somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"নিমুর হাতে মুক্তির চিঠি" (ছোটগল্প)

০৯ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আদমপুরের এই ক্যাম্পে তখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। একটু আগে সংবাদ পাওয়া গিয়েছে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই গ্রামে পাক হানাদার বাহিনী আক্রমণ করবে। সংবাদটি এনেছে নিমু। সদ্য শিশু বয়স পেরিয়ে কিশোর বয়সে পা দিয়েছে ছেলেটা। এই বয়সেই ছেলেটা অনেক সাহসী। একবার ক্লাসরুমে পড়া না পারার কারণে মাস্টার মশাই নিমুসহ আরও কয়েকজনকে কান ধরিয়ে বাইরে দাঁড়া করিয়ে রেখেছিলেন। নিমু তখন সেই ছেলেগুলোকে সাথে নিয়ে মনের আনন্দে খেলা শুরু করে দেয়। এটা দেখে মাস্টার মশাই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন। তিনি তাদেরকে বেত দিয়ে মারতে ঔদ্ধত্য হোন। নিমু তখন চুপিচুপি মাস্টার মশাইয়ের পেছনে গিয়ে ওনার হাতে থাকা বেত নিয়ে পালায়!

নিমু বাবা মায়ের কথা অমান্য করে ভয়ভীতির কোনরূপ তোয়াক্কা না করে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দিয়েছে। গ্রামে যখন মুক্তিযোদ্ধারা প্রথম ক্যাম্প বসায় তখন থেকেই নিমু তাদের সাথে। বাড়ি থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার আনা, তাদেরকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে দেয়া, গ্রামের একমাত্র রাজাকার কণা মিয়া কখন কার সাথে কি শলাপরামর্শ করছে সেটার খবর আনা, নদী সাতরিয়ে বাজারে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিড়ি কিনে আনাসহ প্রায় সব কাজই সে করে।

আক্রমণের সংবাদটা শোনার পর নিমুর ওপরে একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই কাজটা যতটুকু গুরুত্বপূর্ন ঠিক ততটুকুই তাঁর জীবনের জন্য ঝুকিপূর্ন। এর আগেও সে ঝুঁকি নিয়ে অনেক কাজ করেছে তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোন কাজ সে এবারই প্রথম করবে। এই ক্যাম্পের দলনেতা মুক্তিযোদ্ধা মুকুল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন কাজটা নিমু ঠিকমতোই করতে পারবে। তিনি নিমুকে ডেকে নিয়ে ওর হাতে কয়েকটা চিঠি ধরিয়ে দিলেন আর বললেন, " এই চিঠিগুলো এখনই লঙ্গুরপাড়ের ক্যাম্পে দিয়ে আসবি। একটু পর আমরা যে অপারেশন করতে যাচ্ছি সেটার ডিরেকশন এই চিঠিগুলোতে দেওয়া আছে। তুই যত দ্রুত পারিস চিঠিগুলো ঐ ক্যাম্পের দলনেতা রওশনের হাতে পৌঁছে দিবি "।

মুকুলের কাছ থেকে চিঠিগুলো বুঝে নিয়ে নিমু লঙ্গুরপাড় ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। এই ক্যাম্প থেকে লঙ্গুরপাড়ের ক্যাম্প প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। লঙ্গুরপাড়ের ক্যাম্পে যাওয়ার পথে একটা ছোট নদী আর একটা বাজার পাওয়া যায়। কিছুদিন আগেই মুক্তিযোদ্ধারা এই নদীর কালভার্ট ভেঙে ফেলেছে। নিমুকে সাতরিয়ে নদী পার হতে হবে। তাই নিমু ক্যাম্প থেকে বেরোনোর সময়েই বুদ্ধি করে একটা পলিথিনের মধ্যে চিঠিগুলো ঢুকিয়ে নেয় যেন নদীর পানিতে চিঠিগুলো না ভিজে। নদী পার হওয়ার পর নিমু যখন লঙ্গুরপাড় বাজারে এসে পৌঁছেছে তখন সে গুলাগুলির শব্দ শুনতে পেল। বাজারে পাক হানাদার বাহিনী প্রবেশ করেছে। ওদের ভয়ে মানুষজন এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে। আর পাক হানাদার বাহিনী এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করে নিরীহ মানুষদের হত্যা করছে। ঘরবাড়ি, দোকানপাট সবকিছুতে ওরা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। নিমু একটা ছোট্ট দোকান কোটার আড়ালে লুকিয়েছে নিজেকে। অনেকক্ষণ ধরেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নারকীয় এই হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে। এদিকে নিমুরও অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। মুকুল ভাই বলেছিলেন নিমু যেন খুব দ্রুত চিঠিগুলো পৌঁছে দেয়। কেননা চিঠি যত দ্রুত পৌঁছবে লঙ্গুরপাড় ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা মুকুল ভাইয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তত দ্রুত অপারেশনের জন্য তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারবে।

দোকান কোটা থেকে বিশ পচিঁশ হাত দূরের ঝোঁপটাতে ঢুকে পরলেই নিমু নিরাপদে লঙ্গুরপাড় ক্যাম্পে পৌঁছে যেতে পারবে। তাই সে কোনপ্রকার কালক্ষেপণ না করে প্রচন্ড গুলাগুলির মধ্যে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে দৌড় দিল। এই দৌড় স্কুলের মাঠে লুঙ্গীতে নেংটি বেঁধে সারাদিন দৌড়ঝাঁপ দেয়া, স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখা এক কিশোরের দৌড় ; এই দৌড় মুক্তির চিঠি পৌঁছে দেওয়ার দৌড়। হঠাৎ পাক হানাদার বাহিনীর একটি গুলি এসে লাগল নিমুর বাম পায়ে। তারপরও থামেনি নিমু, সে দৌড়াচ্ছিল প্রাণপণ চেষ্টা করে। এরপরের গুলিটা এসে তাঁর বুকে বিঁধল। ছিটকে পড়ল নিমুর হাতে থাকা মুকুল ভাইয়ের দেয়া চিঠিগুলো, লুটিয়ে পড়ল বাবা মায়ের অবাধ্য মুক্তিকামী সন্তান নিমু। সদ্য কিশোর বয়সে পা রাখা নিমু দেশমাতার জন্য প্রাণ দিল।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:০৫
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৩৪


আজ বাদে কাল ঈদ। ঈদ-উল-ফিতর প্রতি বছর আমাদের জীবনে নতুন নতুন অনুভূতি নিয়ে ফিরে আসে, তবে এই আনন্দের জোয়ার সবচেয়ে বেশি আছড়ে পড়ে শিশু-কিশোরদের মনে। সেই ছোটবেলার কথা মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঈদ মোবারক! ঈদ মোবারক!! ড: এম এ আলী ভাইয়ের লিরিকে আমার ঈদের গান

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১২:৫৭

আমার জন্য ঘটনাটা একটু বিব্রতকর হয়ে গেছে। শায়মা আপুর এসো ঈদের গল্প লিখি ...... পড়ি পোস্টে আলী ভাইয়ের কমেন্ট (১০ নম্বর) পড়তে পড়তে নীচে নামতে নামতে নিজের নাম দেখে হুট... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঈদ মোবারক ! খুশীর দিনের ভাবনা

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২১ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৮:৫৩

ঈদ মোবারক ! খুশীর দিনের ভাবনা




সামুর সকল সদস্যর প্রতি থাকল ঈদ মোবারক ! খুশীর আনন্দ বয়ে আনুক সারাদিন !!!

আমরা সবাই রীতি অনুসারে পারস্পরিক শুভেচ্ছা জানাই এই দিনে ।
ইসলামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহ তাআলার অনুপম উপমা: কুরআনে প্রকৃতি ও প্রাণের অপূর্ব ছবি

লিখেছেন নতুন নকিব, ২১ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:৩০

আল্লাহ তাআলার অনুপম উপমা: কুরআনে প্রকৃতি ও প্রাণের অপূর্ব ছবি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

যখন আরব জাতির সাহিত্যিক প্রতিভা তার চরম শিখরে পৌঁছেছিল, যখন কবিতা ছিল তাদের হৃদয়ের স্পন্দন, আবেগের প্রকাশ এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঈদের দিন লেখা একটি বিষন্ন কবিতা

লিখেছেন সামিয়া, ২১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪




বিষন্ন বিকেলে একা বসে থাকি রোজ,
ঈদের হুলস্থুল পাশ দিয়ে চলে যায়।
সুখের কাছে যেতে চাওয়া মন
কোনো রাস্তা খোলা নেই।

মুখে বলিনি প্রতিদিন কত কথা,
কিন্তু চোখে তাকালেতো কেউ বুঝতে,
এই ছোট্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

×