
প্রথম দর্শনে তাঁর রূপ নিরিক্ষণ করে একটা বাক্যই হৃদয়ে উচ্চারিত হয়েছিল ' হে রাম ' ! যেন স্বয়ং রাম ধরিত্রীতে পদার্পণ করেছেন । সামনে উপবিষ্ট ভাসুসেনার দিকে তাকিয়ে একথাই ভাবছিলেন রানী ভানুমতী । তাঁর জন্ম ক্ষত্রিয়কুলে । সুপুরুষ তিনি কম দেখেননি ।কিন্তু এই রূপবানের ন্যায় রূপ তাঁর অদেখাই ছিল । নীলপদ্মাক্ষী , আজানুবাহু , স্বর্ণের মতো গাত্রবর্ণ , সুললাটের দুপাশে বহমান কৃষ্ণমেঘবর্ণ কেশরাশি মুখমন্ডলকে সমৃদ্ধ করেছে । রানী সন্ধিহান হন এই ভেবে যে এই দিব্যরূপ এক সামান্য সারথির সন্তানের কি করে হতে পারে ? হায় ! বড়ই হতভাগ্য সেই পিতা যিনি এহেন পুত্রের পিতৃপরিচয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ।
' পাশার দান দিন ভদ্রে ' -- অঙ্গরাজা কর্ণের সুগম্ভীর স্বরে সম্বিত ফেরে রানী ভানুমতীর । পাশার দান সাজাতে গিয়ে তাঁর মনে হয় , আজ যেন তিনি নিজের তৈরী বুহ্যে নিজেই আবদ্ধ হয়েছেন। ইতিপূর্বেও ভাসুসেনার সাথে বহুবার পাশা খেলেছেন রানী ভানুমতী । প্রতিবারই তিনিই জিতেছেন । তবে এই জয় নিয়ে প্রবল সংশয় তৈরী হচ্ছিল রানীর । কারন অঙ্গরাজা কর্ণ শুধুই পরাক্রমী ধনুর্ধর নন , তিনি সর্ববিদ্যায় পারদর্শী ।
তাঁর স্বয়ম্বর সভায় , অঙ্গরাজা যেভাবে জরাসন্ধকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন , সেই স্মৃতি এখনও উজ্জ্বল ভানুমতীর ।
সেইসাথে এই পরশুরাম শিষ্য বেদঙ্গ , সুপন্ডিত । তিনি যে কিভাবে ভানুমতীর কাছে পাশা খেলায় পরাজিত হতেন সেটা বোধগম্য হতে রানীর কিছুকাল সময় লেগেছিল ।
ইতিপূর্বে অঙ্গরাজা কর্ণ তাঁর প্রিয় মিত্র দুর্যোধন পত্নী ভানুমতীর সাথে যতবারই পাশা খেলেছেন ততবার নিজের যুদ্ধে জেতা কোনো রাজ্য পাশার পন হিসাবে রেখেছেন আর পরাজয় বরন করে রাজ্যহারা হয়েছেন । তারপর দুর্যোধন তা পুনরায় ফিরিয়ে দিয়েছেন । আসলে এ ছিল দুই মিত্রের খেলা । একজন যদি আনুগত্য দেখান তো অপরজন সেই আনুগত্যের প্রতি সম্মান দেখান । কিন্তু ভানুমতীও ক্ষত্রিয়কন্যা । এইভাবে জয়ী হতে তিনি সম্মত নন। তাই ভাসুসেনা চতুর্থবার দিগ্বিজয় করে যখন পাশা খেলতে এলেন তখন দুর্যোধন মহিষী স্মিত হাস্যের সাথে তাঁকে বললেন ' হে বীরশ্রেষ্ঠ , এবারেও যদি আপনি পরাজিত হন তবে আপনার পত্নী ভ্রূশালী অত্যন্ত ব্যথিত হবেন ! তাঁর ইচ্ছা অন্তত একবার আপনি আমাকে পরাজিত করুন । এইকথা স্মরণে রেখে খেলবেন অঙ্গরাজা । '
সেই খেলায়ই এইসময় চলছে ।আজ ভাসুসেনার কাছে ভানুমতীর পরাজয় সুনিশ্চিত । কিন্তু এই অজেয় পুরুষকেই তিনি একাধিকবার পরাজিত করেছেন ।হোক না তা বীরের আত্মসর্ম্পন ! এই চিন্তা রানীকে আনমনা করে দিল । । রানী দ্যুতক্রিড়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন । অঙ্গরাজা রানীকে খেলা ছেড়ে না ওঠার অনুরোধ করলেন । কিন্তু রানী কর্ণপাত করলেন না । তখন রাজা তাঁর অঞ্চলপ্রান্ত ধরে তাঁকে খান্ত করার প্রচেষ্টা করলেন ।তাঁর অনিচ্ছাকৃত তর্জনীস্পর্শে চূর্ণবিচূর্ণ হোলো রানীর দীর্ঘ মুক্তো হার । অষ্ট হাতের শক্তি যাঁর এক হাতে আছে তাঁর তর্জনীস্পর্শে এমন ঘটনাই ঘটতে পারে । ঠিক এই সময় তাঁরা যুবরাজ দুর্যোধনের কক্ষে প্রবেশের সংবাদ পেলেন ।
এই অকিন্চিৎকর ঘটনা কর্ণ ও ভানুমতী দুজনকেই স্তব্ধ করে দিয়েছিলো । কর্ণ যে তাঁর স্বামীর প্রাণাধিক প্রিয় সখা , একথা ভানুমতীর অজ্ঞাত নয় । কিন্তু সেইসঙ্গে তিনি দুর্যোধনের ক্ষাত্র তেজ সম্পর্কেও অবগত আছেন ।
কুরুঅন্তপুরে প্রবেশাধিকার ভাসুসেনা অর্জন করেছেন । কারন তিনি রাজমাতা গান্ধারীর স্নেহধন্য । তাই এই প্রবেশাধিকারকে দুর্যোধনের দান বলা যায় না । দানের ক্ষেত্রে দাতার মহত্ম থাকলেও গ্রহীতার গরিমা থাকে না । আর দাতা কর্ণ দান করেন কিন্তু দান নেন না । একথা সুবিদিত । আজ কি কর্ণের অর্জিত সম্মানে কালিমা লিপ্ত হবে , শুধুমাত্র ভানুমতীর কারনে । এক কুশ্রী ইতিহাসের সাক্ষ্য হবেন তিনি ?
রানীর এহেন চিন্তাধারার মধ্যেই দুর্যোধন কক্ষে প্রবেশ করলেন । একটি মুক্তো তাঁর পদপিষ্ট হতেই এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ালেন যুবরাজ ।তারপর ভূপতিত একটি মুক্তো নিজের করতলে তুলে নিলেন এবং স্মিত হাস্যের সাথে বললেন ' প্রিয় সখা , তুমি কি নিশ্চেষ্ট থাকবে নাকি আমার প্রিয়তমার মুক্তো হারের মুক্তোগুলো একত্রিত করতে আমায় সাহায্য করবে ? '
কর্ণ ও দুর্যোধনের মিত্রতা আজও রানী ভানুমতীর মুক্তোহারের মতোই শুভ্র , সমুজ্জ্বল ।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ৯:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



