somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিক্ষিপ্ত খাতা: দাদুর পাশে, বাবার স্মৃতি

০৭ ই অক্টোবর, ২০২৫ দুপুর ১২:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মোবাইল ফোনটা রিং দিলো — ঘুম ভেঙ্গে গেলো। পাশে আমার মতো ঘুমানো সাবিকও বিরক্ত হয়ে চোখ মোচড়াতে মোচড়াতে বলছে " বাবা ফোন বন্ধ কর "। আজ শুক্রবার, সাত সকালে ; কে ফোন দিলো জানি না। বিছানার পাশে রাখা bedside টেবিল থেকে মোবাইলটা তুলে দেখি কলার নাম “Abba”। অথচ কল করল আম্মা। ইচ্ছা করেই নামটা বদল করিনি; বাবা চলে যাবার পর ওই নম্বরটা আম্মাই ব্যবহার করে।



ফোনটা ঘুমন্ত কণ্ঠে ধরে উঠলাম, একটু বিরক্তমিশ্র গলায় বললাম-
- আম্মা, তোমারে না বলছি, শুক্রবার সাত সকালে ফোন দিবা না।
- ওই শয়তান, কয়টা বাজে?
- জানি না।
- সাড়ে এগারোটা বাজে, এখনও পরে পরে ঘুমাস?

সাড়ে এগারোটা—শুনতে পেয়ে আমি মনে মনে অবাক হলাম। শুক্রবারে আমি সাধারণত নয় টা থেকে সাড়ে নয়টা পযন্ত ঘুমাই যদিও গতকালকে অনেক রাত পর্যন্ত ছেলের সাথে বিরক্তিকর (এই লেখার , এই শব্দ যদি ছেলের কানে যায়, তাহলে খবরই আছে) কার্টুন দেখেছি, যার জন্য গত রাতে ঘুমাতে দেরি হয়ে গিয়েছিলো। ও পাশে ফোনে বললাম,

- ওও, সাড়ে এগারোটা বাজে। আচ্ছা রাখো, fresh হয়ে ফোন দিচ্ছি.
- সাবিক কই
- ঘুমাচ্ছে আমার পাশে।
- বাহ .... , বাপ বেটা দুটিই ঘুম, আল্লাহ খোদার নাম নাই। পরে পরে ঘুমাচ্ছিস।
- (বিরক্ত হয়ে) “আচ্ছা রাখো তো, পরে কল দিচ্ছি ।
- আচ্ছা , শোন , যেটার জন্য ফলে দিয়েছি
- বলো
- তুই বলে, অনেক প্রেসার আছিস , নীপা বললো, ঠিক মত ঘুমাস না, অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করিস।
- না, এমন কিছু না—MD নেই তো, তাই একটু অফিস আর কাজের চাপ। ওপরে একটা বড় সরকারি প্রজেক্ট পেয়েছি, ওইটার কাজ। তোমার কী খবর? কখন আসবা?
- নিপার কাছে তোর কথা শুনে তো আমি টেনশন আছি। দেখি তাড়াতাড়ি চলে আসবো।
- অরে আমি ঠিক আছি , অনেক দিন পর গেসো , থাকো আরো কিছু দিন
- অনেক বৃষ্টি এই খানে ঘর থেকে বের হওয়া যায় না
- তোমার যতদিন মন চায় থাকো, কোনো প্রবলেম হয় নাই ।
- হাটাহাটি করিস তো ?
- হুম করি।
- তোর আব্বার কবরে যাবি না ?
- আজকে যাবো না, কালকে যাবো। বেল্লাল এর ছেলেকে আসতে বলছি কালকে কবরস্থানে।
- কেন?
- ওকে বলেছি সকাল সকাল, যেয়ে একটা খতম পড়ানোর জন্য।
- ভালো করেছিস।
- আম্মা রাখি, নামাজে যাবো, সাবিককে তুলতে হবে।
- আচ্ছা ঠিক আছে।

লাইন কেটে দিলাম।

আব্বা মারা গেলে আমাদের আম্মার অবস্থা—হয় USA-তে, নয়তো নিজের বাড়িতেই; হঠাৎ করে গ্রামে চলে যায়, আবার ফিরে আসে—উথলি-পাতলি। আব্বাও জীবিত থাকলে এমনই করতো। তাই আম্মা যখন গ্রামে যেতে চাইতো, আমি আর আমার বোন সাধারণত না করতাম না । তবু বেশি গরম পড়লে আমরা বাধা দিতাম; আম্মাও বুঝতেন—শীতকাল বা বর্ষার কিছুটা ঠান্ডা সময়ে বাড়ি যেতেন।

আম্মা ঢাকায় থাকলে আমার বাড়ির প্রায় সত্তর শতাংশ কাজের চাপ কমে যেতো। অনেক কাজ থেকে আমি পুরোপুরি মুক্ত থাকতাম, যেমন দারোয়ান এর issue, ভাড়াটিয়া র issue, পানির মোটর সমস্যা, ব্লা ব্লা।

মাঝে মাঝে আম্মা কথা বলতে চায় বাড়ির issue নিয়ে, আমি শোনার জন্য শুনতাম কিন্তু কোনো decision দিতাম না, আবার Major কোনো সমস্যা হলে decision দিতাম। মাঝে মাঝে মা-বোন কেও বলে, কিন্তু আমার বোনও আমার মতো decision দিতো না। আমার আর আমার বোনের কথা হলো, তোমার বাসা তোমার যা মন চায় তুমি করো। আসলে আমি আর আমার বোন চাই, আম্মা busy থাকুক। Decision না দেয়ার ফলে অনেক সময়, আম্মার অনেক বকা বকি শুনতাম আমি আর আমার বোন।

আর সেই বকা-বকির মধ্যে খুব কমন লাইন গুলো ছিল—
“আমার বেলায়: তুই বাসায় থেকে বের হয়ে যা, আমার সামনে আসবি না।”
আর বোনের বেলায়: “তুই বাংলাদেশে এলে, আমার বাসায় আসবি না, শ্বশুর বাড়িতেই থাকবি।”

Decision না দেয়ার কারণে যে কত বার, আম্মা মুখ দিয়ে আমাকে আর আমার বোনকে বাসায় থেকে বের করে দিয়েছে, ঐটার হিসাব রাখলে, আল্লাহ ভালো জানে কত দিস্তা কাগজ লাগতো। তবুও আমার আর আমার বোনের কথা, তোমার বাসা তোমার যা মন চায় করো। আমরাও বেশ ভালোভাবে জানি, মা মনে মনে খুশি হয়। আসলে একটা বয়স পেরুলে বাবা, মা রা সবার নজর চায়, স্পেশালি তার ছেলে মেয়ের । এই জন্যই, মা যতবার বলে বাসায় থেকে বের হয়ে যেতে, ততবারই আমরা হোহো করে হেসে মা-কে খেপাই, আর মা ও চিলা চিলি করে।

আসলে মা হলো ……

সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে , আবার আম্মার ঘরে এসে, গুনগুন করে কোরআন শরীফ পড়ার মাঝে, মার ঠিক কোলের কাছে শুয়ে অল্প কিছুক্ষণের প্রশান্তির ঘুমটা—আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রশান্তি। ঠিক ওই ঘুমানো অবস্থায়, কিছুক্ষণ পর ছেলে বিছানায় বাবাকে না পেয়ে দাদুর ঘরে আসে, বাবার পাশে শুয়ে পড়ে—ওই মুহূর্তটা যেন সবচেয়ে নিরিবিলি; যেন বেহেশতের একটা টুকরো।

কোরআন পড়া শেষে মোনাজাত, আমার কপালে আর আমার ছেলের কপালে ফু দিয়ে, হাত মুঠো করে চুল ধরে ঝকানো—তার পরই শোনা যায়,

- “উঠ, এত বড় চুল রাখছিস, গরম লাগে না? ওঠ।”
- আমি বিরক্ত হয়ে বলি, “উফ্, ব্যথা লাগে তো।”

রাগ করে বিছানাটা ছাড়তে ছাড়তে বলি, “তোমার জ্বালায়, একটু শান্তি মতো ঘুমাতে পারি না।”

এই বলে উঠে যাই, সঙ্গে সঙ্গে আমার ছোট্ট ছেলেটাও উঠে পড়ে, বিরক্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে, “দাদু, তুমি না আসলে বেশি জ্বালাও।”

আমাদের এই কান্ডকারখানা দেখে আম্মার মুখে থাকে, অন্য রকম একটা প্রশান্তির হাসি, যে হাসির বিবরণ দেয়া যায় না ।

আমরা দুজনে উঠে যাই; চুল টেনে ঘুম থেকে উঠানো টাই আমাদের দুজনের অ্যালার্ম—আমি অফিসে যাব, ছেলে স্কুলে যাবে।

যদি আব্বা জীবিত থাকতেন, সবকিছু অন্যরকম হতো। সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে মার ঠিক কোলের কাছে শুয়ে আমার ছেলে দাদুর কাছে। কারণ দাদা ছিল ওদের ভালোবাসার fighting partner। দাদা নেই—তাই আমার ছেলে খুঁজে নিয়েছে তার বাবার পাশের জায়গা টুকু।

আব্বাকে আমি বিস্তারিত লিখেছি—
আমার প্রথম বই “মৃত্যু” তে। ওই টা নিয়ে ছোট্ট করে একটা লিখা লিখবো , কিছু দিন পর ….

সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০
৭টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রচারণার বেলুন যত বড়ই হোক, বাস্তবতার সূচের সামনে তা এক মুহূর্তেই চুপসে যায়।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৯

প্রচারণার বেলুন যত বড়ই হোক, বাস্তবতার সূচের সামনে তা এক মুহূর্তেই চুপসে যায়।
=======================================
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন ও অক্সফোর্ড বাংলা সোসাইটি নামের ব্রিটেনের কিছু প্রবাসী বাংলাদেশিদের ছোট সংগঠন থেকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪০



নিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধেয়ে চলেছি।
ঊর্ধ্বলোক আর নিম্নের অতল অন্ধকার কোন জায়গায়,
সে নিয়ে আর চিন্তা কি!

প্রিয়ার আহবানে আমরা কতো কিছুই না করি!
এবারে প্রিয়ার আহবানে দিক-শূন্যই নাহয় হলাম!... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৬ জুনের বিশ্বকাপ কড়চা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:২৩

দারুণ একটা ম্যাচ হয়ে গেলো একটু আগে। মিসর দারুণ খেলেছে আজ। সালাহ নেমে যাওয়ার পরে তাদের খেলার ধার বেশ বেড়ে গিয়েছিলো বলে মনে হলো! কিন্তু, বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ডদের পাসিং আর ড্রিবলিং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমন্ত্রন পত্র থাকলে ভিসার দরকার কী! আপনি জানেন আমি কে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



ভারত বাংলাদেশের কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে সেই আমন্ত্রণপত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠাবে। সেখান থেকে আমন্ত্রণপত্র যাবে সেই রাজনৈতিক ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টে, তারপর তার কাছে। এরপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাদিক হাসনাতের প্রোগামে রাকাজার মঈনুদ্দীন

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৫



এই ছবিটি লন্ডনে অনুষ্ঠিত হওয়া নিজেস্ব অর্থায়নে সাদিক হাসনাতের প্রোগামের। অসংখ্য আঙ্কেল আন্টিদের মাঝে একজন বিশেশ লোককে দেখা গেল সেখানে। লোকটাকে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে ছবিতে। এই লোকটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×