somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইজরায়েল প্যালেস্টাইন দ্বন্দ্ব

১৩ ই জুলাই, ২০১৪ রাত ১১:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ইতিহাসের দিকে ফিরলে আমরা দেখতে পাই ১৯৪৮ এ ইজরায়েল রাষ্ট্র গঠনের সময় থেকেই তা প্যালেস্টাইন তথা আরব দুনিয়ার সাথে [মার্কিন ও ন্যাটোর মদতে] বারবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়েছে। অথচ বিশ শতকের প্রথম দিকেও প্যালেস্টিনিয় ও ইহুদী জাতিসত্তার আন্দোলনের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ছিল। ১৯২০ র ফ্রান্স সিরিয়া যুদ্ধে সিরিয়ার পরাজয়ের পর এই শান্তি ক্রমশ বিঘ্নিত হতে শুরু করে। প্যালেস্টিনিয় জাতিসত্তার আন্দোলনের এই পর্বের অন্যতম রূপকার হজ আমিন আল হুসেইনি প্যালেস্টিনিয় আরবদের নিজস্ব দেশের দাবিকে সামনে নিয়ে আসেন। এই সময়েই ইউরোপে ফ্যাসিস্তদের ইহুদী বিতাড়ণ ও নিপীড়ণের অধ্যায় শুরু হলে তারা প্যালেস্টাইনে চলে আসতে থাকেন। প্যালেস্টাইনে বাড়তে থাকা ইজরায়েলি জনসংখ্যার চাপের প্রেক্ষিতে আরব প্যালেস্টিনিয়দের নিজেদের দেশের দাবি সঙ্কটজনক হয়ে উঠছে বিবেচনা করে আমিন হুসেইনি ইহুদী জাতিসত্তার আন্দোলনকে আরব প্যালেস্টিনিয় জাতিসত্তার আন্দোলনের প্রধান শত্রু হিসেবে ঘোষণা করেন। বিভিন্ন আরব দেশে আরব প্যালেস্টিনিয় জাতিসত্তার আন্দোলন এর সমর্থন তৈরি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই প্যালেস্টানিয় ইহুদী ও প্যালেস্টিনিয় আরবদের মধ্যে বেশ কিছু রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা হয়। ইতোমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জুড়ে জার্মানী সহ নাৎসী ও ফ্যাসিস্তদের দ্বারা বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক ইহুদী বিতাড়ণ ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর পরই ইউরোপ এর নানাদেশ থেকে বিতাড়িত ইহুদীদের পুনর্বাসনের প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জেনারেল অ্যাসেম্বলী প্যালেস্টাইনকে তিনভাগ করার একটি প্রস্তাব গ্রহণ করেন, যার একটি হবে আরব রাষ্ট্র, একটি ইহুদী রাষ্ট্র ও আলাদা অঞ্চল হিসেবে থাকবে জেরুজালেম, যে ঐতিহাসিক শহর ইহুদী, খ্রীষ্টান ও মুসলিম – এই তিন ধর্মেরই অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান। এই ঘোষণার পরদিন থেকেই আরব ও ইহুদীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। ১৯৪৮ এর বসন্তের মধ্যে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে যায় ইহুদীরা সামরিকভাবে অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠে অনেক ভূখণ্ড নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছে, জমি হারিয়ে উদ্বাস্তু হতে হয়েছে হাজার হাজার প্যালেস্টিনিয় আরবকে। অন্যদিকে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে প্যালেস্টিনিয় আরবদের প্রতি ব্যাপক সমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে সেইসব অঞ্চলের ইহুদীদের উদ্বাস্তু হয়ে চলে আসতে হয় প্যালেস্টাইনের দিকে। ১৪ মে ১৯৪৮ ইজরায়েল রাষ্ট্র গঠিত হবার পরেই আরবদের সম্মিলিত বাহিনীর সাথে নবগঠিত ইজরায়েলের যুদ্ধ শুরু হয়। ১৫০০০ মানুষ হতাহত হবার পর ১৯৪৯ এ যুদ্ধবিরতি হয়। ইজরায়েল তার ভূখণ্ডের বেশিরভাগ জায়গাই নিজেদের দখলে রাখে, ওয়েস্টব্যাঙ্ক যায় জর্ডনের অধিকারে, গাজা স্ট্রিপের দখল থাকে মিশরের হাতে। পরে এই দুই ভূখণ্ড মিলিয়ে ‘সমগ্র প্যালেস্টাইন সরকার’ কে স্বীকৃতি দেয় আরব লীগ। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এই গাজা স্ট্রিপ ও ওয়েস্টব্যাঙ্কই বর্তমানে আরব প্যালেস্টানিয় জাতিসত্তার আন্দোলনকারীদের দখলে আছে, আর জাতিসংঘ তথা পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশ না মানলেও ইজরায়েল এ দুটিকে তাদের দেশের অন্তর্গত বলে দাবি করে চলেছে। ১৯৫৬ তে ‘সুয়েজ সঙ্কট’ এর সময় কিছুদিনের জন্য ইজরায়েল গাজা স্ট্রিপ দখল করলেও তাদের সেখান থেকে অচিরেই বিতাড়িত হতে হয়। এর পরেই আরব জাতিসত্তার আন্দোলন একটা বড় ধাক্কার মুখে পড়ে, মিশর, আরব দেশগুলির প্রধান নেতা হিসেবে ‘সমগ্র প্যালেস্টাইন সরকার’ কে ভেঙে দিয়ে তাকে ‘সংযুক্ত আরব রিপাবলিক’ এর অংশ করে নেয় ১৯৫৯ সালে। এর প্রতিক্রিয়াতেই ১৯৬৪ তে আরব প্যালেস্টিনিয় জাতিসত্তার আন্দোলনের নতুন অধ্যায় শুরু হয় ইয়াসের আরাফতের নেতৃত্বে ‘প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন’ বা পি এল ও গঠনের মধ্য দিয়ে। আরব লিগের বিভিন্ন দেশ পি এল ও কে সমর্থনও করে। ১৯৬৭ র ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ পি এল ও তথা আরব প্যালেস্টিনিয় জাতিসত্তার আন্দোলনের ওপর এক বড় আঘাত হিসেবে আসে, যার মধ্যে দিয়ে ইজরায়েল ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক ও গাজা স্ট্রিপ দখল করে নেয়। পি এল ও তার সদর দপ্তরকে বাধ্য হয়ে সরিয়ে নেয় জর্ডনে। ১৯৭০ এ জর্ডন প্যালেস্টাইন বিতর্ক ও গৃহযুদ্ধের পর পি এল ও র সদর দপ্তর আবার সরে আসে দক্ষিণ লেবাননে। আশির দশকে লেবাননে গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষিতে আরাফতের সিদ্ধান্তে পি এল ও র সদর দপ্তর আবার সরে আসে তিউনিশিয়াতে। এই সময় আন্তর্জাতিক দুনিয়া ইজরায়েল প্যালেস্টাইন সংঘর্ষ বিরতিতে হস্তক্ষেপ করে, যার ফলে ১৯৯৩ তে খানিকটা শান্তিপ্রক্রিয়া ‘ওসলো চুক্তি’ র মাধ্যমে সংগঠিত হয়। পি এল ও তিউনিশিয়া থেকে ফিরে আসে গাজা স্ট্রিপ ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক এ এবং সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশানাল অথরিটি’। প্যালেস্টিনিয়দের কোনও কোনও অংশ এই শান্তিচুক্তি মানতে পারেনি, তারা প্যালেস্টিনিয় সরকার এর নীতির সমালোচনা শুরু করে, চালাতে থাকে ইজরায়েলের ওপর চোরাগোপ্তা আক্রমণ। এদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে হামাস। গাজা স্ট্রিপে তারাই প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। ২০০০ সাল থেকে ইজরায়েল প্যালেস্টাইন দ্বন্দ্ব ক্ষণিক বিরিতির পর আবার নতুন করে জাগ্রত হয়। প্যালেস্টাইনের অভ্যন্তরেও পি এল ও-র প্রধান অংশ ফতেয়া ও হামাস এর অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ শুরু হয়, তা ২০০৭ সাথে গাজা যুদ্ধের চেহারায় আত্মপ্রকাশ করে। ছোটখাট বিতর্ক সংঘর্ষ সত্ত্বেও ২০০৯ এ তাদের মধ্যে একটি শান্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ২০১১ তে প্যালেস্টাইন অথরিটি জাতিসংঘে [ইউনাইটেড নেশনস] সদস্যপদের আবেদন ইজরায়েল ও তার মিত্র দেশগুলির প্রবল বিরোধিতায় বাতিল হয়। এই ঘটনা নতুন সংঘর্ষের জন্ম দেয়। হামাস নেতৃত্বাধীন গাজা স্ট্রীপ থেকে ইজরায়েল এর বিরুদ্ধে রকেট হানা চলতে থাকে। ২০১২ তে ইজরায়েলের আগ্রাসী আক্রমণে শুরু হওয়া যুদ্ধকে সে এরই প্রতিক্রিয়া বলে ব্যক্ত করতে চেয়েছে।
এটা স্পষ্ট আরব প্যালেস্টিনিয় জাতিসত্তার পূর্ণ মর্যাদা ছাড়া এই চলমান যুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ের কোনও স্থায়ী সমাধান থাকতে পারে না। ইজরায়েল মার্কিন ন্যাটো অক্ষ কিছুতেই স্বাধীন ভূখণ্ড ও জাতিসংঘে সদস্যপদ সহ আরব প্যালেস্টিনিয়দের দীর্ঘকালীন ন্যায্য দাবিকে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। এই প্রত্যাখ্যানই নানা জঙ্গী আক্রমণের দিকে প্যালেস্টিনিয় জাতিসত্তার আন্দোলনকে ঠেলে দেয় ও তাকে অজুহাত করে ইজরায়েল ন্যাটো মার্কিন অক্ষের সমর্থনে পালটা হামলা চালায়। বস্তুতপক্ষে ইজরায়েলের মধ্য দিয়ে আরব দুনিয়ায় মার্কিন অক্ষ নিজেদের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কৌশল হিসেবেই ইজরায়েল প্যালেস্টাইন সংঘর্ষকে জিইয়ে রেখেছে।
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×