somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

খিলাফত এর ডাক : ইরাক গৃহযুদ্ধে নতুন মোড়

০৭ ই জুলাই, ২০১৪ রাত ১০:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। সিরিয়ায় অনেকদিন ধরেই গৃহযুদ্ধ চলছিল। সম্প্রতি তা ছড়িয়ে পড়েছে ইরাকে। এই যুদ্ধকে শিয়া সুন্নি দ্বন্দ্ব হিসেবেই মূলত দেখা হচ্ছে। যে সংগঠনটি এই গৃহযুদ্ধে সিরিয়া এবং ইরাকে অধিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পুরোভাগে রয়েছে তার সংক্ষিপ্ত নাম ‘আই এস আই এস’। পুরো কথাটি হল ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া/আল সাম। এরা মূলত সুন্নি মুসলিম মতবাদে বিশ্বাসী এক জঙ্গী গোষ্ঠী। সিরিয়া ও ইরাক - দু দেশেই এরা যে শাসকদের বিরুদ্ধে লড়ছে তারা শিয়া গোষ্ঠীর। প্রসঙ্গত মনে রাখার ইরাকে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও সিরিয়াতে সুন্নিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
শিয়া সুন্নি বিরোধের বহু শতাব্দী ব্যাপী ইতিহাস আছে এবং বিভিন্ন সময়ে তা নতুন নতুন প্রেক্ষাপটে আত্মপ্রকাশ করে। সাম্প্রতিক সময়ের গৃহযুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসন, সুন্নি শাসক সাদ্দামের পতন, অতঃপর আমেরিকাপন্থী নয়া শিয়া শাসকের জমানার সূত্রপাত যেমন প্রভাব ফেলেছে, তেমনি আরব বসন্ত, বিশেষত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ প্রত্যক্ষভাবে ইরাকের ঘটনাবলীকে প্রভাবিত করেছে।
২০০১ এ মার্কিন মুলুকে বিমান হানার পর তার একদা সোভিয়েত বিরোধী লড়াই এর সঙ্গী আল কায়দা ও তাদের আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। প্রথম আক্রমণ হয় আফগানিস্থানে তালিবান শাসকদের ওপর। দু বছর পরেই রাসায়নিক অস্ত্র রাখার মিথ্যা অভিযোগে সে হামলা চালায় সাদ্দাম হোসেন এর শাসনাধীন ইরাকে। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ বশংবদ শাসকদের মত সাদ্দাম আমেরিকার হুকুম তামিল করতে রাজি হচ্ছিলেন না। বিশেষত কেবলমাত্র ডলারেই তেলের বাণিজ্য করতে হবে এ ফতোয়ার বিরুদ্ধে যাওয়াই একদা মিত্র সাদ্দামের বিরুদ্ধে আমেরিকাকে যুদ্ধে প্রবৃত্ত করে। আফগানিস্থান বা ইরাক কোনও যুদ্ধই আমেরিকা সহজে জিততে পারে নি, বরং কোটি কোটি ডলার অর্থব্যয় করে শেষমেষ সে সেখান থেকে তার সেনা নিয়ে চলে আসতে বাধ্য হয়। তার বসানো এবং অনুগত পুতুল সরকারেরা দেশের বৃহৎ সংখ্যক মানুষের আস্থাশীল হয় নি এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর পরও সেখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন পুরো মাত্রায় বিদ্যমান। দেশ দুটি আক্ষরিক অর্থেই বারুদের স্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
মার্কিন আগ্রাসন ছাড়া সাম্প্রতিক ইরাক পরিঘটনার পেছনে সুগভীর প্রভাব ফেলেছে আরব বসন্ত। ২০১১র শুরু থেকে ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোতে বহু বছরের একনায়ক স্বৈরতন্ত্রী শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের সোচ্চার সক্রিয় প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। তিউনিশিয়া, মিশর, ইয়েমেন, জর্ডন, আলজেরিয়া ইত্যাদির মতো এর শরিক হয় সিরিয়াও।
এখানেই পরিস্থিতি সবচেয়ে অস্থির, সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী, সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের জন্ম দেয়। দীর্ঘদিন ধরেই সিরিয়াতে গৃহযুদ্ধ চলছে, যাতে কম করে তিরিশ হাজার মানুষ নিহত এবং দশ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের আঁচই ক্রমশ ছড়িয়েছে ইরাকে।
ইরাকে গৃহযুদ্ধের প্রধান শক্তি ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আই এস আই এস) তার শক্তি সংহত করে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। তাদের প্রধান নেতা আবু বকর আল বাগদাদি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়েই সংগঠনের নেতার আসনে চলে আসেন। অনেকগুলো শক্তি মিলিত হয়ে আই এস আই এস এর জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মুজাহিদিন সুরা কাউন্সিল, ইসলামিক স্টেট অব ইরাক, আল কায়দা ইন ইরাক, জেইস আল তাইফা আল মানসুরা এবং বিভিন্ন সুন্নি মতাবলম্বী উপজাতি। সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর থেকে সে দেশে সুন্নি মতাবলম্বীদের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হয়েছে। শিয়া শাসক বিরোধী লড়াইয়ে সুন্নি মতাবলম্বীদের মধ্যকার এই ক্ষোভকে আই এস আই এস ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছে।
ইরাকে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ২০১৩ র ডিসেম্বর মাস থেকে। ২০১৪ র জানুয়ারী মাসে আই এস আই এস মিলিশিয়া ফাল্লুজা আর রামাদি দখল করে নেয়। এর ফলে আনবার প্রদেশটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে আসে। ইরাকি সেনাবাহিনীও আনবারে তাদের হামলা বাড়াতে শুরু করে। এই সময় ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নৌরি আল মালিকি এক বিতর্কিত বক্তৃতায় পরিস্থিতিকে আরো জ্বলন্ত করে তোলেন। ৭ম শতকে সংঘটিত হুসেন এবং ওয়াজিদ এর মধ্যে লড়াইয়ের ধারাবাহিকতাতেই এই লড়াই হচ্ছে, একথা বলে তিনি দীর্ঘ লালিত শিয়া সুন্নি বিতর্ককে আরো উসকে দেন। এই বক্তৃতার আগে সুন্নিদের একাংশ আনবারের লড়াই এ ইরাকি সেনাকেই সমর্থন করছিল। কিন্তু এরপর তারা পুরোপুরি আই এস আই এস এর পক্ষে দাঁড়িয়ে যায়। প্রথমদিকে পশ্চিমদিকে আবদ্ধ থাকলেও ক্রমশ আই এস আই এস ইরাকের মধ্য ও উত্তর অংশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। জুনের প্রথম থেকেই আই এস আই এস তাদের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটাতে থাকে। ৫ জুন তারা সামাররা শহর দখল করে নেয়। ৬ জুন তারা মুসৌল আক্রমণ করে। ইতোমধ্যেই আই এস আই এস এর সাথে কুর্দ স্বায়ত্ত শাসনাধীন অঞ্চল ও তার সেনাবাহিনীর লড়াই শুরু হয়ে যায়। ১১ জুন আই এস আই এস তেল সংশোধনাগারের শহর বাইজি আক্রমণ করে। সেদিনই তারা তিরকিত দখল করে নেয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য তিরকিত ছিল সাদ্দাম হুসেনের জন্মস্থান ও বিকাশের এলাকা। ১২ জুন তারা উধাইম নামক একটি ছোট শহরের দখল নিয়ে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের ৯০ কিমির মধ্যে চলে আসে।
১৩ জুন থেকে ইরাকি সেনাবাহিনী, কুর্দদের বাহিনী এবং ইরানের ‘রিভোলিউশনারি গার্ড’ রা মিলিতভাবে আই এস আই এস বিরুদ্ধে অস্ত্র শানাতে থাকে। বাগদাদ থেকে অতিরিক্ত সেনাবাহিনী এসে সামাররা পুনরুদ্ধার করে। সালাউদ্দিন প্রদেশ পুনরুদ্ধারের দাবিও তারা করেছে। ওইদিনই ইরাকের সর্বোচ্চ শিয়া ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলি সিসতানি যুদ্ধের ডাক দিলে একদিনের মধ্যেই তৈরি হয় বিরাট মিলিশিয়া। ইরাকের সেনার পাশাপাশি তারাও আই এস আই এস এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
আই এস আই এস এই সময় থেকে চোরাগোপ্তা অসংখ্য ছোটখাট হামলা ও অপহরণের রাস্তা গ্রহণ করে। মুসৌলের এক তুর্কি কোম্পানীতে কর্মরত চল্লিশজন ভারতীয় নাগরিককে তারা অপহরণ করে। অনেক ভারতীয় নার্সকেও অপহরণ করা হয়। ২৩ জুন আই এস আই এস বড় ধরণের সাফল্য পায়। ওইদিন তারা তাল আফার বিমানবন্দরের দখল নিয়ে নেয়। ২৯ জুন আই এস আই এস এর নাম পরিবর্তন করে শুধু ইসলামিক স্টেট বা আই এস করে নেয়। ঘোষনা করে নয়া খিলাফৎ এর। আবু বকর আল বাগদাদিকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করে তারা বিশ্বের সমস্ত মুসলিমের কাছে এর স্বীকৃতির জন্য বার্তা পাঠায়। তারা শুধু সিরিয়া বা ইরাকেই নয়, এক বিস্তৃত ভূখণ্ড জুড়ে তাদের শাসন কায়েম করতে চায়। সমগ্র মুসলিম সমাজ তাদের খিলাফৎ এর ঘোষিত লক্ষ্য হলেও আপাতত ইরাক, সিরিয়া ও তার সংলগ্ন অঞ্চলই তাদের নিশানার মধ্যে আছে, যার মধ্যে পড়ে সমগ্র লেভান্ট অঞ্চল অর্থাৎ জর্ডন, ইসরায়েল, প্যালেস্টাইন, লেবানন, দক্ষিণ তুর্কি এবং সাইপ্রাস।
ইরাকের গৃহযুদ্ধ কোনদিকে গড়াবে তা বলা শক্ত। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এবং ইরাকের ঘটনার গতিপ্রকৃতি থেকে আশঙ্কা হয় এই রক্তক্ষয়ও দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে। বিশেষত আন্তর্জাতিক মহলও যখন ইরাক ও সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে কোনও ঐক্যমত্যে পৌঁছতে পারে নি। মুসলিম বিশ্ব গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতিতে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। সুন্নিপ্রধান সৌদি আরব, তুর্কি এবং কাতার বিদ্রোহীদের সমর্থন করেছে। অন্যদিকে ইরাণ এবং লেবাননের হিজবুল্লা গোষ্ঠী সরকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। সিরিয়ার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি আরব লিগ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাষ্ট্রসংঘ সিরিয়ার শাসকদের আক্রমণ করলেও চীন এবং রাশিয়া সিরিয়া সরকারের পক্ষেই দাঁড়িয়েছে। ইরাকের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহল ইপ্সিত এবং দ্রুত কোনও শান্তির সমাধান হাজির করতে পারে কিনা, সেদিকেই সবাই তাকিয়ে আছেন।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

"আমেরিকাকে আবার মহান করব" বলে এসে যিনি দুনিয়ার সবাইকে বিরক্ত করলেন, ভোটাররা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হুমকি ধমকি আর উম্মাতাল আঁতলামির... ...বাকিটুকু পড়ুন

×