
যদি প্রশ্ন করা হয় মানুষের সবচেয়ে পছন্দের জিনিস কোনগুলি তার মাঝে অবশ্যই আসবে খাবারের নাম।খাবার তো মানুষের জন্য পছন্দসই জিনিস বটেই তবে তা যদি হয় মুখরোচোক খাবার তাহলে তো কথাই নেই।আইসক্রিম,কেক,চকলেট,মিষ্টি,ফিরনী,পায়েস এইসব খাবারের স্বাদ আর মনমাতানো নানা রকম সুবাস মানুষকে আকর্ষন করে আসছে যুগযুগ ধরেকিন্ত আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি এসব ফ্লেভারের উতস কি?আমার এবারের লেখা এমন কিছু উদ্ভিদ নিয়ে যা থেকে তৈরী হয় ফুড ফ্লেভার।
ভ্যানিলাঃ
প্রথমেই আসি সকলের ফেভারিট ফ্লেভার ভ্যানিলার বিষয়ে।আইস্ক্রিম কেক কাস্টার্ড এমন অনেক খাবারের সবচেয়ে বেশি দেয়া হয় যে ফ্লেভারটি সেটি হচ্ছে ভ্যানিলা।এর জনপ্রিয়তা যেমন তুঙ্গে তেমনি এর দাম।খাদ্যে ব্যাবহৃত ফ্লেভারে দামের দিক থেকে এর স্থান ২য়।ভ্যানিলার মন মাতানো ফ্লেভারটির উতস হচ্ছে এক ধরনের অর্কিড ফুলের বীজ়।অর্কিডটির বোটানিকাল নাম Vanilla planifolia (ভ্যানিলা প্লানিফোলিয়া)।অর্কিডটি মূলত একটি লতানো উদ্ভিদ যা অন্য একটি গাছকে আশ্রয় করে বেড়ে উঠে।এর আদি আবাস মেক্সিকো কিন্ত বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া প্রায় ৫৮% ভ্যানিলা উতপাদন আর রপ্তানী করে।এছাড়া মাদাগাস্কারেও ভ্যানিলার বেশ কয়টি প্রজাতি জন্মে।ভ্যানিলার ফুলটির রঙ সাধা্রন্ত হলুদ।স্বল্পস্থায়ী এই ফুলটির পরাগায়ন হলে সেখান থেকে চ্যাপ্টা বরবটির মত একধরনের ফল হয় যাতে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বীজ় থাকে।এই ফল এবং বীজ়ে যে এশেনসিয়াল অয়েল থাকে তা থেকেই তৈরী হয় ভ্যানিলা ফ্লেভার।এই ফ্লেভার শুধু খাবারেই নয় কসমেটিক্স আর পারফিউমেও ব্যাবহার হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরেই। উদ্ভিদটির জন্ম নিয়ে রয়েছে চমতকার একটি মিথ।মেক্সিকোর টোটোনিক জাতির এক রাজকুমারীকে তার বাবা জোর করে অন্যত্র বিয়ে দিতে চাইলে সে তার প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে আসে জঙ্গলে।সেখানে রাজার পাঠানো সৈন্য প্রেমিক কে মেরে ফেললে সেই প্রেমিকের রক্ত মাটিতে পড়ে সেখান থেকে জন্ম হয় ভ্যানিলা লতার।তাহলে বুঝতেই পারছেন ভ্যানিলার সুবাস এত মিষ্টি হওয়ার রহস্য এই যে তার পেছনে রয়েছে রাজকুমারীর মিষ্টি ভালোবাসার ছোঁয়া।
ভ্যানিলা ফুল

ভ্যানিলা লতা

ভ্যানিলার ফল


ভ্যানিলা এসেন্স

জাফরানঃ
জাফরান বা Saffron হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ফ্লেভার এবং ফুড কালার।জাফরান গাছ অনেকটা পেঁয়াজ গাছের মত ছোটখাট।প্রতি গাছে ৩-৪টি হালকা বেগুনি রঙের ফুল ধরে।ফুলগুলির ক্রিমসন রঙের গর্ভকেশর ই জাফরানের ঘ্রান ও রঙের জন্য দায়ী।ইন্ডিয়ান শাহী খাবার তো বটেই এছাড়াও অনেক দেশের অনেক খাবারে জাফরানের ব্যবহার রয়েছে।এই বোটানিকাল নাম Crocus sativus(ক্রোকাস স্যাটিভাস)।এই উদ্ভিদটি ভাল জন্মস্থান গ্রীস এবং দক্ষিন-পশ্চিম এশিয়া তবে প্রথম এর চাষ হয় গ্রীসে।খাবারে জাফরান ব্যবহারের ইতিহাস প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরোনো।সেই ব্রোঞ্জ যুগ থেকেই ব্যবহৃত হচ্ছে এই অনন্য উদ্ভিদটি।এর সোনালী হলুদ রঙ এবং সেই সাথে অনেকটা খড়ের মত সুবাস খাবারে যোগ করে এক অনন্য মাত্রা।জাফরান ভাল জন্মে আধা শুষ্ক মরুময় এলাকায় যেখানে প্রচুর সূর্যালোক,সামান্য বৃষ্টিপাত এবং গরম গ্রীষ্মকাল রয়েছে।যদিও গাছগুলি কিছুটা বরফ সহ্য করতে পারে কিন্ত আমাদের মত অধিক বৃষ্টিপাত সহ্য করতে পারেনা।কাশ্মীর জাফরানের জন্য বিখ্যাত কিন্ত পৃথিবীর প্রায় ৯০% জাফরান উতপাদন আর রপ্তানী করে ইরান।
জাফরান ফুল


জাফরানের মাঠ

জাফরানের কেশর যা খাবারে দেয়া হয়

চকলেটঃ
চকলেট তো সবার ফেভারিট তা হোক ফ্লেভার হিসাবে অন্য কোনো খাবারে কিংবা শুধুই চকলেট হিসাবে।চকলেট বা (cacao) কোকো গাছের বোটানিক নাম Theobroma cacao (থিওব্রোমা ক্যাকাও)এটি মূলত মাঝারী আকারের বৃক্ষ জাতীয় গাছ যার আদীবাসস্থান আমেরিকা।এতে অনেকটা পেঁপেঁর মত দেখতে একধরনের ফল হয় যার বীজ থেকে তৈরী হয় চকলেট এবং যাবতীয় চকলেট ফ্লেভার।এই কোকো বীন দিয়ে তৈরী এক ধরনের পানীয় পাওয়া গেছে মেক্সিকোর দুটি প্রাচীন প্রত্নস্থানের আর্কিওলজিকাল সার্ভেতে যার একটি ১৭০০ বিসি অন্যটি ১৯০০ বিসির সভ্যতা।এ থেকে বোঝা যায় প্রাচীন কালের মানুষও চকলেট ফ্লেভারের ভক্ত ছিল।মায়া সভত্যায় কোকো গাছের উতপত্তি নিয়ে মিথ রয়েছে।এজটেক সভ্যতাতেও প্রচলন ছিল চকলেট ফ্লেভারের পানীয়ের।কোকো গাছের কান্ড থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল ধরে তাই ফলও ধরে গাছের কান্ডের সাথে।প্রায় ৫০০ গ্রাম ওজনের প্রতিটা ফলে ৩০-৬০টি বীজ থাকে যার বেশির ভাগটাই হচ্ছে এক ধরনের ফ্যাট যাকে বলে কোকো বাটার।এই বীজ থেকেই হয় চকলেট,কোকো পাওডার,ফ্লেভার ইত্যাদি।
কোকো ফুল

কোকো ফল


শুকনো বীজ

গোলাপ জলঃ
ফুল হিসাবে গোলাপের সমতুল্য হয়ত কেউ নেই,সুগন্ধি বা কসমেটিকস এ রোজ এসেন্স খুব জনপ্রিয়।তবে খাবারের ফ্লেভার হিসাবেও এর ব্যবহার কম নয়।ঈদের সেমাই,জর্দা ফিরনী,পোলাউ,বিরিয়ানীতে একটুখানি গোলাপজলের ছোঁয়া যে অনন্য বৈশিষ্ট্য দান করে তার কোনো তুলনা হয়না।মিলাদের জিলাপী বা বাতাসার উপর গোলাপজল ছিটিয়ে দিলে খেতে গিয়ে মনে হয় যেন বেহেশতের স্পর্শ।গোলাপ গাছ সবাই চেনে তাই বর্ননা দেয়ার দরকার নেই।গোলাপের হাজার হাজার প্রজাতি সারা পৃথিবী জুড়ে চাষ হয়।তবে এর আদিবাস ইরান এবং চায়না এবং চাষ হচ্ছে প্রায় ৫০০ বিসি থেকে।ইরান,ইন্ডিয়া এবং চায়না তে গোলাপের বিভিন্ন প্রজাতি থেকে গোলাপজল তৈরী হয়।আমাদের কুলপি আইসক্রিম এবং রুহ-আফজাতে গোলাপের সুগন্ধীর ব্যবহার লক্ষ্যনীয়।গোলাপের অনেক প্রজাতির ভিন্ন ভিন্ন নাম তবে যে সুগন্ধী গোলাপ থেকে ইরানে এসেন্স তৈরী হয় তার নাম Rosa damascena (রোজা দামাসেনা)।
দামাস্ক রোজ বা রোজা দামাসেনা

বাহারী গোলাপ

রোজ এসেন্স

স্ট্রবেরীঃ
স্ট্রবেরী এদেশি ফল না হলেও এখন চাষ হয় এবং খুবই আলোচিত ফল বর্তমান সময়ে।আর আইসক্রিম,চকলেট,জেলী,মিল্কশেক ইত্যাদি খাবারে স্ট্রবেরী ফ্লেভার মানেই জিভে জল আনা সুবাস।স্ট্রবেরীর বোটানিকাল নাম Fragaria ananassa (ফ্রাজারিয়া আনানাসা)।ছোট ধরনের গুল্ম জাতীয় গাছে সাদা ফুল হয় যাতে অপূর্ব সুগন্ধের গাঢ় লাল ফলটি ধরে।ফ্রেস ফল থেকে নানারকম ডেসার্ট তৈরী হয় সেই সাথে এর এসেনসিয়াল অয়েল থেকে তৈরী হয় জনপ্রিয় স্ট্রবেরী ফ্লেভার।এর আদিনিবাস আমেরিকা কিন্ত প্রথম চাষ হয় ফ্রান্সে।
স্ট্রবেরী গাছ ও ফল

এসেন্স

অরেঞ্জ এন্ড লেমনঃ
লেবু জাতীয় ফল থেকে তৈরী হয় লেমন এবং অরেঞ্জ এসেন্স।মূলত লেবুর খোসায় যে এসেনসিয়াল অয়েল থাকে তা বিশেষ ভাবে বের করে তৈরী হয় এই ফ্লেভার।বিস্কিট,কেক,আইস্ক্রিম,ক্যান্ডি,সফট ড্রিংস ইত্যাদিতে এই ফ্লেভারগুলো অলটাইম ফেভারিট এবং খুবই রিফ্রেশিং।এদের বিভিন্ন প্রজাতির চাষ ও ব্যবহার রয়েছে পৃথিবী জুড়ে।লেবু এবং কমলার বোটানিকাল নাম যথাক্রমে Citrus limon (সাইট্রাস লিমন)ও Citrus sinensis (সাইট্রাস সাইনেনসিস)যদিও ভিন্ন প্রজাতির ভিন্ন ভিন্ন নাম আছে।
কমলা গাছ


লেমন এসেন্স

পুদিনাঃ
পুদিনা বা মিন্ট (mint) একধরনের সবুজ পাতা বিশিষ্ট ছোট উদ্ভিদ।পুদিনা পাতা চাটনি,বোরহানী,বিভিন্ন ধরনের সরবত তৈরীতে ব্যবহৃত হয়।এর সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাবহার হচ্ছে চকলেট,ক্যান্ডি এবং মাউথ রিফ্রেশিং চুইংগামে।এদেশে অতটা না হলেও বাইরে ফ্লেভার হিসাবে মিন্ট এর ব্যপক চাহিদা রয়েছে।এর বোটানিক নাম Mentha piperita (মেনথা পিপারিটা)।মিন্ট ফ্লেভারের চা কিন্ত খেতে বেশ চমতকার।
পুদিনা পাতা ও পানীয়


আমার লেখা এপর্যন্ত শেষ করলেও ফ্লেভারের কিন্ত এখানেই শেষ নয়।প্রকৃতির অগনিত ফুল,ফল,তরু সম্ভার থেকে বেছে নিয়ে যুগে যুগে মানুষ বহু ধরনের সুগন্ধি খাবারে যোগ করেছে।শুধু প্রকৃতিক নয় বহু কৃত্তিম ফুড ফ্লেভার আমাদের খাদ্যে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।এখানে আমি শুধু সবচেয়ে প্রচলিত খাদ্য সুগন্ধি নিয়ে আলোচনা করেছি।আমাদের দেশে নারিকেল,আম,কলা,আনারস ইত্যাদির ফ্লেভারও বেশ জনপ্রিয়।এছাড়া বিভিন্ন সুগন্ধী মসলা তো রয়েছেই যা নিয়ে আগের পোস্টটিতে আলোচনা করেছি।শেষে স্ট্রবেরী ফ্লেভারের শুভেচ্ছা রইল।

সবার জন্য শুভকামনা।ভাল থাকুন সবাই।
তথ্য ও ছবিঃ ইন্টারনেট
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০১৫ দুপুর ১২:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



