![]()
বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাটি --একথাটা যিনি বলেছেন তিনি অনেক ভেবেচিন্তে এদেশের পূর্বাপর ইতিহাসকে মাথায় রেখেই একথা বলেছিলেন। এ অঞ্চলের মানুষের স্বাধীকার আন্দোলনের প্রতিটি ইতিহাস ধরে হাঁটলে এর প্রমাণ পাওয়া যায় অসংখ্য। এই মাটি যুগে যুগে বীরদের জন্ম দিয়েছে, তাদেরকে লালন করেছে এবং যখন সময় এসেছে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নেয়ার যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে সামনের কাতারে। আর তারাও এ মাটির মর্যাদা রক্ষা করেছে সর্বোতভাবে।
আমাদের এমনি অনেক বিপ্লবীদের মাঝে নক্ষত্রের মতো জ্বলছে একজন যার কথা আমরা অনেকেই জানিনা। তিনি হলেন এদেশে টম ও কৃষক আন্দোলনের পথিকৃত হাজংমাতা রাশিমণি।
এই বিপ্লবী নেত্রী জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯৮ সালে বর্তমান নেত্রকোণা জেলার ধোবাউরা উপজেলার বেদীকুড়া গ্রামে। ছোটকাল থেকেই তিনি ছিলেন মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে সোচ্চার। তাই এদেশে ব্রিটিশ ও জমিদারী প্রথার প্রতি তার ছিল প্রচন্ড ক্ষোভ। সে থেকেই তিনি জড়িয়ে পড়েন কৃষক ও মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। জড়িয়ে পড়েন টংক আন্দোলনে।
টং আন্দোলন হচ্ছে ব্রিটিশ ভারতের সর্বশেষ গণআন্দোলন। ময়মনসিংহ অঞ্চলের আধিবাসী হাজং গোষ্ঠী মূলত এই আন্দো সংগঠিত করে। আর তাদের নেতৃত্ব দেয় সুসং দুর্গাপুরের জমিদার সন্তান মনি সিংহ। দীর্ঘ ১২ বছর চলে এই আন্দোলন। প্রাণ হারায় ৬০ জন মানুষ। ব্রিটিশরা অনেকের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। নেতৃত্ব দেয়ার কারণে মনি সিংহ এর বাড়িঘর দখল করে নিয়ে তাতে হালচাষ শুরু করে ব্রিটিশরা।
জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলনে প্রথম থেকে জড়িত ছিলেন হাজংমাতা রাশিমণি। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারী ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বহেড়াতলী গ্রামে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হন হাজংমাতা রাশিমণি ও তার দল। যুদ্ধের এক পর্যায়ে ব্রিটিশ বাহিনীর গুলিতে তার সহযোদ্ধা সুরেং হাজত শহীদ হন। রাশমণি এর প্রতিশোধ নিতে নিজেই এগিয়ে যান এবং দায়ের আঘাতে দুজন ব্রিটিশ সৈন্যের শিরচ্ছেদ করেন। এক পর্যায়ে ব্রিটিশ সেনাদের হাতে তিনিও নিহত হন। রাশমণি এবং সুরেন্দ্র হাজং হলেন টংক আন্দোলনের প্রথম শহীদ।
প্রচলিত আছে যে সুরেন্দ্র হাজংয়ের হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য রাশিমণির ডাকে কেউ এগিয়ে না এলে তিনি এই বলে তাদেরকে তিরস্কার করেছিলেন যে, ‘ ময় তিমাদ তিমাদলী মান ময় রুক্ষা কুরিব না তে মরিব। তুরা তুমলী নীতি নিয়া বুইয়া থাক।’ এর অর্থ হলো -- আমি নারী। নারীর মান-সম্ভ্রম আমিই রক্ষা করব, না হয় মরব। তোমরা তোমাদের নীতি নিয়ে বসে থাক।’ রাশিমণির এই উক্তিটি তার স্মৃতিসৌাধে অংকিত রয়েছে।
এই অকুতোভয় বীর যোদ্ধার স্মরণে নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার ছয় কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেড়াতলী গ্রামে চৌ-রাস্তা মোড়ে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ রাশিমণি স্মৃতিসৌধ। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারী স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করা হয়। এটি নির্মাণে সহযোগীতা করেছে হাজংমাতা রাশিমণি মেমোরিয়াল ট্রাষ্ট। ট্রাষ্টটির চেয়ারপারসন হচ্ছেন খুশী কবির। জমি দান করেছেন মোহাম্মদ সাহাব উদ্দিন তোতা। স্মৃতিসৌধটির স্থপতি হচ্ছেন শেখ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারী রাশিমণি দিবস ও টংক শহীদ দিবস পালন উপলক্ষে এখানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



