somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সেলিনা পারভীন আমাদের হারানো এক নক্ষত্র

১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ রাত ৯:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীনকে ছিলেন স্বাধীনচেতা এক নারী। পাকিস্তান আমলের একজন নির্ভীক কলম সৈনিক । যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সাংবাদিকতা করেছেন।

শৈশব : ৩১ মার্চ, ১৯৩১ সালে ফেনীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মো: আবিদুর রহমান শিক্ষকতা করতেন । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের ফেনীর বাড়ি দখল হয়ে যায় । যখন ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পরতেন তখন থেকেই তিনি সাহিত্যের অনুরাগী হয়ে গল্প ও কবিতা লিখা শুরু করেন । গ্রামীণ কুসংস্কারের মারপ্যাঁচে তাঁর পড়ালেখার সাময়িক ইতি ঘটে তখন । মাত্র ১৪ বছর বয়সে তাঁর অমতে তখনকার প্রথামত বিয়ে দেয়া হয় । তিনি ঐ বয়সে স্বামীর সাথে থাকার কথা ভাবতে পারেন নি । ১০ বছর টিকেছিল সে বিয়ে । পরবর্তীতে তিনি আবার পড়ালেখা শুরু করেন কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ম্যাট্রিকুলেশন কৃতকার্য হন নি ।

কর্মজীবন : ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের হল পরিচালক হিসেবে চাকুরি নেন । পরের বছর কর্তৃপক্ষের সাথে মতের অমিল হওয়ায় তিনি চাকুরি ছেড়ে দেন । তিনি পরবর্তীতে একজন রাজনৈতিক এর সাথে সংসার শুরু করেন । তিনি ললনা পত্রিকায় কাজ করতেন বিজ্ঞাপন বিভাগে ৷ বিজ্ঞাপন সংগ্রহ, টাকা তোলা সব কাজ একাই করতেন। পত্রিকা অফিস থেকে বেতন হিসাবে অনেক সময় তেমন কিছুই পেতেন না। ললনায় কাজ করতে করতে ১৯৬৯ সালে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ১৯৬৯ বের করেন শিলালিপি নামে একটি পত্রিকা ৷ নিজেই এটি সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন ৷ শিলালিপি ছিল সেলিনার নিজের সন্তানের মত ৷ দেশের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত শিলালিপি সকলেরই নজর কাড়লো স্বাধীনতার পক্ষের পত্রিকা শিলালিপি এই সুবাদে ঢাকার বুদ্ধিজীবী মহলে অনেকের সাথেই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেন তিনি ৷
মুক্তিযুদ্ধে অবদান : ১৯৬৯-এর রাজনৈতিক আন্দোলনে উত্তাল বাংলাদেশ জাতির ক্রান্তিকাল নিজেও শরিক হন গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলন কর্মকাণ্ডে ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই বেরিয়ে পড়তেন '৬৯-এর ২১ ফেব্রুয়ারি পল্টনের জনসভায় বা শহীদ মিনার থেকে বের হওয়া নারীদের মিছিলে যোগ দিতে শরিক হতেন বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদে আর সভায়ও অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার প্রমুখদের সাথে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে সমাজতন্ত্রের প্রতিও আস্থাশীল হয়ে পড়েন তিনি এরই মধ্যে শুরু হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের সময় সেলিনা পারভীন ঢাকায় ছিলেন তাঁর বাসায় মাঝে মাঝে রাত হলে কয়েকজন তরুণ আসতেন খাওয়া-দাওয়া করে চলে যাওয়ার আগে এরা সেলিনা পারভীনের কাছ থেকে সংগৃহীত ঔষধ, কাপড় আর অর্থ নিয়ে যেতেন শিলালিপির বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়েই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন এই তরুণদের সকলেই ছিলেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ৷ চারিদিকে তখন চলছে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ, প্রতিরোধ চারপাশে শুধু বুলেটের শব্দ আর বারুদের গন্ধ, চিৎকার, গোঙানি, রক্তস্রোত আর মৃত্যু এরই মাঝে ললনা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম শিলালিপির উপরও নেমে আসে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর খড়্গ হাসেম খানের প্রচ্ছদ করা একটি শিলালিপির প্রকাশিতব্য সংখ্যা নিষিদ্ধ করে দেয় পাকিস্তান সরকার পরে অবশ্য প্রকাশের অনুমতি মিললো তবে শর্ত হলো নতুনভাবে সাজাতে হবে সেলিনা পারভীন বরাবরের মতো প্রচ্ছদ না নিয়ে তাঁর ভাইয়ের ছেলের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ করে আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে শিলালিপির সর্বশেষ সংখ্যা বের করেন কিন্তু এর আগের সংখ্যার জন্যই সেলিনা পারভীন পাকিস্তানী ও তাদের দালালদের নজরে পড়ে যান যেটাতে ছিল দেশ বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদের লেখা এবং স্বাধীনতার পক্ষের লেখা তাই কাল হলো শিলালিপির আরেকটি সংখ্যা বের করার আগে নিজেই হারিয়ে গেলেন



যেভাবে হারালেন : ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল দেশ স্বাধীন হতে আর মাত্র তিন দিন বাকি বেশ কিছু অঞ্চল ইতিমধ্যে মুক্ত হয়ে গেছে সাংবাদিক সেলিনা পারভীন তখন বাস করতেন সিদ্ধেশ্বরীতে। ১১৫ নং নিউ সার্কুলার রোডে তার বাড়ীতে থাকতো তিনজন মানুষ- তার পুত্র সুমন, মা আর তার ভাই জনাব উজির ৷ সেদিন শীতের সকালে তারা সকলেই ছিলেন ছাদে। সেলিনা পারভীন সুমনের গায়ে তেল মাখিয়ে দিচ্ছিলেন। সুমন যখন ছাদে খেলাধুলা করছিল তখন সেলিনা পারভীন ছাদে একটা চেয়ার টেনে একটি লেখা লিখছিলেন। শহরে তখন কারফিউ ৷ রাস্তায় মিলিটারি পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য বিমান থেকে চিঠি ফেলা হচ্ছে হঠাৎ দূরে একটা গাড়ির আওয়াজ হলো সুমনদের বাড়ীর উল্টো দিকে খান আতার বাসার সামনে E.P.R.TC-এর ফিয়াট মাইক্রোবাস ও লরি থামলো ৷ সেই বাসার প্রধান গেইট ভেঙে ভিতরে ঢুকে গেল কিছু লোক তাদের সবাই একই রঙের পোশাক পরা ও মুখ রুমাল দিয়ে ঢাকা সুমনদের ফ্ল্যাটে এসে একসময় কড়া নাড়ে তারা ৷ সেলিনা পারভীন নিজে দরজা খুলে দেন লোকগুলো তাঁর পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয় এবং এ সময় সেলিনা পারভীনের সাথে লোকগুলোর বেশ কিছু কথা হয় এরপর তারা সেলিনা পারভীনকে তাদের সাথে ধরে নিয়ে যায় ১৮ ডিসেম্বর সেলিনা পারভীনের গুলিতে-বেয়নেটে ক্ষত বিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে খুব শীতকাতুরে সেলিনার পায়ে তখনও পড়া ছিল সাদা মোজা । এটি দেখেই তাকে সনাক্ত করা হয় । ১৪ ডিসেম্বর আরও অনেক বুদ্ধিজীবীর মতো পাকিস্তানের দালাল আলবদর বাহিনীর ঘৃণিত নরপশুরা সেখানেই সেলিনা পারভীনকে হত্যা করে ১৮ ডিসেম্বরেই তাকে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে সমাহিত করা হয়

সূত্র- উইকি


শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সেলিনা পারভীন স্মারক গ্রন্থে প্রকাশিত হওয়া আমার একটি কবিতা:


ঘুমিয়ে গেছে যে তারাটি

ওই তো পড়ে আছে লাশের স্তুপে, হারিয়ে যাওয়া আলো,
সাদা মোজায় আবৃত পা দুটো ভেসে আছে সাদা পদ্মের মতো।
এখনো শীতে কুঁকড়ে আছে সে দেহ,
গুলি আর বেয়নেটে ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত যেন!
আর কোনদিন জেগে উঠবে না আমাদের প্রিয় সেলিনা
ঘুমিয়ে গেছে, পাখির মতো।

ঘুমিয়ে গেছে একসময়ের
উদাত্ত কণ্ঠ!
যে কণ্ঠ মুক্তির আন্দোলনে একদিন গর্জে উঠেছিলো।
যে হাতের অনবদ্য সৃষ্টি “শিলালিপিতে” গুণীজনের বৃষ্টি ঝড়েছিল
যে হাত- হতে একদিন শত মুক্তিযোদ্ধা অকপটে সাহায্য নিয়েছিল।
সে হাত আর নড়ে উঠবে না কখনো;
সে হাত মিছিলে উচিয়ে উঠবে না আর,
ঘুমিয়ে গেছে সেই সেলিনা,
ঘুমিয়ে গেছে সেই কণ্ঠ; সেই জলন্ত প্রদীপ,
যে প্রদীপ একসময় আলো ছড়িয়েছিল বাংলার আকাশে।

কল্যাণ নগরের সেই স্বাধীনচেতা নারী,
জীবন সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতীক যেন।
ঊনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থানে সন্তানের হাত ধরে যে নারীর কণ্ঠে
বারুদ ঝরে ছিলো;
সে ছিল স্বাধীন স্বপ্ন দেখা বিভোর এক নারী,
যে কিনা দেশের তরে অকাতরে দিয়ে গেল প্রাণ,
যার স্বপ্ন আর ফুল হলোনা, হলো বলিদান।

মৃত্যুর আকাশে, তুমি ভালো থেকো সেলিনা!
ক্ষমা করো আমাদের। ফেরাতে পারিনি তোমায় মৃত্যু থেকে;
ক্ষমা করো তুমি,
আজ শুধু জানাই অধোবদনে
বাঙালী তোমায় চিরকাল রাখবে স্মরণে॥

_____________________________
৯টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজ যদি টেলিফোন থাকত, তাহলে কেমন হতো?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:২৪

আজ যদি টেলিফোন থাকত, তাহলে কেমন হতো?

হয়তো আজ টেলিফোনও অ্যান্ড্রয়েড ফোনের মতো স্মার্ট হতো!



একসময় মানুষের দূর-দূরান্তে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল টেলিফোন। মোবাইল ফোনের মতোই টেলিফোন দিয়ে কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শব্দের শক্তি, ভাষার মাধুর্য....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫২

এমিরেটস, কাতার এয়ার লাইন্স ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট রিক্রুটমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে গ্রুপ ডিসকাশন। গ্রুপ ডিসকাশনের সারমর্ম হচ্ছে—৬-৮ জন কয়েকটি গ্রুপে একটি নির্দিষ্ট টপিক নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বলুন - "হ্যালো আল্লাহ্‌, আমি এখনো বেঁচে আছি!"

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৫৫

আপনার কাছে মনে হচ্ছে, আল্লাহ্‌ আপনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
তিনি আপনার দোয়া কবুল করছেন না।
আপনার কাছের মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন।
আপনার কোন চাকরী নাই। রিজিক ছোট হয়ে এসেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

উচ্চবংশীয় ছাগল!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৯



এককালে কেবল ঘড়িতেই বাজতো টিক টিক- টিক টিক;
বারবেলায় এসে দেখছি টিক টিক বলে কিছু নেই আর ঠিক ঠিক!
বরং 'টিকটক'- এ আকণ্ঠ বুদ হয়ে আছে আবালবৃদ্ধবনিতা!
মানুষের লম্ফঝম্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া কি ছিল?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৭



কোন কিছুর অস্তীত্ব বিহীন মহাশূন্যে অস্তিত্বের প্রক্রিয়া হলো উদ্ভব। কারণ সৃষ্টি বা তৈরী কারক না থাকা। তাতে কী উদ্ভব হবে এটা অনিদৃষ্ট। কারণ এটা নিদৃষ্ট করার কেউ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×