সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ মিন্নাত আলী ও “আমার প্রথম প্রেম।”
আমার কলেজ জীবনের প্রথম দিনের স্মৃতি এটি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহিলা কলেজে (বর্তমানে সরকারী) প্রথম দিনের প্রথম ক্লাস বাংলা। কিন্তু নির্ধারিত প্রভাষক অনুপস্থিত। প্রিন্সিপাল স্যার ঢুকলেন ক্লাসে, হাতে একটি বই। এর আগে কলেজে ভর্তির দিন প্রথম পরিচয় হয়েছিল প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে। লম্বা-ফর্সা, শ্মশ্রুমন্ডিত সৌম্যকান্তি চেহারার একজন নিরেট ভদ্রলোক। পাজামা-পাঞ্জাবী ও মাথায় টুপি পরা সদাহাস্য ঐ মুখের দিকে তাকালে কোন শত্রুও বোধহয় উনার প্রতি বিগলিত না হয়ে পারব না। সেদিনই প্রথম জেনেছিলাম যে, উনিই সেই সাহিত্য অনুরাগী ব্যক্তিত্ব অধ্যক্ষ মিন্নাত আলী। কলেজে আমার প্রথম দিনের প্রথম ক্লাসে উনাকে পাব এমনটা কখনও ভাবিনি। আমি এই ঘটনাকে আমার জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক বলে মনে করলাম। হাতের বইটি টেবিলের উপর রেখে নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে আমাদেরকে কিছু উপদেশ বাণী শুনালেন স্যার।
একে তো আমাদের প্রথম দিনের ক্লাস, নির্ধারিত প্রভাষক নেই। তাই প্রিন্সিপাল স্যার এসেছেন। উনার হাতে অত সময় নেই যে ক্লাসের পুরোটা সময় ধরে উনি আমাদের সাথে থাকবেন। তাই সবার নাম পরিচয় জেনে নিজের সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও উপদেশ বাণী দেয়ার পর অত্যন্ত খুশী খুশী মোড নিয়ে স্যার বললেন,
আমার প্রথম প্রেম কে নিতে চাও ? দেখি কার সাহস আছে ?
আমি দ্বিতীয় বেঞ্চে বসা ছিলাম। স্যার টেবিলে বইটি রাখার সময় বই এর নামটা আমার চোখে পড়েছিল। বাবার বয়সী অমন একজন ভদ্রলোকের মুখ থেকে এই ধরনের প্রশ্ন শুনে অনেকে হতবাক হয়ে গেলেও আমি সাথে সাথে দাঁড়িয়ে বললাম, আমি নিব স্যার।
স্বাভাবিকভাবে ক্লাসের সব মেয়ের দৃষ্টি আমার মুখের উপর নিবদ্ধ হল। মিন্নাত আলী স্যার বইটি হাতে নিয়ে আমার কাছে এগিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি ?
আমি উত্তর দিলাম, সুফিয়া বেগম।
স্যার সাথে সাথে বইটি খুলে দ্বিতীয় পাতায় আমার নামটি লিখে অটোগ্রাফ দিলেন। তারপর বইটি উঁচু করে ধরে সব মেয়েদেরকে দেখিয়ে বললেন,
এই হলো “আমার প্রথম প্রেম।” বুড়োর প্রেম বলে কেউ নিতে সাহস পেলেনা। কিন্তু সুফিয়া সেই সাহস দেখিয়েছে। কাজেই বইটি আমি ওকে দিলাম। তোমরা যারা পড়তে আগ্রহী ওর কাছ থেকে নিয়ে পড়তে পার। তবে বইটির মালিকানা থাকবে সুফিয়ার।
ক্লাসের প্রথম দিন এমন একটা সুন্দর ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের দৃষ্টিতে পড়া মানে আমার বাজিমাত করার মতো অবস্থা।
আমি কলেজ হোস্টেলে থাকতাম। আমদের হোস্টেল, কলেজ ও প্রশাসনিক ভবন একই বাউন্ডারীর ভিতর অবস্থিত। প্রায়ই প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে দেখা হত। প্রথম দিনের ঘটনার পর স্যার আমাকে মনে রেখেছেন। এরপর আলাপ প্রসংগে একদিন যখন জেনেছেন যে আমি ভৈরব থেকে এসেছি, তখন যেন আমার প্রতি উনার মনযোগ আরও বেড়ে গেল। প্রায়ই আমার কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন। স্যারের জন্মস্থান ভৈরব হলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় উনি স্থায়ীভাবে বাস করতেন। ‘শুভবাড়ি’ নামে উনার যে বাড়িটি ছিল সেখানে একাধিকবার গিয়েছি আমি। স্যারের ব্যক্তিগত লাইব্রেরী ঘুরেফিরে দেখতাম। সুযোগ পেলেই স্যার বলতেন, পড়বে, বেশী করে পড়বে। ক্লাসের বই, বাইরের বই, যে কোন ভাল বই। যতই পড়বে, ততই জানতে পারবে।
যে সময়টার কথা বলছি সেটা ১৯৮১ থেকে ১৯৮৪ সালের কথা। আমি স্কুল জীবন থেকে সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম এবং প্রচুর বই পড়তাম। মিন্নাত আলী স্যার তখন ভৈরবের সহিত্য অঙ্গনে সুসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। কাজেই কলেজে ভর্তি হবার পর উনার সান্নিধ্য পেয়ে আমার সাহিত্য ভাবনাগুলো যেন পাখা মেলতে শুরু করল। স্যারের “আমার প্রথম প্রেম” বইটি হাতে পেয়ে আমি যেন বর্তে গেলাম। এটি ছিল একটি গল্পের বই। আমি সবগুলো গল্প পড়া শেষ করে তবে দিলাম অন্যদের পড়তে। বইয়ের একটি গল্পের কথা আমার আজও মনে আছে। গল্পটির নাম ছিল ‘সোনালী আঁশ, কৃষকের গলার ফাঁস।’ বাংলাদেশের যে পাট এক সময় ছিল কৃষকের স্বপ্ন-সাধনা, সেই পাট যখন তার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে, তখন কৃষকের মানসিক অবস্থার দিক তুলে ধরে স্যার গল্পটি লিখেছিলেন। ঠিক এই ধরনের সমাজের সমস্যাপীড়িত বাস্তব দিকগুলোকে তুলে ধরে গল্প লিখতেন মিন্নাত আলী স্যার। আমি আজ ভাবি, সেই আশির দশকে স্যার পাটকে কৃষকের গলার ফাঁস হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। আর আজ পাট যে অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, মিন্নাত আলী স্যার বেঁচে থাকলে এটাকে কি বলতেন ?
মিন্নাত আলী স্যার নেই, চলে গেছেন এই পৃথিবী ছেড়ে। স্যার যখন অসুস্থ ছিলেন তখন একবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শুভবাড়িতে গিয়েছিলাম স্যারকে দেখতে। সেটা সম্ভবত ২০০২ সালের দিকে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না স্যার। সেজন্য বাসায়ই কাটাতে হয় পুরোটা সময়। মেয়েরা বিয়ে করে চলে গেছে শ্বশুর বাড়িতে। ছেলে চাকুরী করছে অন্যত্র। দেখা হলো স্যারের মিসেস এর সাথে। আর ছিল তাদের গৃহপরিচারিকা। স্যারকে আবিস্কার করলাম উনার সেই প্রিয় লাইব্রেরী ঘরে। কথা বলেন খুব ধীরে ধীরে। প্রথমে আমাকে চিনতে পারেননি। আমি মনে করিয়ে দিলাম।
বললাম, আমি বন্যা আপার পরের ব্যাচে পাশ করেছি, আমার নাম সুফিয়া। (স্যারের বড় মেয়ে বন্যা কলেজে আমার এক ব্যাচ সিনিয়র ছিলেন)।
তবু দেখলাম, স্যার আমাকে চিনতে পারছেন না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার মুখের দিকে। আমি আবার বললাম, আমি ভৈরবের সুফিয়া। কলেজে প্রথম দিনের ক্লাসে আপনি আমাকে আপনার লেখা একটি বই দিয়েছিলেন। বইটির নাম “আমার প্রথম প্রেম।”
নিজের লেখা বইয়ের নাম শুনে একটু বুঝি জেগে উঠলেন স্যার। বললেন, পড়েছিলে বইটি ? আমি বললাম, হ্যাঁ পড়েছিলাম। সেটা তো কবেকার কথা ! কিন্তু এখন আর আপনার লেখা দেখিনা কেন ? লিখেন না আর ?
স্যার কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় স্যারের মিসেস বলেন, লিখবে কি করে ? ঠিকমত কলম ধরতে পারেনা, মনেও থাকেনা কোন কিছু।
আমি তখন আমার লেখালেখির কথা স্যারকে বললাম। মনে হলো যেন খুশী হয়েছেন স্যার। বললেন, বই বের করনি ?
আমি বললাম, এখনও করিনি। তবে করব।
স্যার আবার জিজ্ঞেস করলেন, কি কর ?
ব্যাংকে চাকুরী করে শুনে বললেন, লেখালেখির সময় পাও ?
স্যারের মুখ থেকে এই প্রশ্নটা শুনে আমার মনে হলো বাস্তব-উপলব্ধি জ্ঞান উনার একেবারে লোপ পায়নি। আমি উত্তর দিলাম, কোনমতে সময় বের করে লিখি।
আবার জিজ্ঞেস করলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কি জন্য এসেছ ? আমি জানালাম যে, আমার হাজব্যান্ড এখানকার জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা। এখানেই থাকে, সপ্তাহশেষে ঢাকায় যায়। আমি আপনাকে দেখার জন্য ওর সাথে চলে এসেছি।
দেখলাম স্যার খুব খুশী হলেন আমার কথায়। বললেন, আমার ছাত্রীরা কে কোথায় আছে কেউ খোঁজ নেয়না আমার। তুমি আবার এসো।
স্যারের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। কিন্তু আর যাওয়া হলনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কারণ, আমার হাজব্যান্ড এর কিছুদিন পরই বদলী হয়ে অন্যত্র চলে যান। মিন্নাত আলী স্যারের সাথে আর দেখা হয়নি আমার। শিক্ষাবিদ, সাহিত্য অনুরাগী আমার শ্রদ্ধেয় মিন্নাত আলী স্যারের মৃত্যুর খবর আমি ভৈরব থেকে পেয়েছিলাম। লম্বা-ফর্সা, শ্মশ্রুমন্ডিত সৌম্যকান্তি চেহারার সদাহাস্য সেই মুখটি আজও ভুলতে পারিনা। আমার কলেজ জীবনের প্রথম দিনের প্রথম ক্লাসে মিন্নাত আলী স্যারের উপস্থিতির দৃশ্যটি আজও আমার চোখের সামনে ঝল ঝল করছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



