somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সবুজ গালিচায় - সুমন্ত গুপ্ত

০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সবুজ গালিচায় - সুমন্ত গুপ্ত
যান্ত্রিক জগতে কোলাহল মুক্ত পরিবেশ কে চায় না বলুন তাই ঝি ঝি পোকার ছন্দে আর সবুজের সমারহে ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা । আর এই নিরিবিলির ছোঁয়া পেতে আমরা যারা শহুরে তাদের অনেক কষ্টই করতে হয় বৈকি । আর সেই নিরিবিলির স্থান যদি ফরেস্ট হয় তাহলে আর কথাই নাই শত বাস্ততার মাঝে কিছু সময় যদি বুনো পরিবেশে ঘুরে বেড়ান যায় তাহলে মন সজীব হয়ে যায় । তবে পুরো সবুজে হারিয়ে যেতে একটু কষ্ট তো করতে হবেই। বৃষ্টির সময় প্রকৃতি যেন তার সবটুকু রূপ ঢেলে দেয় ফরেস্ট গুলতে । সবুজ গালিচার ওপর আপনার আগমণে যোগ হবে ভিন্ন মাত্রা। এই বর্ষায় এক ভিন্ন রূপেই দেখা যায় ফরেস্ট কে । আমাদের দেশের ভ্রমণ পিয়াসুরা ভ্রমণের জন্য শীত মৌসুমকে বেছে নিলেও হয়ত অনেকেই জানেন না বৃষ্টির সময়ে ফরেস্ট গুলো দেখে মনে হয় সবুজ কার্পেট আর সাথে যদি চা বাগান থাকে তাহলে যেদিকে দু’চোখ যাবে সবুজে সবুজে বর্নিল এক নতুন সাজে ধরা দেবে আপনার কাছে।
বন্ধুরা এতক্ষণে ঠিক বুজতে পারছেন আমি কোন জায়গার কথা বলছি , হাঁ আমি বলছি স্রীভুমি সিলেটের কথা। সিলেটে প্রায় সবাই কম বেশি ঘুরতে গিয়েছেন কিন্তু শহর থেকে ৫কি.মি দুরের খাদিম রেইন ফরেস্ট এ অনেকেই যান নাই। সিলেট শহর থেকে বেরিয়ে জাফলং রোডে হজরত শাহ পরানের মাজারের পর বাম পাশে খাদিমনগর টি এস্টেটের রাস্তা ধরে কয়েকশত মিটার এগুলেই বনের শুরু। এখানে দুটি ট্রেইল ধরে ট্রেকিং করতে পারেন, ছোট ট্রেইলে ৪৫ মিনিট আর বড় ট্রেইলে দু ঘন্টা সময় লাগবে। দুপাশে ঘন বন, ঝোপ ঝাড় পায়ে চলা রাস্তা ধরে হেটে যান বনের ভেতরে, ঝিঁ ঝিঁ পোকার অবিশ্রান্ত শব্দ, মাঝে মাঝে গাছের ডালে পাখি ডাক, আপনাকে নিমেষেই নিয়ে যাবে এক অপার্থিব জগতে।
২০০৬ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষিত হয় সিলেটের খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান, এর আয়তন ৬৭৮ হেক্টর। ১৯৫৭ সালে এর গোড়াপত্তন করা হয়। জীব-বৈচিত্রে ভরপুর এই বনে ২১৭ প্রজাতির গাছ গাছালি এবং ৮৩ প্রজাতির প্রাণী দেখতে পাওয়া যায় এর মাঝে উল্লেখযোগ্য প্রানী হল বানর, মুখপোড়া হনুমান, বনবিড়াল, বাদুর ,ভল্লুক, বনরুই, খাটাশ, মায়া হরিণ, লজ্জাবতী বানর, সজারু, সাদা বক , কাঠ বিরালি খরগোশ, কাঠবিড়ালি, প্রভৃতি। সরীসৃপের মধ্যে আছে বিভিন্ন জাতের সাপ, অজগর, গুইসাপ, উড়ুক্কু লিজার্ড, বেজি ইত্যাদি। এ ছাড়া নানান পাখপাখালির কলকাকলিতে সবসময় মুখরিত থাকে এই জাতীয় উদ্যান। হলুদ পা হরিয়াল, পাকড়া ধনেশ, ফিঙ্গে, লালপিঠ ফুলঝুরি, বেগুনি মৌটুসি, মদনা টিয়া, কালা মথুরা, বাসন্তী লটকন টিয়া, মালয়ি নিশি বক ইত্যাদি। বনের গাছগাছালির মধ্যে রয়েছে চাঁপালিশ, কদম, সেগুন, ঢাকি জাম, গর্জন, শিমুল, চন্দন, জারুল, আম, চাম্পা, চিকরাশি, মেহগনি, , জামা, কাউ, লটকন, বন বরই, জাওয়া, কাইমূলা, পিতরাজ, বট, আমলকি, হরতকি, বহেড়া, মান্দা, পারুয়া, মিনজিরি, অর্জুন, একাশিয়া, বিভিন্ন জাতের বাঁশ, বেত, মুলিবাঁশ, বুনো সুপারি, ট্রি-ফার্ন ইত্যাদি ।
আমরা ৪০ জন এর একটি দল নিয়ে রওয়ানা দিলাম গন্তব্য খাদিম ফরেস্ট। সিলেট শহর থেকে প্রথমে গেলাম শাহাপরান মাজারে, মাজার জিয়ারত করে আমাদের দল রওনা দিলো ফরেস্ট এর দিকে। প্রথমে পেলাম একদিকে খাদিম চা বাগান অন্য দিকে বুরজান চা বাগান। সিলেট এ চা বাগান গুলোর পরিবেশ আসাধারন । বাগানের বাসা গুলো দেখলেই থেকে যেতে মন চায়। প্রতিটি বাসার সমনে বাঁশের বেড়া দেয়া আর নিপুন এক শিল্পিক ছাপ। চারপাশে চা বাগানের অবারিত সবুজের বন্যা। চা কারখানা, চা শ্রমিকের শিল্পিত বাসস্থান দেখতে দেখতে গহীন অরণ্যের নির্জনাতার দিকে ঢুকে যাচ্ছিলাম আমরা। আমরা হাঁটছি বাগানের মেঠো পথ ধরে। যতো ভেতরে ঢুকা যায় নির্জনতা তত বাড়তে থাকে বিভিন্ন পাখির কলরব মন কে ছুঁয়ে যায়। পথি মধ্যে ব্যাং এর ডাক মনে করিয়ে দিলো অল্প কিছুক্ষণ এর মধ্যে বৃষ্টি আমাদের বরণ করবে। অল্প কিছু ক্ষণ এর মধ্যে মুষল ধারায় বৃষ্টি শুরু হল আমরা ফরেস্টের বিট অফিসে পথে হাঁটছি। অবিরাম বর্ষণের জলধারার পরশে বৃক্ষরাজি নব যৌবন লাভ করে।
প্রায় ৪৫ মিনিট হাটার পর আমরা পৌছালাম ফরেস্টের বিট অফিসে সেখানে কিছু সময় বিস্রাম নিয়ে শুরু করলাম আমদের ট্রেকিং। আগেই বলেছি এখানে দুটি ট্রেইল ধরে ট্রেকিং করতে পারেন, ছোট ট্রেইলে ৪৫ মিনিট আর বড় ট্রেইলে দু ঘন্টা সময় লাগবে। আমরা দুই ঘণ্টার পথে যাত্রা শুরু করলাম। একদিকে বৃষ্টির অবিরাম ধারা অন্য দিকে পাখির ডাক। আকা বাঁকা পথ ধরে আমরা হাঁটছি ঘন জংগলের মধ্যে দিয়ে। তবে বলে রাখা ভাল বৃষ্টির সময় জোঁক এর আনাগোনা বেশি থাকে তাই এক জায়গায় বেশি সময় না দাঁড়ানই ভাল । গাছে গাছে ফল ধরে আছে কাঁঠাল, দুপাশের ঘন ডালপালা নুয়ে এসে পায়ে চলা পথকে সুড়ংগ বানিয়ে ফেলেছে, কিছুটা অন্ধকার। পথের মাঝে পাবেন স্বচ্ছ পানির খাল – স্থানীয়ভাবে যাকে ছড়া বলে, বৃষ্টির পর পর এগুলো বিপুল বেগে পানি বহন করে, অন্য সময় হালকা একটা ধারা বজায় থাকে, কিংবা শীতকালে একেবারে শুকিয়ে যায়।
বৃষ্টি ঝরছে অঝোরে, কপালে কি আছে দেখাই যাক না। রিমঝিম বৃষ্টির আওয়াজ আর একটানে ডাকা ঝিঝি পোকার লহরী। কাদামাখা পায়ে ছপ ছপ শব্দ করে নিঃশব্দে হেটে যাচ্ছি আমরা। ইতোমধ্যে অবশ্য রক্তদান প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে, পা থেকে টেনে জোক ঊঠালাম দুইটা। সামনে ট্রেইলটা আরো সরু, জঙ্গল বর্ষার পানিতে একদম ঘন হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ছড়া বয়ে গেছে বেশ কিছু। খুব বেশি হলে হাটু পানি হবে, মানে এগুলো বর্ষাকালীন ছড়া। পাড়ের বালুটা খুব নরম, পা দিতেই চোরাবালির মত দেবে গেলো। একটু টিলার মত জায়গা পেরিয়ে আবার মোটামুটি সমতল। পথে দেখা পেলাম বানর দল এর কিন্তু ছবি তোলার আগেই নিমিষে বানর দল হারিয়ে গেল গভীর বনের দিকে। আমাদের গাইড বিভিন্ন প্রজাতির গাছ চিনেয়ে দিচ্ছিলেন । এক পর্যায়ে জঙ্গল এমনই গভীর হয়ে গেলো যে, আর হাটা যাচ্ছে না, শুরু হল বসে বসে ক্রল করা। উপরে আবার বেতের ঝাড় আর কিছু নাম না জানা কাটাগাছ। হাতে পায়ে গায়ে সমানে আটকে যাচ্ছে কাটাগুলো, আমরা বসে বসে এগোচ্ছি আর উপরে বৃষ্টি। ঘন জঙ্গল, বিশাল লম্বা লম্বা দেশী বিদেশী গাছে ঢাকা পথ হেটে আরও দুয়েকটা ঝিরি পার হলাম, সামনে এসে দাড়ালো দুর্ভেদ্য জঙ্গল। একদম ডেড এন্ড, গাছ না কেটে আগানোই যাবে না। আমাদের গাইড দা দিয়ে ঝোপ কেটে আমাদের রাস্তা করে দিলেন। পায়ের দিকে তাকালেই ঝামেলা, জোক তুলতে হয়। এই চিনা জোক জিনিসটা খুবই খারাপ। বেশ কয়েক জন ভয়ে ফিরে যেতে চাছিলেন কিন্তু ফেরার উপায় না পেয়ে আমরা আবার ফিরে চললাম ট্রেইল ধরে। ততক্ষণে অবশ্য এক ঘন্টার বেশিই হয়ে গেছে। বনের ভেতরে নির্জনতা আর মনের ভেতরের ভয় সব মিলিয়ে এক বিচিত্র সময় পার করছিলাম আমরা। সামনে কি আছে তা আমরা জানিনা এক মাত্র আমাদের গাইড ই বলতে পারেন তবে ভাগ্যিস আমারা গাইড পেয়েছিলাম তা না হলে আমাদের ফরেস্টের ভেতর থেকে বের হওয়া কঠিন কাজ ছিল। অদূরে চা গাছের আড়ালে সূর্য ঢলে পড়েছে। শেষ সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়লো আকাশ জুড়ে । সেই সাথে অগণিত পাখির নীড়ে ফেরার ব্যাকুলতা । বন গোধূলির স্পনিল মোহে আছন্নে হয়ে কখন যে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যার আধারে ঢুঁকে গেছে টের পাইনি।
কিভাবে যাবেন ঃ
ঢাকা থেকে বাস অথবা ট্রেন যোগে সিলেট । সিলেট শহর এর বন্দর বাজার থেকে খাদিম যাবার জন্য টাউন বাস / সিএনজি প্রতিনিয়ত ছাড়ে । শাহাপরান মাজার সামনে নেমে মাজার জিয়ারত করে সহজে আপনার কাঙ্ক্ষিত যাত্রা পথে রওনা দিতে পারেন। তবে দল বড়ো হলে বনবিভাগের অনুমতি নিয়ে ঢুকাই ভাল ।


সুমন্ত গুপ্ত [email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:২১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অন্ধকারের আলোকবর্তিকা

লিখেছেন স্প্যানকড, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৬




একটা দেশ যখন শিক্ষিত চাপাবাজ, ক্ষমতার দরবারে নতজানু বুদ্ধিজীবী এবং মুখোশধারী ডাকাতদের হাতে পড়ে, তখন সেই দেশ আর মানচিত্রে থাকা একটি ভূখণ্ড থাকে না, হয়ে যায় আলীবাবার চল্লিশ চোরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যুর আগে কি মানুষ টের পায়, সে মারা যাচ্ছে!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



মৃত্যুর কয়েক মুহুর্ত আগে, টের পাওয়া যায়- মরে যাচ্ছি।
সময় শেষ। তবে সবাই বুঝতে পারে না। কেউ কেউ বুঝতে পারে। আমার বাবা একদিন মাকে বলল, আমার দোষ ত্রুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সে আমার এআইনোক্কিও

লিখেছেন শায়মা, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১২:৪৪


এক জীবনে কত কিছু দেখা হয় কত কিছু জানা হয় মানুষের! আসলেই কত অজানারে! লেখক শংকরের এই নামে একটি বই আছে। কবিগুরুর আছে কবিতা কত অজানারে জানাইলে তুমি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ সাইটের জন্য ডোমেইন নাম সাজেস্ট করুন

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৪:৫৫


বাংলায় ব্লগিং করার জন্য একটি ওয়েব সাইট তৈরী করতে চাচ্ছি। আপাতত মূল উদ্দেশ্য হলো সামুতে লিখা আমার সবগুলো পোস্ট ধীরে ধীরে সাইটটিতে আর্কাইভ করে রাখা। সামুতে অনেকে নিবেদিত প্রাণ ব্লগার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ভোর ৬:২২



ড্যাম কেয়ার সেই মেয়েটি AI দিয়ে সাজে
==================================
পিঠ ছুঁয়ে নামা মেঘবরণ তার লম্বা কালো চুল,
তারই মাঝে লুকিয়ে হাসে একটি সাদা ফুল।
চোখ দুটো তার ডাগর ডাগর, অবাক করা আলো,
দুষ্টুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×