somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রুমীর চলে যাওয়া

৩১ শে মার্চ, ২০১৩ সকাল ৯:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা শাফী ইমাম (রুমী)। এই রুমী এবং একাত্তরের স্মৃতি নিয়েই তাঁর জননী জাহানারা ইমামের বিখ্যাত গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি। রুমীর পিতা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার শরীফ ইমাম। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার পিতার পথ অনুসরণ করেই রুমী আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল, ঢাকা কলেজ হয়ে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য ভর্তি হয়েছিল। সেই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের শুরু। ঘরে মন টিকছিল না। মে মাসের প্রথমদিকেই একবার চেষ্টা করেছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য চলে যেতে। কিন্তু পথ বিপৎসংকুল হওয়ায়, আর্মি ক্যাম্প হওয়ায়, অন্য পথের খবর না পাওয়ায় ফিরে আসতে হয়েছিল। পরে জুনের মাঝামাঝি সময় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ২ নম্বর সেক্টরের মেলাঘর ক্যাম্পে পৌঁছায়। এরপর শুরু হয় ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে গেরিলা অপারেশনে সরাসরি অংশগ্রহণ।
রুমীর সঙ্গে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে। সুন্দর চেহারার উচ্ছল ও প্রাণবন্ত তরুণ রুমী ছিল বয়সে আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট। যত দূর মনে পড়ে—আলম, হ্যারিস, কাজী, বদি, স্বপন—এদের সঙ্গেই বেশির ভাগ সময় দেখতাম। ঢাকায় বিভিন্ন অপারেশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করত। দেখা হলে এসব দুঃসাহসী অপারেশনের কথা শুনতাম। খুব ভালো লাগত। আগস্ট মাসের দিকে ঢাকায় অপারেশনগুলো আরও জোরদার হলো। মেলাঘর ২ নম্বর সেক্টর থেকে বিভিন্ন গ্রুপে মুক্তিযোদ্ধারা অনেক অস্ত্রশস্ত্রসহ বড় ধরনের অপারেশনের লক্ষ্যে ঢাকায় ঢুকেছিল। আমাদের গ্রুপে চারজন—আমি, ফাতেহ আলী, বাকের ও কমল একই সময় অনেক অস্ত্র-গোলা নিয়ে ঢুকি। প্রতিদিনই ঢাকায় কোথাও না কোথাও অপারেশন চলছিল। খবরও পাচ্ছি। এভাবে আগস্টের দিনগুলো যাচ্ছিল বেশ উত্তেজনার মধ্য দিয়ে।
৩০ আগস্ট ভোরবেলা দেশবরেণ্য সুরকার আলতাফ মাহমুদের বাসা পাকিস্তানি সেনারা ঘিরে ফেলে। আমি রাতে ওই বাসায় ছিলাম। আলতাফ মাহমুদ ও অন্যদের সঙ্গে আমাকেও ধরে নিয়ে যায়। নিয়ে যাওয়া হয় মার্শাল কোর্টে। সেই সময়ের সংসদ ভবনসংলগ্ন এমপি হোস্টেলে। ওখানে দেখলাম, আমাদের অনেকেই ধরা পড়েছে। মুক্তিযোদ্ধা, তাদের আত্মীয়স্বজন, পরিচিত অনেকেই রয়েছে এর মধ্যে। সেই পরিচিত মুখগুলোর মধ্যে ছিল রুমী, জুয়েল, বদি, হাফিজ, চুলু ভাই, বেলায়েত ভাই (ফাতেহ আলীর দুলাভাই), উলফাতের বাবা, আলমের ফুফাসহ আরও অনেকে। রুমীকে শুধু এক দিনই দেখেছি। রুমীর পিতা শরীফ ইমাম ও তাঁর কনিষ্ঠ ছেলে জামীকেও দেখেছি। রুমীকে বেশ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, প্রচণ্ড টর্চার করা হয়েছে। দুপুরের পরে ওকে নিয়ে গেল। তারপর আর দেখা হয়নি। আমাকে ও আমার সহযোদ্ধা অন্য গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন কথা বের করার জন্য অনেক টর্চার করা হয়েছে। রক্তাক্ত হয়েছে দেহ, আঙুলগুলো ভেঙে গেছে; হাত, পিঠ ফেটে রক্ত বেরিয়েছে। থেঁতলে দিয়েছে সারা শরীর। অতএব আমিও জানি, রুমীর কাছ থেকেও কথা বের করতে এই নির্দয় পাকিস্তানি সেনারা কী কী করতে পারেন। রুমীর সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। এখনো তার চেহারাটা চোখের সামনে ভাসে।
রুমীর মা জাহানারা ইমাম ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখিকা, সমাজকর্মী। স্বামী, সন্তান রুমী ও জামী আর আত্মীয়স্বজন নিয়ে ছিল তাঁর একটি সাজানো সুন্দর, আনন্দময়, সচ্ছল সংসার। একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি হারিয়েছেন সবকিছু। শুধু জামীকে বুকে নিয়ে স্বাধীন দেশটা পেলেন। কিন্তু উনি যেমন দেশটার কথা ভেবেছিলেন, তেমনটা হলো না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শত্রুরা আবার নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করল, দিন দিন শক্তি সঞ্চয় করল, যার জন্য তিনি নামলেন দেশের শত্রু, স্বাধীনতা-যুদ্ধের ঘাতক-দালালদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রুমীর স্মৃতি বুকে নিয়ে এই আন্দোলন করে গেছেন তিনি।
আবুল বারক আলভী
তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আহলে হাদিস একটি সুনিশ্চিত পথভ্রষ্ট ও জাহান্নামী দল

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৪ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৫৮




সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতাম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে তাঁর পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন বিচার পাওয়ার আগেই মৃত্যু হলো সাইকো সম্রাটের ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৪ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:৩৪


সাভার থানা থেকে মাত্র একশো গজ দূরে, পাশে সরকারি কলেজ, দূরে সেনা ক্যাম্প, চারদিকে মানুষের ব্যস্ততা: এই পরিচিত পরিবেশের মাঝে একটা পরিত্যক্ত ভবন ছিল, যেখানে আলো পৌঁছাত না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানব সভ্যতার নতুন অধ্যায়

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৫ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৩:০৭


আজ মানব জাতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
তারিখঃ ২৪ শে মার্চ, ২০২৬
সময়ঃ বিকাল ৪টা, (নর্থ আমেরিকা)
আমেরিকার কংগ্রেস স্বীকার করে নিল ভীন গ্রহের প্রাণীর অস্তিত্ব। স্বীকার করে নিল পৃথিবীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ সেই বিভীষিকাময় ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৫ শে মার্চ, ২০২৬ ভোর ৫:৫৫

আজ সেই বিভীষিকাময় ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস।
আজ সেই বিভীষিকাময় ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই কালরাতে Operation Searchlight নামের বর্বর অভিযানের মাধ্যমে পাক আর্মি নিরস্ত্র বাঙালির উপর ইতিহাসের জঘন্যতম... ...বাকিটুকু পড়ুন

ওয়ান-ইলেভেন: স্মৃতিহীন জাতির হঠাৎ জাগরণ!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৫ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:৩০

কাভার- সরাসরি আপলোড না হওয়াতে!!


ওয়ান-ইলেভেন: স্মৃতিহীন জাতির হঠাৎ জাগরণ!

জেনারেল মাসুদের গ্রেপ্তার হতেই হঠাৎ দেখি-
সবাই একসাথে ওয়ান-ইলেভেন-কে ধুয়ে দিচ্ছে!

মনে হচ্ছে, এই জাতির কোনো অতীতই নেই।
বাঙালির স্মৃতিশক্তি আসলেই কচুপাতার পানির মতো-এক ঝাপটায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×