somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মহাভারতের চরিত্রসমূহ - ১ : রাজা ভরত

১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ১১:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পৃথিবীতে মহারাজ হইল ভরত।
অশ্বমেধ যজ্ঞ আদি করে শত শত।।
লক্ষ পদ্ম সুবর্ণ ব্রাহ্মণে দিল দান।
দাতা যে নাহিক কেহ ভরত সমান।।
সসাগরা পৃথিবী শাসিল ভুজবলে।
অদ্যাপি ভারতভূমি ঘোষে ভূমণ্ডলে।।
তাঁর বংশে যতজন হইল নরপতি।
ভরতের বংশ বলি পাইল সুখ্যাতি।।

মহর্ষি বিশ্বামিত্র ছিলেন প্রাচীন ভারতে একজন রাজা। তিনি কৌশিক নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি যোদ্ধা এবং ব্রহ্মার ‍মানসপুত্র প্রজাপতি কুশ নামীয় রাজার প্রপৌত্র ও খুবই ধার্মিক কুশান্যভ রাজার পুত্র গাধি’র সন্তান ছিলেন মহর্ষি বিশ্বামিত্র। গাধিরাজের মৃত্যুর পর বিশ্বামিত্র রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন এবং বীর বিক্রমে রাজ্যশাসন করতে থাকেন। তিনি অতুল ঐশ্বর্য্রও বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী ছিলেন। এছাড়াও, তার শতাধিক পুত্র ও অসংখ্য সৈন্য ছিল।


বিশ্বামিত্র কোন একদিন এক অক্ষৌহিণী সেনা (১০৯৩৫০ পদাতিক, ৬৫৬১০ অশ্ব, ২১৮৭০ হস্তী এবং ২১৮৭০ রথ) ও পুত্রদেরকে সাথে নিয়ে মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে উপস্থিত হলে মুনি কামধেনু নন্দিনী (আরেক নাম শবলা)র সাহায্যে উপস্থিত সকলকে পূর্ণ তৃপ্তিসহকারে ভোজন করান। একটি সাধারণ আশ্রমে এতো বিপুলসংখ্যক লোকের খাদ্য সরবরাহের বিষয়ে বিশ্বামিত্র আগ্রহী হয়ে কামধেনুর অবিশ্বাস্য গুণাবলী জেনে বশিষ্ঠের কাছে তা প্রার্থনা করেন। বশিষ্ঠ জানান যে, নন্দিনী হচ্ছে ইন্দ্রের কামধেনুর কন্যা, এর সাহায্যে যখন যা চাওয়া হয তাই পাওয়া যায়। বিশ্বামিত্র সবলাকে নিতে চাইলে বশিষ্ঠ কামধেনুকে দান করতে অস্বীকার করেন এবং উভয়ের মধ্যে তুমুল বাদানুবাদ ও তীব্র বিবাদের সৃষ্টি হয়। বিশ্বামিত্র তার সুদক্ষ সৈনিকদের সহায়তায় বলপূর্বক কামধেনুকে কেড়ে নিতে উদ্যত হলে ঋষিবর শবলার সাহায্যে অসংখ্য সৈন্য সৃষ্টি করে রাজার সমূদয় সৈন্যদল ধ্বংস করে ফেলেন। এছাড়াও, অন্যান্য রাজপুত্র বশিষ্ঠকে আক্রমণ করতে এগিয়ে আসলে মহর্ষি ব্রহ্মতেজে বিশ্বামিত্রের শতপুত্রকে দগ্ধ করে ফেলেন।

বিশ্বামিত্র এরূপে সৈন্যবিহীন অবস্থায় ও শতপুত্রশোকে কাতর হয়ে নিজ রাজধানীতে ফিরে এসে অবশিষ্ট এক পুত্রের কাঁধে রাজ্যের শাসনভার প্রদান করে বনে গমন করেন ও মহাদেবের কঠোর তপস্যায় মনোনিবেশ করেন। মহাদেব বিশ্বামিত্রের তপস্যায় অতি সন্তুষ্ট হয়ে বর প্রদানে উপস্থিত হলে বিশ্বামিত্র তার নিকট মন্ত্রসহ সাঙ্গোপাঙ্গ ধনুর্বেদ সম্পূর্ণ আয়ত্ত করে নেন। পরে তিনি মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে পুণরায় গমন করে তপোবন নষ্ট করে ফেলেন এবং পরে ঋষিবরের উপর পুণরায় অস্ত্রবর্ষণ করেন। কিন্তু বশিষ্ঠদেব ব্রহ্মদণ্ড হাতে নিয়ে বিশ্বামিত্রের সমস্ত অস্ত্রের মোকাবেলা করেন। এরূপে হতমান ও হতদর্প হয়ে বিশ্বামিত্র অস্ত্রবলের চেয়ে ব্রহ্মবলের শ্রেষ্ঠত্ব উপলদ্ধি করেন এবং নিজে ব্রাহ্মণত্ব লাভ করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। সেজন্য তিনি পত্নীসহ দক্ষিণে গমন করে কঠোর তপস্যা করতে লাগলেন। এ সময়ে তার আরো তিন পুত্রের জন্ম হয়। অনেক অনেক বছর পরে ব্রহ্মা স্বয়ং উপস্থিত হয়ে বিশ্বামিত্রকে রাজর্ষিত্ব প্রদান করেন।

বিশ্বামিত্রের দীর্ঘকালের কঠোর তপস্যায় পরিতুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা তার কাছে আসেন ও ঋষিত্ব প্রদান করেন। কিন্তু তাতেও বিশ্বামিত্র পরিতুষ্ট না হয়ে পুণরায় উগ্র তপশ্চরণে প্রবৃত্ত হন। এ সময়ে ইন্দ্রের নির্দেশে অপ্সরারূপী মেনকা পুষ্করতীর্থে স্নান করতে গেলে ঋষিবর তার রূপে বিমোহিত হন এবং তার সহবাসে দশ বৎসর যাপন করেন। মেনকা’র গর্ভে শকুন্তলা নাম্নী কন্যার জন্ম হয়। দশ বৎসর পরে চৈতন্য ফিরে পাওয়ায় বিশ্বামিত্র মেনকাকে বিদায় দিয়ে অতি বিষণ্নচিত্তে উত্তরদিকে গমন করেন এবং হিমাচলে কৌশিকী নদীর তীরে পুণরায় কঠোর তপশ্চরণে প্রবৃত্ত হন।

তপস্যার্জিত পুণ্যফল ক্ষয়ের জন্য ক্রুদ্ধ হয়ে বিশ্বামিত্র মেনকা ও তাঁর কন্যাকে পরিত্যাগ করে চলে যান। এরপর মেনকাও তাঁর শিশুকন্যাকে একটি বনে পরিত্যাগ করে চলে যান। ঋষি কন্ব সেই কন্যাটিকে পক্ষীপরিবৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন। তিনি মেয়েটির নামকরণ করেন শকুন্তলা। এরপর শকুন্তলাকে নিজ আশ্রমে এনে লালন পালন করতে থাকেন।

রাজা দুষ্মন্ত মৃগয়ায় এসে একটি হরিণকে তাড়া করতে করতে কন্বের তপোবনে এসে উপস্থিত হন। এখানেই শকুন্তলার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তাঁরা পরস্পরের প্রেমে পড়েন ও আশ্রমেই তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়।বিবাহের পরে তারা সহবাস করে। এরপর জরুরি কাজে দুষ্মন্তকে রাজধানীতে ফিরে যেতে হয়। যাওয়ার আগে দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে একটি রাজকীয় অঙ্গুরীয় দিয়ে যান এবং কথা দেন যে আবার ফিরে আসবেন।

এরপর শকুন্তলা অহর্নিশি দুষ্মন্তের কথা ভাবতে লাগলেন। একদিন কোপনস্বভাব ঋষি দুর্বাসা কন্বের আশ্রমে এলে শকুন্তলা পতিচিন্তায় মগ্ন হয়ে ঋষিসেবায় অবহেলা করে। এতে দুর্বাসা ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে শাপ দেন যে, যাঁর কথা চিন্তা করতে করতে শকুন্তলা ঋষিসেবায় অবহেলা করেছে, সেই শকুন্তলাকে বিস্মৃত হবে। শকুন্তলার সখীরা তাঁর হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে, দুর্বাসা শান্ত হয়ে তাঁকে ক্ষমা করেন এবং বলেন যদি সেই ব্যক্তির দেওয়া কোনো উপহারসামগ্রী শকুন্তলা তাঁকে দেখায়, তবে আবার তিনি শকুন্তলাকে চিনতে পারবেন।

এদিকে দুষ্মন্ত ফিরে আসছেন না দেখে শকুন্তলা নিজেই দুষ্মন্তের রাজধানীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথে নদীতে স্নান করতে নেমে তিনি দুষ্মন্তের দেওয়া অঙ্গুরীয়টি হারিয়ে ফেলেন। এরপর অঙ্গুরীয় ছাড়াই দুষ্মন্তের রাজসভায় উপনীত হলে, দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে চিনতে পারেন না। অপমানিতা শকুন্তলা বনে চলে আসেন। সেখানে জন্ম দেন এক পুত্রসন্তানের। ঋষি কন্ব এই পুত্রের নামকরণ করেন সর্বদমন। শৈশবেই সর্বদমন হয়ে ওঠেন অকুতোভয় ও প্রবল পরাক্রমী। ছেলেবেলায় তাঁর খেলা ছিল সিংহকে হাঁ করিয়ে তার দাঁতকপাটি গোনা।

ইতিমধ্যে এক ধীবর মাছ ধরতে গিয়ে একটি মাছের পেট থেকে রাজার অঙ্গুরীয়টি উদ্ধার করে। সেটি দেখে দুষ্মন্তের শকুন্তলার কথা মনে পড়ে যায়। তিনি তাঁকে খুঁজতে বের হন। অনেক খুঁজে তিনি শেষে সিংহের সঙ্গে ক্রীড়ারত এক বালকের সন্ধান পান। নাম জিজ্ঞেস করতে ছেলেটি বলে সে দুষ্মন্তের পুত্র সর্বদমন। এরপর সর্বদমন দুষ্মন্তকে শকুন্তলার কাছে নিয়ে যায়। আবার সকলের মিলন ঘটে।

সর্বদমনের নতুন নামকরণ হয় ভরত।

তিনি সমগ্র ভারতীয় ভূখণ্ড জয় করেন। এই কারণে তাঁর রাজত্ব ভারতবর্ষ নামে পরিচিত হয়।

ভরতের স্ত্রীর নাম ছিল সুনন্দাদেবী। সুনন্দাদেবী ছিলেন সাধ্বী রমণী। তবু তাঁর সকল সন্তানই জন্মের পরমুহুর্তেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়। পুত্রাকাঙ্ক্ষায় তিনি গঙ্গাতীরে মরুইসোম যজ্ঞ করেন। ফলে ভরতের ভিমণ্যু নামে এক পুত্র জন্মে। তাঁর বংশেই পরে পাণ্ডবদের জন্ম হয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬ রাত ৯:২৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গল্পঃ মোহাম্মদপুরে কখনও বিচ্ছেদ হয় না

লিখেছেন রাজসোহান, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪





আমার দোকানের নাম নিউ শাপলা কম্পিউটার ও ফটোস্ট্যাট। সাইনবোর্ডের শাপলা ফুলটা এঁকে দিয়েছিলো তাজমহল রোডের এক সাইনম্যান, দেখতে হয়েছিলো কচুরিপানার মতো। চৌদ্দ বছর ধরে ঝুলে আছে। রোদে রঙ উঠে... ...বাকিটুকু পড়ুন

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×