পারিবারিক সহিংসতা, সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা ও আমার কিছু কথা।
ইদানীং একটি কথা আমার বারবার মনে হচ্ছে। আমার কেবলই মনে হচ্ছে যে, আমাদের চারপাশের বহমান সময়টা আমাদের নয়। সময়টা ক্রমেই চলে যাচ্ছে অন্য কারও হাতে। এখানে আমাদের বলতে আমি সেইসব মানুষদেরকে বুঝাতে চাচ্ছি যারা অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়,যে কোন সহিংসতার উর্ধ্বে থেকে একটি প্রশান্তিময় জীবন যাপন করতে চায়। এই শ্রেণীর মানুষদের জন্য সময়টা যে কতটা ভয়াবহ ও হিংস্র হয়ে উঠেছে তা অতি সহজেই বুঝা যায় আমাদের চারপাশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার দিকে তাকালে। খুন-ছিনতাই-ধর্ষন-নির্যাতন-আগুনে পুড়িয়ে মারা, সব মিলিয়ে এক ভীবৎস সমাজচিত্র আমাদের সামনে উপস্থিত। সমাজের সুশীল শান্তিপ্রিয় মানুষ মাত্রই এই ভীবৎসতার ঘোরতর বিরোধী। এমন একটা সময় প্রবাহ কখনও তাদের কাম্য নয়। তাই বলছিলাম যে, সময়টা আমাদের কারও কারও জন্য পর হয়ে গেছে।
যে ভীবৎসতার কথা বললাম, যেমন খুন-ছিনতাই-ধর্ষন-নির্যাতন-আগুনে পুড়িয়ে মারা ইত্যাদি অপরাধের অনুষংগগুলো আমাদের পারিবারিক পরিবেশকে যেমন কলুষিত করছে তেমনি সমাজের ভারসাম্যকেও নড়বড়ে করে তুলছে। অর্থাৎ আমরা বলতে পারি যে এ ধরনের পারিবারিক সহিংসতা সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে কলুষিত করছে, হুমকির সম্মুখীন করছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রণালীকে। পেছনদিকে খুব বেশী দূরে যাবার দরকার নেই। বিগত কিছুদিন ধরে আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া পারিবারিক সহিংস ঘটনাগুলোর কথা মনে করলে শরীর শিউরে উঠে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বা বিয়ে করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়ে এসিড নিক্ষেপ কিংবা আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা, যৌতুক কিংবা পরকীয়ার কারণে স্ত্রীকে হত্যা করা ইত্যাকার ঘটনা যেন সমাজের গতানুগতিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইদানীং অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে স্ত্রী কর্তৃক স্বামী হত্যার ঘটনাও ঘটছে। কারণ সেই একটাই -– পরকীয়া। এগুলোকে ছাপিয়ে সমাজকে ভীবৎসতম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যে ঘটনা তা হলো বাবা বা মা কর্তৃক সন্তানকে হত্যা। সমাজ-সভ্যতার এতদূর অগ্রগতির পরও আইয়ামে জাহেলিয়া যুগের এসব ঘটনার পুণরাবৃত্তি যে কোন মানুষের সুস্থ মননশীলতা তথা মননশীল অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্থ করছে নিঃসন্দেহে।
সে কারণে এসব দেখে আজকাল একটা ভাবনা আমার মনে খুব করে কাজ করছে। আমার কেবলই মনে হচ্ছে আমরা যতটা না সভ্য হচ্ছি তার চেয়ে বেশী বর্বরতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের এই এগিয়ে যাওয়া এতটাই দ্রুত ও সহিংস যে, তা অতি সহজেই আমার মনের ভিতরকার সভ্যতার অনুষংগগুলোকে নির্বিচারে হত্যা করে চলছে। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই যে, আমরা এগুলোকে প্রতিহত করতে পারছি না। অধিকন্তু যেন আত্মসমর্পন করে বসে আছি এসব সহিংসতার কাছে। অথচ আমরা একটুও ভেবে দেখি না যে, এসব সহিংস ঘটনা প্রতিনিয়ত সমাজ ও রাষ্ট্রের ভারসাম্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সমাজের সুশীল মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগ তো দূরের কথা, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্রসমূহও যেন এসব ঘটনার কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে।
তবে যদি শুধু পারিবারিক সহিংসতার কথা যদি বলি তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রশাসন যন্ত্রসমূহ এসব সহিংসতা দূর করতে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম ? কারণ, এসব ঘটনার পেছনের কারণ অত্যন্ত ষ্পর্শকাতর, এক কথায় মনোগত। মানুষের মনোগত দিক, সেটা ভাল হোক বা মন্দ হোক, বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কারও নেই যতক্ষণ না পর্যন্ত এর স্বরূপ বাইরে প্রকাশ পায়। আমি মনে করি সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্রসমূহের এর পরের ভূমিকা হওয়া উচিত অত্যন্ত কঠোর ও যথোচিত। দ্রুততম সময়ে এসব ঘটনার কঠোর ও কঠিন শাস্তি হলে আরও কিছু ঘটনা ঘটাবার আগে একটু হলেও ভাবত ঘটনার হোতারা।
বলছিলাম আমাদের সংবাদ মাধ্যমসমূহের ভূমিকার কথা। যে কোন ঘটনা বা দুর্ঘটনার খবর আমাদের মাধ্যমগুলো যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে আমাদের সামনে তুলে ধরছে এব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ আছে বলে আমি মনে করিনা। তবে একথা সত্য যে সমাজকে পীড়িত করে, মানুষের সুস্থ মননশীলতাকে কলুষিত করে এমন সব খবর যতটা প্রকাশিত হয়, তার চেয়ে বেশী অথবা সম পরিমাণ হয়তো অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে। টেলিভেশন চ্যানেলগুলো আজকাল এসব ঘটনা নিয়ে আলাদাভাবে অপরাধমূলক তথ্যনির্ভর অনুষ্ঠানও প্রচার করছে। এসব অনুষ্ঠানে ঘটে যাওয়া যে কোন অপরাধমূলক ঘটনার পূর্বাপর সবকিছুর সচিত্র প্রতিবেদন তুলে ধরা হচ্ছে। আমার সাধারণ হিসেব বলে অপরাধীকে শনাক্ত করে দ্রুততার সাথে আইনের আওতায় এনে যথোপযুক্ত শাস্তি দানের ক্ষেত্রে এসব অনুষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত যথেষ্ট সহায়ক ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এবং বিচারের প্রক্রিয়াকে সহজতর করতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছেনা। এর কারণ কি ? এক কথায় এর উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। তবে আমার কিছু ব্যক্তিগত মতামত এখানে তুলে ধরতে চাই।
প্রথমত ঃ- যে কোন অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে যাবার পর টেলিভিশন বা অন্য যে কোন সংবাদ মাধ্যমে যতটা গুরুত্বের সাথে ও বিস্তৃত আকারে প্রচার করা হয়, পরবর্তীতে এসব ঘটনার বিচার সংক্রান্ত অগ্রগতি ততটা গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হয়না। এমন কি কোন খোঁজ-খবরও নেয়া হয়না। বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবার পেছনে এটাও একটা কারণ হিসেবে কাজ করে।
দ্বিতীয়ত ঃ- নিজের সন্তান হত্যাকারী পিতা-মাতাকে গতানুগতিক বিচার প্রক্রিয়া থেকে আলাদা করে বিশেষ ধারায় বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়টি ভাবা যেতে পারে।
তৃতীয়ত ঃ- নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী প্রচলিত আইনগুলোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনবাধে এসব আইন সংশোধন করতে হবে। অপরাধের ধরন পরিবর্তনের সাথে সাথে আইনকে যুগোপযোগী না করতে পারলে সেই আইন প্রয়োগের মাধমে অপরাধের যথোচিত বিচার করা সম্ভব নয়।
চতুর্থত ঃ- অপরাধী যেই হোক, তার অপরাধকে শুধুই অপরাধ হিসেবে দেখতে হবে। সেই ব্যক্তি কে, কার কি হয় ? এসব বিবেচনায় না এনে তার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সর্বোপরি আমি মনে করি যে, মানুষে মানুষে পারষ্পরিক সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসবোধ না থাকলে এ ধরনের সহিংস অপরাধমুলক ঘটনার পুণরাবৃত্তি কোনমতেই রোধ করা সম্ভব নয়।
১১-১১-২০১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


