কালবোশেখীর কাল
:সগীর পর্ব:
আমার সামনের যাবতীয় দৃশ্য হারিয়ে যেতে থাকে। হারিয়ে যেতে থাকে ছাগলদাড়ির ন্যায় দাড়িওয়ালা গ্রাম্য মাতব্বর হোসেন ব্যাপারীর ক্রমাগত কথা বলে যাওয়া মুখচ্ছবি। হারিয়ে যেতে থাকে ব্যাপারির বাংলা ঘরের মেঝেতে মাদুর পেতে বসা এক সালিশী মানুষ।
এরা এখানে বসেছে কোন এক আরজ আলির ফরিয়াদে। আরজ আলির ভাই ফরজ আলি বিবাদী। আরজ আলির তিন বিঘা জমি ফরজ আলি খায়। আরজ আলি যখন জমিজমার ভাগবাটোয়ারা সংক্রান্ত আইন কানুন, ন্যায়বিচার, সমতা ইত্যাদি আরও অনেক কিছুর দিব্যি দিয়ে নিজের অধিকার দাবি করে তখন ফরজ আলি তা তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ফরজ আলি তার মরা বাপের শেষ ইচ্ছা এবং একা ঘরে মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্তে ফরজ আলির সাথে একান্ত আলাপ ইত্যাদি ইত্যাদি মিশিয়ে জমির উপর তার দখল কতটুকু ন্যায্য বা যৌক্তিক তার এক করুণ কাহিণী রচনা করে। এই করুণ কাহিণীতে বশীর মেম্বর, রশীদ শেখ প্রভৃতি যারা ফরজ আলির ঘরানার লোক বলে বিবেচিত তারা সময়োপযোগী আহা উহু যোগ করে কাহিণীকে করুণতর করে তোলে।
পরিবেশ ভিজে ওঠে। কুপি বাতির আঁধার মেশানো আলোয়, হাজিরানে মজলিসের টানা বিড়ির ধুঁয়োয় এবং বশির মেম্বারের টানা কিঞ্চিৎ দামী সিগারেটের ধুঁয়োর সাথে মজলিসের বক্তব্য , কাহিণী , উপকাহিণী, আরজ আলির অধিকার প্রতিষ্ঠার ফরিয়াদ সব তালগোল পাকিয়ে বোশেখের সাঁঝ পার হওয়া সময়ে ঘুরপাক খেতে থাকে।
আমি এই তালগোল থেকে হারিয়ে যেতে থাকি। আমি সগীর চেয়ারম্যান, হাজিরানে মজলিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যে ফরিয়াদির ফরিয়াদ ও বিবাদীর আত্মপক্ষ সমর্থন সংক্রান্ত বক্তব্য শুনে একটি ভাল সমাধান দেবে এবং চেষ্টা করবে এমন সমাধান দেয়ার যেটি আগামী নির্বাচনে আরও কিছু বেশী ভোট পাওয়ার মত হয়।
আমার চেতনা অবশ হতে থাকে। বিবশ চেতনা,বিবশ ভাবনা উপস্থিত যাবতীয় বাস্তবতাকে একপাশে সরিয়ে রেখে একটি উদ্যানে প্রবেশ করে।
সেই উদ্যানে দাঁড়িয়ে থাকে গৌরী। গৌরী বিবসনা,গৌরীর সুগঠিত শরীর আমার সামনে। গৌরীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত কামনা ঠিকরে পড়ছে। আমার চোখ চর্ব্য,চোষ্য,লেহ্য যাবতীয় উপায়ে গৌরীর সৌন্দর্য চাখছে।
তবে গৌরী কখনও এমন খোলা উদ্যানে বিবসনা হয়নি,হবেওনা হয়তবা, গৌরী খুব লাজুক।গৌরী শুধু নগ্ন হয়....নগ্ন হয় দ্বিধাহীন চিত্তে পরম কামনায়, আমার সামনে।আমার করে দেওয়া ঘরে, আমার পয়সা হওয়ার পর করে দেওয়া বাগানবাড়ীর ঘরে।
তীব্র তাপের একটি বোশেখ দিবসের সমাপ্তির পর এই সাঁঝ পেরোনো সময় , মাটির গা থেকে ওঠা একটা উগ্র গন্ধ আমার ভেতর গৌরীতে উপগত হওয়ার প্রবল অভিলাষ তৈরী করে।আমি হারিয়ে যেতে থাকি আমার সময় থেকে, আমার পরিপার্শ্ব তার বাস্তবতা হারাতে থাকে।
আমি সুযোগ খুঁজি কোন এক ফাঁকে এই আয়োজন থেকে উঠে যাওয়ার। এবং সুযোগ পাওয়া মাত্রই মজলিসকে সাতপাঁচ বুুঝিয়ে উঠে পড়ি।
ততক্ষণে আঁধার ঘনিয়েছে গাঢ় করে।কোথাও গরুর মশা তাড়ানোর জন্য ভেজা খড় পোড়ানো হচ্ছে। তার গন্ধ বাতাসে । কানের কাছে অসংখ্য মশার পোঁ পোঁ। আমি মোটর সাইকেলে উঠে যাত্রা শুরু করি। আমার সত্তা জুড়ে ঘুরপাক খেতে থাকে গৌরী।
গৌরী আমার অধিকৃত নারী, গৌরী একজন হিন্দু রমণী এবং গৌরী আত্মীয় স্বজনহীন।লোকে গৌরীকে আমার রক্ষিতা বলে,তার সহযোগে আমার চরিত্র নির্মাণ করে, গৌরী নিজেকে আমার বিয়ে করা বউ মনে করে এবং আমার বাগান বাড়ীতে বাস করে।গৌরীতে আমার স্ত্রী ও পুত্রের তীব্র বিদ্বেষ আছে, গৌরী বন্ধ্যা নারী।গৌরীর সমস্ত পরিচয় আমার কাছে মিথ্যা হয়ে যায়।সমস্ত পরিচয় হারিয়ে গৌরী আমার সত্তায় কামজ একটি অস্তিত্বে পরিণত হয়।
আমার দেহের পোকাগুলো যখন যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে আমি গৌরীতে আসক্ত হই।গৌরীতে নিঃশেষিত হই,গৌরীতে শান্ত হই।
মোটর সাইকেলের তীব্র আলো সামনের আঁধারকে দুভাগ করে দিচ্ছে, রাস্তার দুইপাশে সদ্যতোলা গমক্ষেত, শুকনো মাটির ঢেলা ক্ষেত জুড়ে।দূরে গাছপালার আবছায়া অবয়বে গ্রাম।
তীব্র গতি তুলে আমি সামনে এগুতে থাকি।এবড়ো থেবড়ো রাস্তায় ধুলো উড়তে থাকে। আমাকে যেতে হবে আরো মাইল কয়েক।
আকাশে কিছুক্ষণ আগেও তারা ছিল। উত্তর পশ্চিম কোন থেকে গাঢ় ছায়া ক্রমশ ঢেকে ফেলেছে তারাদের। চিকন বিদ্যুত আকাশের গায়ে বিচিত্র নকশা আঁকছে।
উত্তর থেকে পাগলা এক ঘূর্ণি বাতাস ধুলো, ময়লা , কাম, দ্বেষ, ভয়,আশংকা নিয়ে আমার উপর আছড়ে পড়ে।
:গৌরী পর্ব:
এমন যে হবে তা দিনের বেলাতেই বোঝা গিয়েছিল। যা একখান গরমদিন গেল।
বোশেখের দিনে এত্ত গরম মানে ঝড় বৃষ্টি হওয়া,কালবোশেখী হওয়া।এখন উত্তরে ঝলকাচ্ছে। গরম হাওয়া বইছে।আমি বাইরের জামাকাপড় গুছিয়ে ঘরে তুলতে থাকি।
এই বাড়ীটা গাঁ থেকে বেশ দূরে।লোকে বলে চেয়ারম্যানের বাগানবাড়ী।আমাকে মনে করে রক্ষিতা। তাওতো তিনি করে দিয়েছেন বাড়ীখনা। আশ্রয় দিয়েছেন।বিয়ে করেছেন ধর্মমতে , আমি ধর্ম পাল্টেছি।
তেনাকে আমি ঠিক এখনও চিনতে পারিনা।ঘৃণা করব না কি করব তাও ভেবে পাইনা।আমাকে তুলে আনল ঘর থেকে জোর করে, বাপ ভাইকে দেশছাড়া করল।বিয়েও করল কিন্তু মূল বাড়ীতে তুললনা।
কলংকের মধ্যেও বাঁচতে চাইছি স্বাভাবিকভাবে।লোকে যাই বলুক তিনি তো আমাকে বিয়ে করেছেন। না করেই বা করব কি, এখান থেকে ছিন্ন হলে লোকে ছিড়েখুঁড়ে খাবে।তার চাইতে যতদিন পারি,যতদিন রাখবে,শক্তিমানের অধীনেই থাকি।
খুব শখ একটা বাচ্চার। কিন্তু আমি নাকি বন্ধ্যা।প্রকৃতির কৃপাও আমার উপর নাই।মূল বাড়ীতে থাকলেও হত,সেখানে তেনার আর বালবাচ্চা আছে।তাদেরকে নিজ সন্তানের মতো ভাবতে ভালই লাগে।কিন্তু সে উপায় নেই,বড়জন যেভাবে আগুন চোখে তাকায় তাতেই আমার বুক কাঁপে।একত্রে থাকা তো দূরের কথা।
কচি আমের গন্ধে বাড়ি ম ম করছে। এই একটা শখ আমি পূরণ করতে পেরেছি।বাড়িটাকে সাজিয়েছি নিজের মত। ফুলের গাছতো বটেই , ফলমূল ওষুধি গাছও লাগিয়েছি।তেনায় ঠাট্টা করে তুলসি মন্দির করে দিতে চাইলেন।আমি না করেছি, আমিতো ধর্ম পাল্টেছি।তুলসি গাছের আর কি দরকার।তবে সন্ধ্যে হলে তুলসি গাছ আর ধূপ ধুনোর গন্ধের সাথে নারকেল খোসা পোড়ার গন্ধ পাই, শিহরিত হই।
পোকামাকড় এতক্ষণ চিৎকার করছিল খুব,এখন থেমে গেছে। গাছের পাতারা বাতাসের গায়ে ঘসা খেয়ে আওয়াজ করছে।প্রবল এক ঝড় আসছে।
:তৃতীয় পর্ব:
পা থেকে চিনচিনে একটি তীব্র ক্রোধ আমার মাথায় আসা যাওয়া করছে। শরীরের প্রতিটি রোমকুপকে আগুনে পরিণত করছে।সহ্য করতে করতে আমি শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি।
মানুষের অপমান , তীব্র শ্লেষ এতদিন বিদ্ধ করেছে আমার চেতনাকে।সগীর চেয়ারম্যানের যাবতীয় অনাচার,ব্যভিচার,অজাচার লোকের মুখে মুখে ঘুরেফিরে তৈরী করেছে বিষের তীর।সেই তীর ক্ষমতাশালী সগীরকে স্পর্শ করতে না পারলেও বিদ্ধ করেছে আমাকে , তার নিরীহ পুত্রকে।
চোখতুলে তার দিকে তাকাতে পারিনি, প্রশ্ন করতে পারিনি তাকে, শুধু মেনে নিয়েছি।আমি আজ সহ্যের শেষ সীমায়।আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।
প্রাইমারি স্কুলের ভাঙ্গা দরজার রুমের বেঞ্চিতে বসে দরদর করে ঘামতে থাকি।আমাকে কামড়াতে থাকে অসংখ্য মশা,আমি গ্রাহ্য করিনা।
বাইরে ঘন আঁধার,স্কুলের লাগোয়া ঘন ডুমুর গাছের নিচে কালীমন্দির।আমি বের হয়ে আসি। আকাশে বিদ্যুত চমকাচ্ছে।কালী মূর্তির লালাভ জিহ্বা চকিতে দেখা দিয়েই হারিয়ে যাচ্ছে।
আমি উদভ্রান্তের মত যেতে থাকি বাগানবাড়ীর দিকে।আমার হাতে ধারাল অস্ত্র।
ঝড় শুরু হয়ে গেছে, ধুলোমাখা বাতাসের সাথে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। আমি দৌড়াতে থাকি। পৌছে যাই গৌরীর ঘরের সামনে।বন্ধ দরজায় করাঘাত করি।ভেতরে কোন সাড়া নেই,আমি অধৈর্য হয়ে উঠি। দরজায় একের পর এক পড়তে থাকে সশব্দ আঘাত।দরজা খুলে যায়।
আমাকে দেখে গৌরী চমকে ওঠে।আমি দরজা বন্ধ করে দেই।গৌরী আমার চোখে কি দেখে জানিনা।সে স্থির হয়ে গেছে।পাথরের মত নিশ্চল।
বাইরে গর্জন হচ্ছে ঝড়ের।ঘরের ভেতর দু একটি মুহুর্ত হ্যারিকেনের আলোয় স্থির হয়ে থাকে।গৌরী আর আমার লম্বাটে ছায়া ফেলেছে হ্যারিকেনের আলো ঘরের মেঝেতে। তেল পোড়া গন্ধ ঘরটা জুড়ে।
ঘরের একপাশে একটা পিতলের কলস,তা থেকে গ্লাসে ভরা জল।একগাছি চূড়ি বিছানায় ছড়ানো।
আমি আমার ধারাল অস্ত্র বের করি। আবছা আলোতেও ধাতব ঝলকানি ছোটে তা থেকে।
গৌরী চিৎকার জুড়ে দেয়।তোর বাবা আমাকে বিয়ে করেছে....আমি তার বিয়ে করা বউ....।গৌরীর চিৎকার কালবোশেখীর ঝড়ে হারিয়ে যেতে থাকে।প্রচন্ড গর্জন গ্রাস করে নেয় যাবতীয় বাস্তবতাকে।
গল্পের মূল লেখক মীর মাসুদুল আলম যিনি আমার অতি কাছের বন্ধু। তাঁর বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে গল্পটি ব্লগে প্রকাশ করা হলো। উল্লেখ্য, তিনি ব্লগ এ লেখালেখি করেন না। যেকোন মন্তব্য সাদরে গৃহীত হবে ও মূল লেখককে জানানো হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


