somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার স্কুলের প্রথম দিন/শৈশবের মধুর স্মৃতি অমলিন।

২১ শে মার্চ, ২০১৫ সকাল ১১:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আমার স্কুলের প্রথম দিন/শৈশবের মধুর স্মৃতি অমলিন।



শৈশব থেকেই পড়াশুনার প্রতি আমার ছিল দুর্দান্ত আগ্রহ। আমি প্রথম স্কুলে গিয়েছি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর। এর আগে বাড়িতে নিয়মিত পড়াশুনা করতাম আমি। এখনও মনে আছে ‘সবুজ সাথী’ নামে একটি বই ছিল তখন। সুন্দর সুন্দর কবিতা আর গল্পে ভরা এই বইয়ের দুই/একটা কবিতার কথা এখনও আমার মনে আছে। যেমন - বাবুরাম সাপুড়ে/কোথা যাস বাপুরে/আয় বাবা দেখে যা/দুটো সাপ রেখে যা, আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা/ফুল তুলিতে যাই/ ফুলের মালা গলায় দিয়ে/মামার বাড়ি যাই, ভোর হলো দোর খোল/খুকুমণি উঠো রে/ঐ ডাকে জুঁই শাখে/ফুলকলি ছোট রে। আরও কত সুন্দর সুন্দর কবিতা ! তাছাড়া বাদশার মেয়ে জুলেখার গল্প, কৃষক গণি মিয়ার গল্প। স্কুলে ভর্তি হবার আগেই ‘সবুজ সাথী’ বইয়ের সব কবিতা আমি মুখস্থ করে ফেলেছিলাম, সব গল্প পড়ে ফেলেছিলাম। তাছাড়া সংখ্যা ও নামতা শেখার জন্য আব্বা ধারাপাত কিনে দিয়েছিলেন। তবে আমার ‘সবুজ সাথী’ বইটার দিকেই আকর্ষণ ছিল বেশী। তখন শিশু বয়সে ইংরেজী শেখার কোন বালাই ছিলনা। সম্ভবত ক্লাস ফোরে উঠে আমি প্রথম ইংরেজী বর্ণমালা শিখতে শুরু করেছিলাম। বাড়িতে রজব আলী মাস্টার আমাদেরকে পড়িয়ে যাবার পর আমি প্রায়ই পুকুর পাড়ের বেল গাছের বড় শিকড়টার উপর বসে উঁচু স্বরে ‘সবুজ সাথী’ বইয়ের কবিতা পড়তাম। তারপর খেলার সাথীরা এসে জড়ো হলে সব ফেলে ওদের সাথে চলে যেতাম। তবে ওদের কেউ আমার মতো বাংলা পড়তনা।



স্বাধীনতা সংগ্রামের পর আব্বা প্রথম আমাকে ভর্তি করাতে নিয়ে গেলেন লংগার পাড় প্রাইমারী স্কুলে। সেটা ১৯৭২ সালের কথা। হেড স্যারের সামনে আব্বা আমাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আব্বাকে বসতে দেয়া হলো পাশের একটি চেয়ারে। হেডস্যারের সামনে টেবিলের উপর একটি বেত। হেডস্যার আমাকে নাম জিজ্ঞেস করলেন। তারপর আব্বার নাম জিজ্ঞেস করলেন, একটি কবিতা বলতে বললেন। তারপর একটি নামতা, কোন নামতা সেটা আজ আর মনে নেই। আমি উত্তর দিচ্ছিলাম আর বারবার টেবিলের উপর রাখা বেতের দিকে ফিরে তাকাচ্ছিলাম। হেডস্যার কিছু একটা বুঝে বেতটা টেবিল থেকে নামিয়ে রেখে বললেন, ভয় নাই, মারবনা। তারপর আব্বার দিকে তাকিয়ে বললেন, ঠিক আছে, ও পারবে। ভর্তি হয়ে গেলাম আমি স্কুলে। তবে ক্লাস ওয়ানে নয়, ক্লাস টুতে। মুক্তিযুদ্ধের কারণে স্কুলে ভর্তি হতে দেরী হওয়ায় এই ব্যবস্থা। ওয়ানের ক্লাস আমার আর স্কুলে পড়া হলনা।

স্কুলটা বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিন হেঁটে স্কুলে আসতাম এবং ছুটির পর ঠিক তেমনভাবে বাড়ি ফিরতাম। স্কুলের চারপাশের পরিবেশের কথা এখনও মনে আছে। একটামাত্র পাকা ঘর। এতেই ওয়ান থেকে ফাইভ পর্যন্ত ক্লাস হতো। বিভিন্ন শ্রেণীর জন্য আলাদা কোন ক্লাস রুম ছিলনা। প্রতিটি ক্লাস রুম চিহ্নিত করা ছিল মাঝখানে একটার উপর আর একটা বেঞ্চ পেতে। ফলে আমরা সবাই একজন আর একজনকে দেখতে পেতাম। স্কুলের সামনে ছিল একটা বড় খেলার মাঠ। এই মাঠের শেষ প্রান্তের ডান দিকে একটা খাল ছিল। বর্ষাকালে স্বচ্ছ পানি টলমল করত এই খালে। খালের পাড়েই ছিল একটা বড় তেতুল গাছ। এই তেতুল গাছের গোড়ায় বসে বুট-বাদাম খেতাম আর পানিতে খোসা ছুঁড়ে মারতাম। ছোট ছোট অসংখ্য মাছ তখন কিলবিলিয়ে উপরে উঠে আসত এগুলোকে তাদের খাবার ভেবে। এই দৃশ্য দেখতে খুব ভাল লাগত আমার।

স্কুলের ক্লাস শুরু হবার আধ ঘন্টা আগে এই তেতুল গাছ তলায় একটা ক্লাস হতো। এক স্যার বাঁশীতে ফু দিতেন। আমরা ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই খেলা ফেলে তেতুল গাছ তলায় এসে গোল হয়ে বৃত্তাকারে দাঁড়াতাম। একজন দাঁড়াত গোল বৃত্তের ঠিক মাঝখানে। সে নামতা বলত। আমরা সবাই সমস্বরে তার সাথে সাথে বলতাম, এক একে এক, দুই একে দুই, দুই দুগুণে চার ----। মাঝে মাঝে কবিতাও পড়তাম আমরা। আমার আজও মনে পড়ে, মাঝে মাঝে গোল বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি এই ক্লাসের নেতৃত্ব দিতাম। আধ ঘন্টা চলত এই ক্লাস। তারপর ঘন্টা পড়লেই সবাই দৌড়ে যে যার মতো ক্লাসে গিয়ে বসতাম। স্কুল ছুটি হতো দুপুরে। ছুটির ঘন্টা পড়লেই সবাই কলরব করতে করতে ক্লাস থেকে বের হয়ে আসতাম। তারপর বই-খাতা বুকে চেপে ধরে বাড়ির দিকে হাঁটতাম। আমার বাড়ির দিকে যাবার পথে আমিই ছিলাম সর্বশেষ জন। সবার বাড়ি আমার বাড়ি যাবার পথে আগে পড়ত। আমি যখন বাড়ি পৌঁছুতাম তখন সূর্য পশ্চিম দিকে হেলতে শুরু করেছে। সারাটা পথ আমাকে সূর্যের দিকে মুখ করে হাঁটতে হতো। বাড়ি ফিরলেই আম্মা তাই প্রথমে শাড়ির আঁচল দিয়ে আমার মুখটা মুছে দিতেন আর বলতেন, রোদে মুখটা পুইরা ছাই অইয়া গেছে।

হায় রে সময় ! আর একটিবার যদি আম্মা এসে তার শাড়ির আঁচলে আমার মুখটা মুছে দিতেন !
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মার্চ, ২০১৫ বিকাল ৫:৫৯
১৮টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দিল্লির রাজপথে তরুণদের ‘জেনজি ২.০’ অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী রূপান্তরের নির্মম বাস্তবতা

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮

ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে যা ঘটে গেল, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সত্যিই অভূতপূর্ব। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ জনতা পার্টির... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিমানবন্দরে নির্ঘুম রাত (সাময়িক পোষ্ট)

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৭

আমার এখানে বাজছে রাত প্রায় দুটা! এখনো জেগে আছি। জেগে থাকার শানে নুযুল হলো, আমি অনেকটা ফাইসা গেছি! হায়দার সাহেবের গানের মতো, "আমি ফাইসা গেছি, আমি ফাইসা গেছি মাইনকা চিপায়!"... ...বাকিটুকু পড়ুন

মতামত পোস্ট: ১ আগস্ট ২৪ এ লেখা: আমার কথা ৯৫ ভাগ মিলে গেছে

লিখেছেন অর্ক, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭



এবারের ছাত্র আন্দোলনের মূল যে দাবি বা উদ্দেশ্য, তা আসলে অত্যন্ত সাধারণ। সে সব সকল মাধ্যমে বহু চর্চিত, প্রচারিত ও আলোচিত। তাই পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত থাকছি। আন্দোলনের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ম্যান মেড প্রাণীজ দুগ্ধ......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৯



ম্যান মেড প্রাণীজ দুগ্ধ......

বির উনি একজন গোয়ালা (গোয়ালিনী)। তাহার নিজের কোনো গরু(গাভী) নাই। তারপরও তিনি দৈনিক প্রায় একশত লিটার দুধ বিক্রি করেন। নিজের 'কয়েকজন বান্দা কাস্টমার আছে'।... ...বাকিটুকু পড়ুন

এলপিজি কার্ডে সংকট কমবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:১৬


অনেক হতাশার মধ্যেও মাঝেমধ্যে সরকারের কোনো ভালো উদ্যোগের খবর দেখলে ভালো লাগে। অন্তত মনে হয়, সাধারণ মানুষের কষ্টের জায়গাগুলো নিয়ে সরকার কিছুটা হলেও ভাবতে শুরু করেছে। তেমনই একটি খবর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×