somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সুফিয়া
গ্রাম-প্রকৃতি-সবুজ-সারল্য যেখানে মিলেমিশে একাকার, সেখানে ফিরে যেতে মন চায় বার বার।

তাজউদ্দিন আহমেদ-রাজনীতিতে যিনি নিজেই ছিলেন নিজের শিক্ষক।

০৮ ই জুন, ২০১৪ বিকাল ৪:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

তাজউদ্দিন আহমেদ-রাজনীতিতে যিনি নিজেই ছিলেন নিজের শিক্ষক।
(তাজউদ্দিনের ডায়েরী প্রসংগে)


বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির যে ধারা তাকে এক কথায় বলা যায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বিবর্জিত রাজনীতি। আর ছাত্র রাজনীতি যে কলুষিত ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে সে সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার অবকাশ নেই। তাই বলে একথা বলা যাবে না যে, বাংলাদেশের রাজনীতি তার সূচনালগ্ন থেকে এই ধারায় চলে এসেছে। আমাদের অতীতের রাজনীতি ছিল স্বচ্ছ ও নিস্কলুষ। কারণ তখনকার রাজনীতির পুরোধা ব্যক্তিরা ছিলেন মেধা ও প্রজ্ঞার এক একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। তারা রাজনীতি করতেন সত্যিকার দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে।

আমাদের গর্ব করার মতো এমনি অনেক এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে একজন হলেন শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ-রাজনীতিতে যিনি নিজেই ছিলেন নিজের শিক্ষক। ১৯৪৬-৫৬ সাল পর্যন্ত সময়ে লেখা তার ডায়েরী কালের সাক্ষী হিসেবে তার এই পরিচয় বহন করছে। তখন তিনি ছিলেন ২২ বছরের যুবক। একনিষ্ট ছাত্র রাজনীতিবিদ হলেও কোন রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কথা ভেবে তিনি ডায়েরী লিখেননি। তথাপি তার এই ডায়েরীকে বলা যায় তৎকালীন রাজনীতির আয়না। আজকের ছাত্র রাজনীতিবিদদের জন্য মহামূল্যবান শিক্ষার খনি। কারণ তাজউদ্দিন আহমেদ এবং তার সম-সাময়িকরা যে শুদ্ধ ও স্বচ্ছ রাজনীতির চর্চা করে গেছেন এই ডায়েরী তার একটা জলজ্যান্ত দলিল।

আমরা জানি, সমাজের জন্য-দেশের জন্য কিছু করতে হলে মানুষকে আত্ম-প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে এগোতে হয় অর্থাৎ নিজের কাছে আগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হয়। তাজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন এর মূর্ত প্রতীক। দেশের জন্য কিছু করার লক্ষ্যে তিনি প্রতিশ্রুতিবব্ধ ছিলেন নিজের কাছে। অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তিনি এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেন। এর প্রমাণ মিলে তার ডায়েরী থেকে। তার ডায়েরী ছিল তার বিচারের কাঠগড়ার মতো। প্রতি দিনশেষে একবার এর মুখোমুখি হতেন তিনি তার দিনলিপি নিয়ে।

তিনি ছিলেন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার প্রজ্ঞা, মেধা ও সাহসিকতার পরিচয় রেখে গেছেন তিনি অনেক ক্ষেত্রে। ঐতিহাসিক ছয় দফার অন্যতম রূপকার ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ-যা বাঙালী জাতির মুক্তি আন্দোলনের মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছিল। স্বাধীনতার পর দেশের পূর্ণগঠনে তার সাহসী সিদ্ধান্ত সদ্য স্বাধীন বাঙালী জাতির আত্ম-মর্যাদাকে তখন বিশ্ব দরবারে এক ধাপ উচুঁতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যত কষ্টই হোক আমাদের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী কোন রাষ্ট্রের সাহায্য আমরা নিব না। পরবর্তীতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রির উপদেষ্টা ডি. পি. ধর তাজউদ্দিনের এই সাহসিকতা ও দূরদর্শিতার কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছিলেন।

জাতির আপদকালীন সময়ে দেশকে এমন দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্ব দানের জন্য তাজউদ্দিন আহমেদ নিজকে নিজেই গড়ে তুলেছিলেন আপোসহীন রাজনীতিক হিসেবে। তার রাজনৈতিক দর্শনে শ্লোগানবাজির কোন স্থান ছিল না। ছিল দৃঢ় প্রত্যয়, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার স্বাক্ষর। এ দিয়েই তিনি বাঙালী জাতিকে তার আত্ম-অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, মুজিব নগরের সরকারের প্রধানমন্ত্রি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সেই উদ্বুদ্ধ জাতিকে যথাযথভাবে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন।

আসলে তার নেতৃত্বের গুণাবলী ছিল প্রশ্নাতীত। বাঙালী জাতির পরম সৌভাগ্য যে তাজউদ্দিন আহমেদ এর মতো নেতার জন্ম হয়েছিল এদেশে। একই সাথে আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, এমন মহান নেতার রাজনৈতিক আদর্শকে আমরা আমাদের রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্রে ধারণ করতে পারিনি। আজকে আমরা যে আলোকিত বিশ্বের স্বপ্ন দেখি, যে স্বচ্ছ ও নির্লোভ রাজনীতির কথা বলি, তাজউদ্দিন আহমেদের মতো লোকেরা বেঁচে থাকলে তার বাস্তবায়ন হতো অনেক আগেই।

২৩ জুলাই এই মহান নেতার জন্মদিন। ১৯২৫ সালের এই দিনে তিনি কাপাসিয়া থানার দরদরিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের মক্তবে। এরপর ভুলেশ্বর প্রাইমারী স্কুল। চতুর্থ শ্রেণীতে উঠে স্কুল পরিবর্তন করে ভর্তি হন বাড়ি থেকে ৫ মাইল দূরে অবস্থিত কাপাসিয়া মাইনর ইংরেজী স্কুলে। এরপর একে একে কালিগঞ্জ সেন্ট নিকোলাস ইনষ্টিটিউশান, ঢাকার মুসলিম বয়েজ হাইস্কুল। সবশেষ সেন্ট গ্রেগরীজ হাইস্কুল থেকে থেকে মেট্রিকুলেশান পাশ করেন। ছোটকাল থেকে তাজউদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। বরাবর তিনি ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতেন। প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় তার শিক্ষাজীবনে বার বার বাধা এসেছে। তা সত্ত্বেও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন এবং জেলে বন্দী অবস্থায় আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। আমরা অনেকেই জানি না যে জনাব তাজউদ্দিন কুরআনে হাফেজ ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ধর্মের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।


যাই হোক, পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি উদ্যোগী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৩-৫৭ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট তাকে গৃহবন্দী করা হয় এবং পরে জেলখানায় স্থানান্তর করা হয়। ৩ নভেম্বর বিশ্ব ইতিহাসে কলংকজনক অধ্যায় রচনার মধ্য দিয়ে জেলখানায় বন্দী অবস্থায় তাকে রাতের অন্ধকারে অন্য তিন নেতাসহ তাকে হত্যা হয়।

মৃত্যুর তিনঘন্টা আগে তার লেখা আরও একটি ডায়েরীর কথা তিনি তার স্ত্রীর কাছে বলেছিলেন। ঐ রাতেই শেষ হওয়ার কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত ঐ ডায়েরী। কিন্তু এর কোন সন্ধান আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ঐ ডায়েরীর সন্ধান পাওয়া গেলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনীতি সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য সম্পর্কে জানা যেত।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০১৪ বিকাল ৪:১৩
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×