![]()
শৈশব থেকেই পড়াশুনার প্রতি আমার ছিল দুর্দান্ত আগ্রহ। আমি প্রথম স্কুলে গিয়েছি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর। এর আগে বাড়িতে নিয়মিত পড়াশুনা করতাম আমি। এখনও মনে আছে ‘সবুজ সাথী’ নামে একটি বই ছিল তখন। সুন্দর সুন্দর কবিতা আর গল্পে ভরা এই বইয়ের দুই/একটা কবিতার কথা এখনও আমার মনে আছে। যেমন - বাবুরাম সাপুড়ে/কোথা যাস বাপুরে/আয় বাবা দেখে যা/দুটো সাপ রেখে যা, আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা/ফুল তুলিতে যাই/ ফুলের মালা গলায় দিয়ে/মামার বাড়ি যাই, ভোর হলো দোর খোল/খুকুমণি উঠো রে/ঐ ডাকে জুঁই শাখে/ফুলকলি ছোট রে। আরও কত সুন্দর সুন্দর কবিতা ! তাছাড়া বাদশার মেয়ে জুলেখার গল্প, কৃষক গণি মিয়ার গল্প। স্কুলে ভর্তি হবার আগেই ‘সবুজ সাথী’ বইয়ের সব কবিতা আমি মুখস্থ করে ফেলেছিলাম, সব গল্প পড়ে ফেলেছিলাম। তাছাড়া সংখ্যা ও নামতা শেখার জন্য আব্বা ধারাপাত কিনে দিয়েছিলেন। তবে আমার ‘সবুজ সাথী’ বইটার দিকেই আকর্ষণ ছিল বেশী। তখন শিশু বয়সে ইংরেজী শেখার কোন বালাই ছিলনা। সম্ভবত ক্লাস ফোরে উঠে আমি প্রথম ইংরেজী বর্ণমালা শিখতে শুরু করেছিলাম। বাড়িতে রজব আলী মাস্টার আমাদেরকে পড়িয়ে যাবার পর আমি প্রায়ই পুকুর পাড়ের বেল গাছের বড় শিকড়টার উপর বসে উঁচু স্বরে ‘সবুজ সাথী’ বইয়ের কবিতা পড়তাম। তারপর খেলার সাথীরা এসে জড়ো হলে সব ফেলে ওদের সাথে চলে যেতাম। তবে ওদের কেউ আমার মতো বাংলা পড়তনা।
![]()
স্বাধীনতা সংগ্রামের পর আব্বা প্রথম আমাকে ভর্তি করাতে নিয়ে গেলেন লংগার পাড় প্রাইমারী স্কুলে। সেটা ১৯৭২ সালের কথা। হেড স্যারের সামনে আব্বা আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আব্বাকে বসতে দেয়া হলো পাশের একটি চেয়ারে। হেডস্যারের সামনে টেবিলের উপর একটি বেত। হেডস্যার আমাকে নাম জিজ্ঞেস করলেন। তারপর আব্বার নাম জিজ্ঞেস করলেন, একটি কবিতা বলতে বললেন। তারপর একটি নামতা, কোন নামতা সেটা আজ আর মনে নেই। আমি উত্তর দিচ্ছিলাম আর বারবার টেবিলের উপর রাখা বেতের দিকে ফিরে তাকাচ্ছিলাম। হেডস্যার কিছু একটা বুঝে বেতটা টেবিল থেকে নামিয়ে রেখে বললেন, ভয় নাই, মারবনা। তারপর আব্বার দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক আছে, ও পারবে। ভর্তি হয়ে গেলাম আমি স্কুলে। তবে ক্লাস ওয়ানে নয়, ক্লাস টুতে। মুক্তিযুদ্ধের কারণে স্কুলে ভর্তি হতে দেরী হওয়ায় এই ব্যবস্থা। ওয়ানের ক্লাস আমার আর স্কুলে পড়া হলনা।
স্কুলটা বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন হেঁটে স্কুলে আসতাম এবং ছুটির পর ঠিক তেমনভাবে বাড়ি ফিরতাম। স্কুলের চারপাশের পরিবেশের কথা এখনও মনে আছে। একটামাত্র পাকা ঘর। এতেই ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত ক্লাস হতো। বিভিন্ন শ্রেণীর জন্য আলাদা কোন ক্লাস রুম ছিলনা। প্রতিটি ক্লাস রুম চিহ্নিত করা ছিল মাঝখানে একটার উপর আর একটা বেঞ্চ পেতে। ফলে আমরা সবাই একজন আর একজনকে দেখতে পেতাম। স্কুলের সামনে ছিল একটা বড় খেলার মাঠ। এই মাঠের শেষ প্রান্তের ডান দিকে একটা খাল ছিল। বর্ষাকালে স্বচ্ছ পানি টলমল করত এই খালে। খালের পাড়েই ছিল একটা বড় তেতুল গাছ। এই তেতুল গাছের গোড়ায় বসে বুট-বাদাম খেতাম আর পানিতে খোসা ছুঁড়ে মারতাম। ছোট ছোট অসংখ্য মাছ তখন কিলবিলিয়ে উপরে উঠে আসত এগুলোকে তাদের খাবার ভেবে। এই দৃশ্য দেখতে খুব ভাল লাগত আমার।
স্কুলের ক্লাস শুরু হবার আধ ঘন্টা আগে এই তেতুল গাছ তলায় একটা ক্লাস হতো। এক স্যার বাঁশীতে ফু দিতেন। আমরা ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই খেলা ফেলে তেতুল গাছ তলায় এসে গোল হয়ে বৃত্তাকারে দাঁড়াতাম। একজন দাঁড়াত গোল বৃত্তের ঠিক মাঝখানে। সে নামতা বলত। আমরা সবাই সমস্বরে তার সাথে সাথে বলতাম, এক একে এক, দুই একে দুই, দুই দুগুণে চার ----। মাঝে মাঝে কবিতাও পড়তাম আমরা। আমার আজও মনে পড়ে, মাঝে মাঝে গোল বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি এই ক্লাসের নেতৃত্ব দিতাম। আধ ঘন্টা চলত এই ক্লাস। তারপর ঘন্টা পড়লেই সবাই দৌড়ে যে যার মতো ক্লাসে গিয়ে বসতাম। স্কুল ছুটি হতো দুপুরে। ছুটির ঘন্টা পড়লেই সবাই কলরব করতে করতে ক্লাস থেকে বের হয়ে আসতাম। তারপর বই-খাতা বুকে চেপে ধরে বাড়ির দিকে হাঁটতাম। আমার বাড়ির দিকে যাবার পথে আমিই ছিলাম সর্বশেষ জন। সবার বাড়ি আমার বাড়ি যাবার পথে আগে পড়ত। আমি যখন বাড়ি পৌঁছুতাম তখন সূর্য পশ্চিম দিকে হেলতে শুরু করেছে। সারাটা পথ আমাকে সূর্যের দিকে মুখ করে হাঁটতে হতো। বাড়ি ফিরলেই আম্মা তাই প্রথমে শাড়ির আঁচল দিয়ে আমার মুখটা মুছে দিতেন আর বলতেন, রোদে মুখটা পুইরা ছাই অইয়া গেছে।
হায় রে সময় ! আর একটিবার যদি আম্মা এসে তার শাড়ির আঁচলে আমার মুখটা মুছে দিতেন !
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মার্চ, ২০১৫ বিকাল ৫:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


