এক
বছরখানেক আগের কথা। আমার পেনড্রাইভটা বেশ কিছুদিন যাবত খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কিনি কিনি করে নতুন একটা পেনড্রাইভ আর কেনা হয়ে উঠছেনা। হঠাৎ একদিন ফার্মগেটে ওভারব্রিজের ওপর দেখি ঝুড়িতে করে একজন পেনড্রাইভ বিক্রি করছে। দাম ছিল নিতান্তই কম। আমি সাতপাঁচ না ভেবে খুব সুন্দর দেখে একটা ৮ গিগাবাইটের পেনড্রাইভ কিনলাম।
পেনড্রাইভ নিয়ে খুশী মনে বাড়ি ফিরলাম। তাড়াহুড়া করে ফ্রেশ না হয়েই ল্যাপটপে পেনড্রাইভ গুঁজলাম। নতুন পেনড্রাইভ কেনার চাপা উত্তেজনায় আমি মশগুল। পেনড্রাইভ ইউএসবি পোর্টে ঢুকানোর পর নতুন ডিভাইস পাওয়া উপলক্ষে একটা আওয়াজ বের হবার কথা। কোন আওয়াজ নাই। পোর্ট চেঞ্জ করে দেখলাম, কোন খবর নাই। ল্যাপটপ রিস্টার্ট দিলাম, কোন খবর নাই। আমি যেন একটা মৃত জীবকে জীবন্ত ভেবে বৃথা আর্তনাদ করছি। ঠকে যাবার লজ্জা আর গিন্নীর কাছে এটা নিয়ে অপমানিত হবার ভয় আমাকে ভেতর থেকে ঘুণপোকার মত খাচ্ছিল।
পরে এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম, এটা নাকি একটা মিথ্যা পেনড্রাইভ। মানে পেনড্রাইভের মত দেখতে, কিন্তু আসলে একটা ইউএসবি প্লাগ ছাড়া কিছুই নয়। আহারে ব্যাবসা! আহারে আমার সোনার বাংলা। মনে পরে গেল আমরা একসময় দুর্নীতির অলিম্পিকে স্বর্ণপদক পেতাম। এখন মনে হয় ব্রোঞ্জ ট্রোঞ্জ পাই।
দুই
ঢাকা শহরে অনেকেই আছেন যারা লোকাল বাসে চড়েন না। মুলতঃ তাদের লোকাল বাসে চড়তেই হয়না। আমি এই দলে পরিনা। আমাকে হয়ত মাসে একবার দুইবার চড়তে হয়। কিন্তু মজার বিষয় হল, আজ পর্যন্ত লোকাল বাসে চড়ে আমি কোনদিন সীটে বসে থাকতে পারিনাই। এমন না যে আমি সীটই পাইনা। সীট আমি প্রায়ই পাই। কিন্তু সীটে বসার পর কোন বৃদ্ধ বা নারী এসে আমার আশে পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে আমার আর সীটে বসে থাকা হয় না। এটা আমার স্বভাববিরুদ্ধ। হ্যাঁ, যদি মনে করেন নিজের ঢোল নিজে পেটাচ্ছি তাহলে তাই।
ঘটনাটা আজ দুপুরের। কোন এক অখ্যাত লোকাল বাসে চড়ে বসেছি। গন্তব্য উত্তরা। আমি সামনের দিকের একটা সীটে বসেছি মাত্র। একই স্টপেজে ঠিক তখনি একটি পরিবার এসে বাসে উঠলো। পরিবারের সদস্য চার। মা, দুই মেয়ে(একটির বয়স আনুমানিক ছয় সাত অন্যটির তের চৌদ্দ) আর একটি বছর চারেকের ছেলে। মা, ছোট মেয়েটি আর বছর চারেকের সেই ছেলেটি লেডিস সীটে জায়গা পেল। তের চৌদ্দ বছরের সেই মেয়েটি আমার সীটের পাশে এসে দাঁড়িয়ে থাকলো।
বেশ বুঝতে পারছিলাম মেয়েটির দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে। তার উপর কনট্রাকটর বারবার এই রাস্তা দিয়ে আসে যায়। যাত্রীরা এই রাস্তা দিয়ে ওঠানামা করে। আর সমগ্র বাসের কমপক্ষে ত্রিশ জোড়া চোখের ক্ষুধার্ত দৃষ্টি তো আছেই। আমি উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটাকে বললাম, বসো। মেয়েটা তাড়াহুড়ো করে বসে পড়লো। বসতে বসতে কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে বলল, থ্যাংক ইউ আঙ্কেল। আমি মাথা নেড়ে কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করলাম। বিমানবন্দরে এসে ঐ সীটে বসা অন্য ভদ্রলোক নেমে গেলেন। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, অন্য একজন দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী যখন ঐ সীটে বসতে চাচ্ছে মেয়েটা তাকে কঠোরভাবে রিফিউজ করে আমাকে বসার জন্য ডাকছে। আমি বললাম যে, আমি সামনেই নেমে যাবো। মেয়েটা তারপর লোকটাকে বসতে এলাউ করল।
যাই হোক, আমি উত্তরায় নেমে রিকশা নিলাম। আমার গন্তব্যস্থান রিকশায় তিন মিনিটের পথ। রিকশা থেকে নেমে হিপ পকেটে হাত ঢুকিয়েছি ভাড়া দেবার জন্য। কিন্তু একি? আমার মানিব্যাগ কই? আমার পকেট তো গড়ের মাঠ। সাথে সাথে অ্যাকশন মুভির ফ্ল্যাশব্যাকের মত আমার মাথায় সবকিছু ঘুরপাক খাচ্ছে। অনুমান করলাম মেয়েটাকে বসতে বলে যখন আমি বাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম তখনি ঘটনাটা ঘটেছে। টাকা হয়ত বেশী ছিলনা সেখানে কিন্তু ছিল আমার পরিচয়পত্র এবং গোটা তিনেক ডেবিট ক্রেডিট কার্ড।
আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। মাগো তোমার কপালে কলংকের টিপ পড়াতে আমার হাত বারবার কেঁপে ওঠে। আমায় ক্ষমা করো মা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




