
আবহমানকাল (১ম পর্ব )
ডিস্ট্রিক বোর্ডের পাকা সড়কের গা ঘেঁষে পুরনো এক মন্দিরের ভেতর ভগবান শিবের খুব বড় একটি পাথরের মূর্তি আছে । সে কারনেই হয়তো এই এলাকাটির নাম “শিববাড়ী“। মন্দির থেকে কয়েক মিটার দূরে উঁচু পাঁচিল ঘেরা লোহার গেট দেওয়া দোতলা বাড়িটি জয়দীপ চক্রবর্তীর। জয়দীপ নিজেই এই বাড়ীটি নির্মাণ করেন তার বিবাহের পর পর। তবে বাড়ীটি পুরনো ধাঁচের তৈরী। বাড়ীর সামনে উঠানের মত খোলা জায়গার এক পাশে রান্না ঘর অন্য পাশে টিন দিয়ে ঘেরা শান বাঁধানো কলতলা। ওয়াসার লাইন এখনো এই এলাকাতে আসেনি। টিউবওয়েলের পানিই ভরসা। রান্নার কাজে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ দেয়া হয়নি তাই কাঠ পুড়িয়েই রান্নার আয়োজন করতে হয়। সকালের পুজা পাঠ শেষে নাস্তার আয়োজনে খুব ব্যস্ত সময় কাটে আরতি দেবীর । বাঁধা কাজের লোক থাকলেও রান্না ঘরের সব তিনি নিজে করতেই পছন্দ করেন । সকালের নাস্তায় আলুর দমের সাথে গরম লুচি সুদিপের প্রিয়। তিনি নিজে হাতেই লুচি তৈরী করে তেলে ভেজে নিচ্ছেন ---সুদীপ রান্নাঘরে এসে মোড়া টেনে মায়ের মুখোমুখি বসে। আরতী দেবী গভীর মমতায় ছেলের দিকে তাকান দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ছেলেটা আমার হোস্টেলে কি কি যে খায়! ছেলের দিকে চেয়ে আদরমাখা গলায় বলেন ---কিছু বলবি বাবা ? সুদিপ হেসে ডানে বায়ে মাথা নাড়ে। উঠোন জুড়ে ঝকঝকে শীতের মোলায়েম রোদ ছড়িয়ে আছে। কাজে ব্যস্ত সোনার চুড়ি পরা মায়ের হাত দুটি অস্থির নাড়াচাড়া সেইসাথে সুস্বাদু খাবারের গন্ধ ! আহ! বাড়ী আসার পর এই সময়টা তার ভীষণ প্রিয়!
----"কিগো খেতে দাও বেলা হয়েছে" জয়দীপ ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলে উঠে।
আরতি দেবীর ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়।
-- "ঘরে যেয়ে বোস আমি আনছি" লুচি সাজাতে সাজাতে সুদীপ কে তাড়া দেন তিনি।
দোতালায় উঠার সিঁড়ির মুখেই খাবারের টেবিল। আরতি দেবী স্বামী-পুত্রের থালায় খাবার যত্নে তুলে দেন । হঠাৎ কর্কশ শব্দে ফোন বেজে উঠে। "সাত সকালে কোন বাড়ীতে যেয়ে ডাকতে হবে"! এই কথা জয়দীপ আত্মতৃপ্তির সাথে গর্ব করেই বলে থাকেন। গলা উচিয়ে অর্চনাকে ফোন ধরতে বলেন। তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন শহরের নামকরা পরিবারে। পুজা পার্বণে মেয়েরা যখন জামাই সন্তান নিয়ে বেড়াতে আসে আনন্দে মুখর হয়ে উঠে জয়দীপের সংসার। জয়দীপ আত্মতৃপ্ত পান। অর্চনা জয়দীপের ছোট মেয়ে। তাঁর বিয়ে দিয়েছেন তিন মাস আগে। সুদীপের জন্যই সে এখন বাবার বাড়ী। অর্চনা দোতলাতেই ছিল তার শোবার ঘরে।
সিঁড়ির কাছে এসে অর্চনা উতসাহ নিয়ে বলে "সিরাজ কাকার ফোন -- তার ভাই ঢাকা থেকে"।
যতটা উতসাহ নিয়ে খবরটা জানায় ততটা উত্সাহে তাদের পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। তার এই উৎসাহের কারন বুঝে আরতি দেবী মুখ টিপে হাসেন । কারন খুব স্পষ্ট। কারন করবি। "বড় ভালো মেয়ে করবি, প্রথম যখন অর্চনার সাথে এ বাড়ীতে আসে আমার পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিল। আহা ঠিক যেন ঘরের লক্ষী। আশীর্বাদ করি তার উপযুক্ত বর মিলুক"।
করবী প্রসঙ্গে সুদীপের কিছুটা অস্বস্তি লাগে তার মনে হয় করবীর জন্য তার ভাল লাগা মা-বাবা না টের পেয়ে যায়! পরিবেশ কিছুটা হাল্কা করতে বলে ---"মা ওরা প্রণাম করেনা মুসলমানেরা করে সালাম"
গ্রামের প্রাইমারি স্কুল পাস করা আরতী দেবীর কাছে ঢাকা বিশ্ববুদ্যালয়ে পড়া ছেলে সুদীপ অনেক বেশী বিদ্যান। এমন বিদ্যান ছেলে যা বলবে সবটাই ঠিক। তিনি গর্ব অনুভব করেন। বলেন ---"হ্যা তুই যা বলিস"
--"জানো মা, ঐ প্রণাম আর সালাম কিন্তু একই ব্যাপার। দুটোতেই ভক্তি দেওয়া। আশীর্বাদ চাওয়া"।
সুদীপ তখনও নাস্তার টেবিলে বাবার সাথে অপ্রাসংগিক কথায় ব্যস্ত। তাঁদের সামনে দিয়ে অর্চনার সাথে করবী দুপদাপ সিড়ি ভেংগে উপরে উঠে যায়। দুজনার চাপা হাসির শব্দে বুঝা যায় ইতিমধ্যে দুজনার ভেতর সখ্যতা ভীষণ। করবীকে নিজের বাড়ীতে আবার দেখে সুদিপ ঘোরের ভেতর থাকে যেন। বাবা মা সামনে থাকায় ওদিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছেনা। মাথা নিচু করে খেয়ে যায়। খাওয়া শেষ করে কলতলায় এসে দাঁড়ায় । এখান থেকে দোতালার প্রায় পুরোটাই দৃষ্টিগোচর হয়। করবীর অকারণ খিলখিল হাসি সুদীপ মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকে। তাঁর বুকের ভেতর ছন্দময় অনুভুতি টের পায়। ভাবে এই বয়সে মেয়েরা অকারনেই হেসে উঠে। তাদের হাসি সংক্রমিত করে সুদীপকেও। চারটি চোখ একে অপরকে দেখতে থাকে, ভীষণ লজ্জা করবীকে ঘিরে ধরে;
আনন্দময় পরিবেশ চারিদিক।
অর্চনার কাছে খুব জানতে ইচ্ছে করছে সুদীপের কথা। কিন্তু অর্চনা সুদীপের ব্যাপারে কোন আগ্রহ নেই তার সব আগ্রহ নতুন শশুর বাড়ী থেকে কি কি উপহার পেয়েছে সে সব করবীকে দেখানর জন্য। অর্চনার উপর কিছুটা বিরক্ত হয়েই করবী চলে আসে। লোহার গেট ঠেলে বের হয়ে আসতেই সুদীপ কে দাঁড়ানো দেখে সে। কিছুটা চমকে উঠে। সুদীপ মুচকি হেসে বলে---"এত ভীতু তুমি! জলজ্যান্ত মানুষ দেখে ভয় পাও"? করবী কিছু বলতে পারেনা পাশ কাটিয়ে চলে যায়। জানুয়ারীর সকালে শীতের হীম জড়ানো চারপাশ আবেশ লেগে থাকে যেন। গায়ে লাল পশমী শালে নিজেকে জড়িয়ে পিঠে ভর্তি এলো চুলে পাকা রাস্তার উপর দিয়ে হেঁটে যায় করবী। পেছন থেকে সুদীপ খুব আস্তে ডাকে "করবী!" কেউ যেন শুনতে না পায়। কিন্তু করবী ঠিক শুনেছে । পিছন ফিরে তাকায়। হাসে। অবাক ভাললাগা ছড়িয়ে পরে দুজনার ভেতর ।
(৩য় পর্ব শেষ করিনি এখনো )
ছবিটি গুগল থেকে নেওয়া

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
