মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি রূপকল্প ২০২১ ঘোষণার মধ্য দিয়ে ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ঘোষণার মাধ্যমে গরিষ্ঠ সংখ্যক তরুন প্রজন্মের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছেন। প্রথম দিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তব রূপটি কেমন হবে তা নিয়ে সর্বস্তরের মানুষের মনে সংশয় ছিল। বলতে দ্বিধা নেই আপনি এবং আপনার সরকারের মন্ত্রী পরিষদ, সাংসদ এবং নীতি নির্ধারকসহ এমনকি আইসিটি বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও একক ভাবে কারো নিকট ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানের রূপরেখাটা স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু বিগত প্রায় তিন বছরে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা এবং অংশগ্রহনের মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণাটি স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এখন এক কথায় বলা যায় আপনার সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে সরকারের সকল প্রতিশ্রুত সেবা ডিজিটাল প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে জনগনের হাতের নাগালে পৌছে দিতে চায়।
মাননীয় জননেত্রী,
ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আপনার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলির মধ্যে অন্যতম একটি হলো ৪৫০১ টি ইউআইএসসি (ইউনিয়ন ইনফরমেশন এন্ড সার্ভিস সেন্টার) প্রতিষ্ঠা। এই ইউআইএসসি গুলি মূলত ইউনিয়নভিত্তিক হাব বা জনগনের মিলন কেন্দ্র যেখানে ইন্টারনেট সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকার যেসকল প্রতিশ্রুত নাগরিক সেবাসমূহ ইন্টারনেট এর মাধ্যমে প্রদান করার জন্য উন্মুক্ত করবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগন ইউআইএসসিতে এসে সেই সকল প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহন করতে পারবে। কিন্তু সেবা প্রদানকারী মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কোন সরকারী প্রতিষ্ঠান যতক্ষন পর্যন্ত তার নাগরিক সনদ অনুযায়ী প্রতিশ্রুত সেবার ইন্টারনেট ভিত্তিক বাস্তবায়ন না করবে ততক্ষন পর্যন্ত জনগন ইউআইএসসির পূর্ণ সুবিধা ভোগ করতে পারবে না।
সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী,
ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আপনার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলির মধ্যে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হলো মন্ত্রণালয় ভিত্তিক কুইক উইন প্রকল্প। আপনার কার্যালয়ের নেতৃত্বে ইউএনডিপির সহযোগিতায় সরকারের সকল মন্ত্রণালয় এক বা একাধিক কুইক উইন প্রকল্প হাতে নিয়েছে যার বাস্তবায়নের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সকল নাগরিক সেবার মধ্যে দুই একটি স্বল্প সময়ে জনগনের দোর গোড়ায় পৌছে দিয়ে জনমনে ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারনাটির একটি দৃশ্যমান অবয়ব তৈরী করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। এই কুইক উইন প্রকল্পগুলি জনগনের মধ্য ব্যপক প্রচার এবং আগ্রহ তৈরী করার লক্ষ্যে জাতীয় এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে কয়েকটি ডিজিটাল ইনোভেশন ফেয়ার আয়োজন করা হয়েছে। এই ফেয়ারগুলিতে জনগনের ব্যপক অংশগ্রহন ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারনাটির বাস্তবায়নের প্রতি জনগনের চাহিদার প্রতিফলন হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
সম্মানিত জননেত্রী,
আপনি ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার সময় বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান করেন মাননীয় প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানকে। স্থপতি ইয়াফেস ওসমান আপনার মন্ত্রীসভার একজন টেকনোক্রেট সদস্য। ২০১০ সালে আপনি এই মন্ত্রণালয়ের অধীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ তৈরী করে দুজন সচিব নিয়োগ প্রদান করেন। বর্তমানে আপনি এই দুটি বিভাগকে দুটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়ে উন্নীত করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পূর্ণ মন্ত্রীকে নিয়োগ দিয়েছেন। এই থেকে আইসিটির প্রতি আপনার ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি এবং আপনার সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গিকারের প্রতিফলন স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বিগত প্রায় এক যুগ যাবত বিভিন্ন নামে এবং মর্যাদায় আইসিটি মন্ত্রণালয় তার অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকলেও প্রকৃত পক্ষে আইসিটির বাস্তবায়নে এই মন্ত্রণালয়ের কোন ভূমিকা ছিল না। এর একটি মূল কারন হলো আইসিটি বাস্তবায়নের জন্য এর নিজস্ব কোন জনবল নেই। মন্ত্রণালয়ের রুটিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা ছাড়া এর কোন উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম ছিল না। সরকারের সকল মন্ত্রণালয় / বিভাগ / অধিদপ্তর / দপ্তরের প্রতিশ্রুত নাগরিক সেবাকে তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক আধুনিকায়নের জন্য প্রসেস রি-ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আইনগত সংস্কার প্রয়োজন। প্রচলিত আইনে সরকারের অনেক সেবার অনলাইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। উদাহরণ স্বরূপ পুলিশের অনলাইন জিডির কথা বলা যেতে পারে। আবার ম্যানুয়েল পদ্ধতির ওয়ার্ক-ফ্লো অপরিবর্তিত রেখে শুধুমাত্র ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রতিস্থাপন করলে সেবার কাঙ্ক্ষিত মান, দ্রুততা, সহজলভ্যতা, কৃচ্ছ্রতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা আসবেনা। এই জন্য আইসিটি মন্ত্রনালয়ের এলোকশন অব বিজনেসে প্রসেস রি-ইঞ্জিনিয়ারিং এবং চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট বা পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার আইনগত এখতিয়ার প্রদান করতে হবে। আর এই আইনগত এখতিয়ার বাস্তবায়নের জন্য আইসিটি মন্ত্রণালয়কে সরকারের সকল আইসিটি জনবলের উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রদান করতে হবে।
সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী,
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় / বিভাগ / অধিদপ্তর / দপ্তরে রাজস্ব খাতে দুই শতাধিক প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা সহ প্রায় পাঁচ শতাধিক আইসিটি জনবল কর্মরত রয়েছে। এই জনবলের সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কোন কর্মপরিধি নেই। ফলে প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতাহীন এই দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের কোন সিদ্ধান্ত গ্রহন ক্ষমতা নেই। স্ব স্ব মন্ত্রনালয় / দপ্তরের প্রসেস রি-ইঞ্জিনিয়ারিং, আইনগত সংস্কার, ওয়ার্ক-ফ্লো পরিবর্তন এবং পরিবর্তন ব্যবস্থাপনায় এই জনবলের কোন ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। কাজেই এই জনবলের বেতন ভাতা বাবদ সরকারের রাজস্ব খাতের বিপুল ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য আউটপুট সরকার পাচ্ছেনা। তাছাড়া স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়ের অধীন কর্মরত থাকায় এবং প্রায় সকল ক্ষেত্রে সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে শূন্য পদগুলো পূরন করায় বছরের পর বছর এই জনবল পদোন্নতির সুযোগ বঞ্চিত। ফলে এই খাতে বর্তমানে কর্মরত জনবল কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলছে এবং সরকারের আইসিটি খাতকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করার বিষয়ে ভবিষ্যত তরুন প্রজন্মও ততটা আগ্রহী হবেনা যা ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে একটি গুরুতর বাধা হয়ে দাড়াবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এই বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় / বিভাগ / অধিদপ্তর / দপ্তরে রাজস্ব খাতে কর্মরত সকল আইসিটি জনবলকে একটি একক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় আনার লক্ষ্যে প্রথম থেকে কাজ করে গেছেন। এই লক্ষ্যে তিনি তাঁর মেয়াদকালে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর শীর্ষক একটি সাংগঠনিক কাঠামো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীতিগত অনুমোদন করিয়ে গেছেন যার আওতায় দেশের সকল জেলা ও উপজেলায় আইসিটি জনবল নিয়োগ করা যাবে। এই কাঠামোটির দ্রুত অনুমোদন এবং বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবী। এই কাঠামেটি বাস্তবায়ন হলে সরকারের যেকোন মন্ত্রণালয় তার আইসিটি ভিত্তিক সেবা কার্যক্রমকে জেলা উপজেলা পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর এর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট গ্রহন করতে পারবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল চালিকা শক্তি তরুন প্রজন্মকে আইসিটি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার উপর আপনি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আইসিটিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ব্যপারে ব্যপক কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। এটি একটি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা যা ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারনাটির টেকসই বাস্তবায়নের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু এই দক্ষ জনশক্তিকে বেসরকারী সেক্টরের পাশাপাশি সরকারী সেক্টরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী করে না দিলে সরকারের প্রতিশ্রুত নাগরিক সেবার তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক আধুনিকায়ন সম্ভব হবে না। সরকারের সকল আইসিটি জনবলকে আইসিটি মন্ত্রনালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রনে এনে একটি আইসিটি সার্ভিস গঠনের মাধ্যমে সরকারের আইসিটি খাতকে একটি সম্মানজনক পেশায় পরিনত করে দক্ষ আইসিটি জনবলকে এই খাতে আকৃষ্ট করতে হবে। এই বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মাননীয় আইসিটি মন্ত্রী মহোদয়ের সানুগ্রহ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
সর্বস্তরের লেখক, পাঠক, সাংবাদিক, কলামিস্ট, ছাত্র ছাত্রী, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সংসদ সদস্য, সরকারী আমলা, আইসিটি পেশাজীবী তথা দেশপ্রেমিক জনগনের কাছ থেকে এই
বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা, সমর্থন ও মতামত কামনা করছি।
নিবেদক,
একজন সরকারী আইসিটি কর্মকর্তা
সংকলিত - মোহাম্মদ আক্তার আলী, প্রথম আলো ব্লগ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


