুব বলে যাই হোক আমি আছি থাকবো।
বিয়ের পর তোর বরের সাথে ঘুড়বো। জয়িতা হেসে বলে তাই নাকি;
দাদা আমার একটা পুচকো থাকবে যেটা তোকে জ্বালাবে ভীষণ।
জয়িতার মা মেয়েকে বলে তারা তারি তোর বিয়েটা হয়ে গেলেই বাঁচি; দেশে যা শুরু হয়েছে কি যে হয় কে, জানে। আজকাল দিনগুলো ভালো যাচ্ছেনা সারাদেশ জুড়ে কিসের যেন পায়তাঁরা চলছে।



০৩.

শব্দটা দেয়ালটাকে কাঁপাচ্ছে।
আধবোজা চোখ মেলে তাকাতেই জয়িতা শব্দের তরঙ্গে কেঁপে উঠে।
চারদিকে শুধু শব্দ আর শব্দ। মনে হচ্ছে সারা শহরে একনাগারে কেউ আতশ ফোটাচ্ছে।
সেই সাথে মিশেছে আর্ত হাহাকার। জয়িতা উঠে বসে জানালার ধারে তাকায় সামনের দিকে শুধু দেখা যায় আগুনের মেলা বসেছে পুরো মহল্লায়।
সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে আগুনের কোন গোলা এসে পড়েছে শহরে। ধোয়া উঠছে থেকে থেকে। কি হচ্ছে এসব কে যেন সারা শহরকে নরক পুরি করে তোলেছে এরই মাঝে।
দরজা খুলে বাইরে আসে। পুরো শহর যেন জ্বলছে। যেন আগুন তার রাজত্ব পেয়েছে আজ সব পুরিয়ে করবে ছাড়খার। গেটে এসে দাড়ালো জয়িতা। ধ্রুব দাড়িয়ে আছে মা’কে নিয়ে।
ধ্রুব বললো তুই আবার এসেছিস কেন যা ঘরে কিন্তু জয়িতা সেখানেই দাড়িয়ে আছে স্নায়ুবত হয়ে । পাশের মহল্লায় আগুন পড়েছে। বুলেটের আওয়াজে কান পাতা যাচ্ছেনা। বুকের ভেতরে ঢিব ঢিব শব্দটা একটানা হাতুরি পেটাচ্ছে। কালকের পরদিন বিয়ে জয়িতার। কিন্তু অর্তকিত এই নরপিশাচদের হামলায় কি টিকে থাকা যাবে। বিয়েটা বুঝি গেল !!
জয়িতা ভয়ার্ত কন্ঠে বলে উঠে দাদা ওরা যদি এদিকে আসে ?
না আসবে না অভয় দেয় ধ্রুব।
দাদা আমার ভয় করছে !! তোকে আমাকে সবাইকে মেরে ফেলবে না' তো ? আবারো অভয় দেয় ধ্রুব।
নরপিশাচেরা শব্দ শকট হাতে নিয়ে এদিকে আসছে ধীরে ধীরে।
ধ্রুব ভাবে বাড়ি ছেড়ে যে পালাবে সে উপায়টুকু তো নেই। যে হারে বৃষ্টির মতো বুলেট ফুটছে; নির্ঘাত কোন বুলেট এসে বিঁধবে বন্ধুর মতোন এই বুকে। ওদিকে জয়িতার মা বিলাপ শুরু করে দিয়েছে। ঈশ্বর এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দাও ? বিপদ না পড়লে আমাদের ভগবানকে ডাকার তেমন একটা ইচ্ছে মনে জাগে না আজ তাই এই ঘোর বিপদে তাকেই ভীষণ ভাবে প্রয়োজন।
গেটের পাশটায় জোড়ায় জোড়ায় বুটের আওয়াজ কারা যেন আসছে।

০৪.

টেনে হিচরে নিয়ে যাচ্ছে জয়িতাকে নরপিশাচ গুলো।
বাধাঁ দেবার কেউ নেই। ছোপ ছোপ রক্তে আঙ্গিনা রাঙানো। এই মহল্লার কেউ মনে বাচঁতে পারবেনা আজ এই রাতে; সে সংকল্পে নেমেছে ওরা।
দাদা ওরা আমাকে নিয়ে গেলো ওদের ফেরা ? আকুতিটা খুব করুন ভাবে দেয়াল গুলোকেও কাঁপাচ্ছে। উপর থেকে কি সুন্দর কলকাঠি নেড়ে যাচ্ছেন তিনি দেখছেন কিভাবে অসহায় হয়ে পড়ে থাকে তার সৃষ্টিরা। জয়িতার চিৎকারটা বাড়ছে ক্রমশই;
কিন্তু ধ্রুব সেটা শুনতে পাচ্ছেনা; বুকটা ঝাঁঝরা করে দিয়ে গেছে বুলেট সোদা মাটির গন্ধে পাগল ছেলেটা পড়ে আছে; সে। ঘরের ভেতর লাশ হয়ে পড়ে আছে জয়িতার বাবা আর মা; ওরা বাচঁতে চায় নি; শুধু বলেছিলো আমাদের মেরে ফেলো কিন্তু আমাদের প্রিয় সন্তানদের মেরো না।
কিন্তু ওরা শুনবে কেন সে কথা; ওরা আজ নরপিশাচ হয়ে এসেছে।
যেমন সারি বেধে ওরা এসেছিলো, তেমনি চলে গেল লাশ ডিঙ্গিয়ে সাথে নিয়ে গেল জয়িতাকে।

জয়িতার লালপেড়ে শাড়ি পরে কপালে সিঁদূর দিয়ে হাতে শাখা ভরে আর বধূ হওয়া হলোনা। হলোনা পূরণ স্বামীর সোহাগ কিংবা মা ডাক শোনার অদম্য ইচ্ছেটা।
এ রাতে শুধু রক্তে ভরে উঠেছে রাজপথ আর আঙ্গিনা। নরপিশাচরা সেই রক্তে পা ফেলে প্রান নিধন করেই চলেছে ভয়ঙ্কর রাতটা কিছুতেই ফুরাচ্ছে না। রাত যতো বাড়ছে বাতাসে বাড়ছে বারুদের গন্ধ; আর রক্তে রক্তে ঢেকে যাচ্ছে শত শত প্রাণের স্বপ্নরা। রাতটা যেমন করে শুরু হয়েছিলো তেমন করে শেষ হচ্ছেনা। জোনাকিরা নেই এখন আর। নালার পাশের ব্যাঙ গুলো আর ডাকছে না থমকে আছে ওরা। এ রাতে কাক আর ডাকবার সুযোগ পায়নি ভয়ে চলে গেছে দুরে কোথাও।
ঘরে পড়ে আছে টোপর আর লাল শাড়ি আর সব তছনছ করে দিয়ে গেছে নরপিশাচেরা কি ভেবে যেন আগুন জ্বালেনি এ বাড়িতে। চারপাশটা কাঁপছে হয়ত সকাল না হলে আর থামবে না।
রাতটা শেষ হচ্ছেনা সূর্যটা বসে আছে রক্তে আঁকা সকাল দেখবে বলে;
কখন সকাল হবে ?

++++++++++++++++সমাপ্ত+++++++++++++++++
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০১২ রাত ১০:২৭
৩২টি মন্তব্য ৩২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

লাভ কার হলো?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৪ শে মে, ২০২৬ ভোর ৬:১৮


দীর্ঘদিন একটি দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে, সরকারের ভেতর এক ধরনের সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি হয়। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় দেশের প্রকৃত অবস্থা আড়াল করতে ব্যস্ত থাকে। বাংলাদেশেও সেই বাস্তবতা ছিল।
২০২৪ সালের আন্দোলন... ...বাকিটুকু পড়ুন

হায়রে জীবন!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৪ শে মে, ২০২৬ সকাল ৮:৫৬

হায়রে জীবন!

যারা বছরের পর বছর রাষ্ট্রক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে মানুষ গুম করেছে, নির্যাতন করেছে, পরিবার ধ্বংস করেছে, রাষ্ট্রকে ভয় ও আতঙ্কের কারখানায় পরিণত করেছে- তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন আজ “ভিআইপি আসামি”।
কারাগারেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

রসময় গালগল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৪ শে মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮



প্রতিদিন ভাবি তুমি এলে বেশ জমিয়ে করবো-
রসকষহীন কাঠখোট্টা গল্প!
আমার সঞ্চয়ে নেই কোনো রসময় গালগল্প-
যা থেকে পেতে পারো যৎকিঞ্চিত উষ্ণতা।

আমি ঠিক নিশ্চিত নই আদৌ তুমি আসো কিনা!... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঈদযাত্রায় সচেতন হোন, নিরাপদ থাকুন

লিখেছেন শাওন আহমাদ, ২৪ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৩:২১



ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে সারা বছরের কর্মব্যস্ততা পেছনে ফেলে শেকড়ের টানে নীড়ে ফেরার চিরন্তন আকুলতা। প্রিয় মুখগুলোকে বুকে জড়িয়ে অপার্থিব শান্তি অনুভব করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতি বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেঝ দা

লিখেছেন শেরজা তপন, ২৪ শে মে, ২০২৬ রাত ৮:৩৩

লেখালেখি ভীষন বিরক্তিকর লাগে এখন। গাইতে গাইতে গায়েনের মত আমি লিখতে লিখতে লেখক হয়েছি। লেখালেখি নি কোন আশাবাদ বা প্যাশন আমার কস্মিনকালে ছিল না- এটা আমার নেহায়েত শখের বিষয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×