কৃষ্ণ মেঘের ছায়া
রাত প্রায় গভীর। চারিদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ও মেঘের ফাঁকে ফাঁকে চাঁদের আলোর লুকোচুরি দক্ষিণের জানালার আলতভাগে আঁছড়িয়ে পড়ছে। দিনের বেলা অঝোরে বর্ষা নেমেছিলো। তাই সন্ধ্যা হতে না হতেই মানুষ যার যার ঘরে বর্ষার মেঘের মতই শান্ত হয়ে পড়েছে। দূরের পদ্মার গর্জন ক্ষীণ স্বরে কানে আসছে। গ্রেটার রোডের পাশে সান্ত্রীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা শিরীষ গাছের পাতার নড়াচড়ার শব্দ যেন অণিকের কানে বাজছে। অণিক শুয়ে শুয়ে অতীত স্মৃতি মন্থন করছে আর ভাবছে ; হায় জীবন!
অণিক দূরসম্পর্কের এক মামার কাছে মানুষ। কবে বাবা-মা তাকে ফেলে পালিয়েছে না-কি মারাই গিয়েছিলো ? তার নির্ঘণ্ট নিয়ে আমাদের না ভাবলেও চলবে। কারণ অনন্তলোকে কতো পুষ্প বিকশিত হয় , কতক ঝরে যায় আবার কতক অঙ্কুরেই মিলিয়ে যায়। তাই বলে বন-দেবী কেঁদে কেঁদে হয়রান হবে ! এ-কথা হলফ করে বলতে পারিনে।
অণিক পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের তৃতীয় বর্ষের ম্যাকানিকেলের ছাত্র। ইতিমধ্যে মামা জগতিবাবু এবং মামী লীলাবতি ইহলীলা সাঙ্গ করে পরধামে পাড়ি জমিয়েছেন। সংসারের একমাত্র উত্তরাধিকারী শ্রী নরোত্তম , জগতিবাবুর জ্যৈষ্ঠ পুত্র এবং কনিষ্ঠা কন্যা শ্রাবন্তী। শ্রী নরোত্তম পড়ালেখার তেমন ধার ধারেনি। ছোটো বেলায় একবার জগতিবাবু বহু অনুনয়ে করোনেশন স্কুলে প্রথম ক্লাসে ভর্তি করেছিলো। কিন্তু আজ আর কারোরই মনে পড়ে না। সেদিক থেকে শ্রাবন্তী পরিপাটি , সুশৃঙ্খল ও পড়ালেখায় বেশ মনোযোগী। হাটি হাটি পা পা করে শ্রাবন্তী পৌর বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রি। শুধু তাই নয়, জগতের অনেক কিছুই আজ সে বুঝতে শিখেছে। তার এই অনেক কিছু বুঝতে পারাই যে একদিন অণিকের কাল হয়ে দাঁড়াবে , তা কে জানত ? জ্যোতিষ শাস্ত্রে এমন কিছু লেখা আছে বলে আমার কখনই মনে হয় না । তবুও জগতে এ ঘটনা বিরল নয়।
শরতের এক বিকেলে বাড়ির ছাদের দক্ষিণের পূর্ব কোণে অণিক পাতা চেয়ারে বসে প্রকৃতির স্নেহের আবেশে চোখ বুলাচ্ছিলো। চোখের ঠিক সামনে সারিবাঁধা শুপারি ও নারিকেল গাছ। তার পরেই পদ্মপুকুর। কে কবে কী কারণে এতবড় পুকুর খনন করেছিলো ; সে বিষয়ে হিসেব করে প্রত্নতাত্ত্বিকরা মরুক ; তাতে আমার-বা-পাঠকের কিছু যায় আসবে না। ঠিক যেন রূপকথার দেও-দৈত্যের কাটা পুকুর। দৈর্ঘ্যেও যেমন প্রস্থেও তেমন। তার জলের কিনারে দু-একটি কলমিলতার ফুল বাতাসের তোড়ে জড়াজড়ি করছে। পুকুরের পরপাড়ে কৃষক বধুরা কোমরে কাপড় গুঁজিয়ে ধান-শুকানোর কাজে ব্যস্ত। উঠানের পাশে একপাল নেঙটা ছেলে-মেয়ে একবার দক্ষিণে একবার উত্তরে ছুটাছুটি করছে। হয়তো বা বিহঙ্গচারী পক্ষীকুলের মতই ঐ ছুটোছুটিতে আকাশে উড়ার সাধ মিটিয়ে নিচ্ছে। পুকুরের দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে নাটোর সড়ক। সন্ধ্যা হলেও দু-একটি মটর-গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছার প্রাণান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে।
ইতিমধ্যেই যে শ্রাবন্তী ছাদে উঠেছে, অণিকের পাশে বসেছে ; দু-একটি অ-প্রাসঙ্গিক ও খাপছাড়া কথাও যে বলেছে, পাঠক তা ভেবে নিতে পারেন। উত্তর আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি সারিবদ্ধ ভাবে পশ্চিমের আকাশে অদৃশ্য হচ্ছে। অণিক তির্যক চোখে এটা উপভোগ করছিলো। পাখি যতই পশ্চিমে যাচ্ছিলো অণিক ততই তার চোখ পশ্চিমে সরাচ্ছিলো। হঠাত করেই যেন তার চোখ শ্রাবন্তীর চোখে আচমকা একটা ধাক্কা খেয়ে নিচে নেমে এলো।
রাত্রি আটটার দিকে শ্রী নরোত্তম বাবু বাসায় ফিরে আসলেন। এই লোকটি একটু অন্যধাচের। পড়ালেখায় মনোযোগী না হলেও শ্রী নরোত্তম বাবার ব্যবসার শ্রী যে অক্ষুন্ন রাখবে, এটা কেউ বোঝার কথা নয়। শহরে সে এখন একজন প্রতিষ্ঠিত কাপড় ব্যবসায়ী। তার ধোপদোরস্ত পোশাক – আশাক, চলাফেরা ও খরচের পরিমাণ দেখলেই বোঝা যায়।
ইতিমধ্যে শ্রাবন্তী বি.এ পাশ করেছে এবং অণিকও উত্তরের কোনো এক রেল কোম্পানিতে চাকুরি পেয়েছে। শ্রাবন্তী অষ্টাদশী নয়। তাও দুবছর পার হয়ে গিয়েছে। খুব ছোটো বেলা থেকেই অণিককে সে দেখেছে। কিন্তু এখন দেখলে যেমনটি হয় ; তেমনটি আগে কখনও হতো বলে শ্রাবন্তীর মনে পড়ে না। তাই এটা তার এখন প্রায়ই চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সেটা যে শুভ্র বা কৃষ্ণ মেঘের ছায়া তা সে ঠিক ততখানি ভেবে দেখেনি।
সেবার পুঁজর ছুটিতে অণিক বাড়ি এলো। এ এলাকায় মুসলমানদের আবাস বেশি হলেও হিন্দু সম্প্রদায় যে খুব একটা কম তা ঠিক বলা যাবে না। এটি যে একটি বড় মাপের শহর তাও নয়। তবে শহরে প্রায় দশটি পুজো মণ্ডপ রয়েছে। গত মৌসুমে আউসের ফলন ভালো হওয়াতে ব্যবসায়ীদের ব্যবসাও হয়েছে তেমন। ফলে সব পুজো মণ্ডপে এবার যে দুর্গা পুজোত্সব হবে তা নিশ্চিত। সেই সাথে সাথে বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়েদের আনাগোনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশের ললিত বোসের নবপরিণীতা কন্যা-জামাই এসেছে। শ্রাবন্তীর সঙ্গে ঘণ্টা-দুয়েক গল্পও করেছে। দেখেছি রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা উপন্যাসখানিও বেশ পাতা উল্টিয়ে উল্টিয়ে নাড়াচাড়া করেছে।
এতক্ষণে পাঠকের আর বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় যে অণিক শ্রাবন্তীর চেয়েও খুব বেশি করে রবীন্দ্রনাথের সে-ই ‘সম্পদ' পাবার ভাবনায় বিভোর হয়েছে। অণিকের ভাবনার মধ্যেই পুজোর ছুটি শেষ হয়ে গেলো। এবার চাকুরি স্থলে ফিরবার পালা ।
রবিবার সকাল আটটার ট্রেনে করে অণিক উত্তরের পথে যাত্রা করল। প্রথম শ্রেণির কম্পাটমেন্টের দু’ছিটের একটি কামরা রিজার্ভ করে দিয়েছিলো শ্রী নরোত্তম বাবু। এই নরোত্তম বাবু এমন একজন মানুষ যিনি ব্যবসা ছাড় জগতের আর কিছু লক্ষ্য করেন কিনা তা কারও জানা থাকবার কথা নয়। কারণ তিনি আটচল্লিশ বছর বয়সেও কোনো কন্যার দ্বারস্থ হননি। ইতিমধ্যেই শ্রাবন্তী ও অণিকের মনের কোণে বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির কণা জমে কালো মেঘে পরিণত হয়েছে ; সেদিকে তার কোনো খেয়াল তিনি কখনই করেননি। যেমনটি করেননি নিজের দিকে।
ইদানিং লক্ষ্যকরা যাচ্ছে , শ্রী নরোত্তম বাবুর বাড়ির বৈঠক খানায় ব্যবসায়ী বন্ধুদের বেশ আড্ডা বসে থাকে এবং তা মধ্যরাত অবধি চলে। ব্যবসায়িক আলাপচারিতার ফাঁকে ফাঁকে এখন সেখানে জীবনের কথাও চলে। ‘নরোত্তম বাবু নরোত্তমই থেকে গেলেন’ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই বুঝলেন না ; ছোটো বোনটারে এবার বিবাহ দিন,ইত্যাদি।
বৈশাখের ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাসায় ফিরে শ্রাবন্তীর হাতে ঠিকানা লেখা খামে করে একখানি। পত্র অণিকের হাতে দিয়ে গেলো দশ-বারো বছরের নারায়ণ। এই নারায়ণই অণিকের কর্মক্ষেত্রের একমাত্র সঙ্গী । এই বালক, অণিককে রান্না হতে শুরু করে প্রায় সকল কাজেই সাহায্য করে থাকে। পত্র খানা অণিকের হাতে দিয়ে সে সগর্বে বলল, ‘দাদাবাবু ,এতে তোমার বাড়ির খবর আছে।’সে আগে বহুবার তার হাতে পত্র তুলে দিয়েছে কিন্তু এমন কথা কখনই বলেনি। সে এবার কেনো একথা বলল, তা অণিকেরও ভাববার কথা নয় । পাঠকই সে হিসেব করে কাগজের কলের প্রসার ঘটাক।
অণিক রাত্রের ভোজন শেষে বিছানায় শুয়ে বেশ আয়েশ করে চিঠির খামটি ছিড়তে লাগলো এবং ভাবতে লাগল শ্রাবন্তী কী কী লিখেছে। কিন্তু চিঠি খুলে লেখা দেখে এবং পড়ে বহুক্ষণ আড়ষ্ঠ হয়ে বসে থাকল।বুকের মধ্যে কেমন একটা যন্ত্রণা অনুভব করল। বুকের বাম পাঁজরের নিচে ঢিপ ঢিপঢিপ করে বলতে লাগল, ‘অণিক তোর শ্রাবন্তীর মাথার উপর মেঘ করেছে,এখনই মনে হয় অঝোর ধারায় বর্ষা নামবে।’ পরের দিন অফিসে গিয়ে সাতদিনের ছুটির দরখাস্ত লিখে স্থানীয় কর্মকর্তার নিকট পেশ করল কিন্তু ছুটি মিলল না। কারণ তখন খুব জোড়ে-সোরে ভারতীয় দেশগুলোর কনফেডারেশন গড়ার কাজ চলছিলো এবং সেই সাথে রেল কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসার সম্প্রসারণের চেষ্টায় ছিলো কর্মতৎপর ।
অণিকের নাওয়া-খাওয়া প্রায় বন্ধের পথে। মাথার চুল উস্কু-খুস্কু। এদিকে শ্রী নরোত্তম বাবু জগতকে তার নিজের মতো করে ভেবে নিয়ে ভগ্নির বিবাহের দিনক্ষণ ঠিক করে অণিকের জন্য ভগ্নি-বিবাহের লগ্ওনাভেঙে দিতে পারেন না নরোত্তম বাবু।
এদিকে অণিক ছুটির বহু চেষ্টা করে যখন ব্যর্থ হলো তখন চাকুরিতে ইস্তফা পত্র লিখে ডাকে ফেলে দিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। যেদিন বাড়ি পৌঁছিলো সেদিন ১৩-ই জ্যৈষ্ঠ ।
রেল স্টেশন থেকে বাড়ি বেশি দূরে নয় বিধায় অণিক ঘোড়ার কোচয়ায় করে মিনিট কয়েকের মধ্যে শিরিষ গাছের নিচে গিয়ে গাড়োয়ানকে গাড়ি থামাতে বলল ; সানাইয়ের মধুর সুর যেন করুণ সুর হয়ে অণিকের কানে বাজতে লাগল। ধীরে ধীরে সে সুর কাছে আসতে লাগল এবং কোচয়ার পাশ দিয়ে শহরের ভিতরের দিকে তিন-চারটি যন্ত্র চালিত গাড়ি বিচিত্র সাজে সেজে পার হয়ে গেলো ।
অণিক যেন কিছুই দেখিল না, কিছুই বুঝিল না। কতো পরিচিত মুখ তার পাশ দিয়ে পার হয়ে গেলো, কিন্তু তার কথা কেউ ভুলেও মনে করিল না। সানাইয়ের সুরধ্বনি ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়া গেলে কোচয়ান বলিল,বাবু ? অণিক কিছুই বলিল না ;গাড়ি থকে নামিলও না ! কোচওয়ান কোচয়া ঘুরিয়ে ঘোড়ার পাছায় হস হস করিয়া দুইটি চাবুক কষিয়া দিলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





