somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তোহার

০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ৯:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




প্রথম দর্শনে তাঁর রূপ নিরিক্ষণ করে একটা বাক্যই হৃদয়ে উচ্চারিত হয়েছিল ' হে রাম ' ! যেন স্বয়ং রাম ধরিত্রীতে পদার্পণ করেছেন । সামনে উপবিষ্ট ভাসুসেনার দিকে তাকিয়ে একথাই ভাবছিলেন রানী ভানুমতী । তাঁর জন্ম ক্ষত্রিয়কুলে । সুপুরুষ তিনি কম দেখেননি ।কিন্তু এই রূপবানের ন্যায় রূপ তাঁর অদেখাই ছিল । নীলপদ্মাক্ষী , আজানুবাহু , স্বর্ণের মতো গাত্রবর্ণ , সুললাটের দুপাশে বহমান কৃষ্ণমেঘবর্ণ কেশরাশি মুখমন্ডলকে সমৃদ্ধ করেছে । রানী সন্ধিহান হন এই ভেবে যে এই দিব্যরূপ এক সামান্য সারথির সন্তানের কি করে হতে পারে ? হায় ! বড়ই হতভাগ্য সেই পিতা যিনি এহেন পুত্রের পিতৃপরিচয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ।

' পাশার দান দিন ভদ্রে ' -- অঙ্গরাজা কর্ণের সুগম্ভীর স্বরে সম্বিত ফেরে রানী ভানুমতীর । পাশার দান সাজাতে গিয়ে তাঁর মনে হয় , আজ যেন তিনি নিজের তৈরী বুহ্যে নিজেই আবদ্ধ হয়েছেন। ইতিপূর্বেও ভাসুসেনার সাথে বহুবার পাশা খেলেছেন রানী ভানুমতী । প্রতিবারই তিনিই জিতেছেন । তবে এই জয় নিয়ে প্রবল সংশয় তৈরী হচ্ছিল রানীর । কারন অঙ্গরাজা কর্ণ শুধুই পরাক্রমী ধনুর্ধর নন , তিনি সর্ববিদ্যায় পারদর্শী ।
তাঁর স্বয়ম্বর সভায় , অঙ্গরাজা যেভাবে জরাসন্ধকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন , সেই স্মৃতি এখনও উজ্জ্বল ভানুমতীর ।

সেইসাথে এই পরশুরাম শিষ্য বেদঙ্গ , সুপন্ডিত । তিনি যে কিভাবে ভানুমতীর কাছে পাশা খেলায় পরাজিত হতেন সেটা বোধগম্য হতে রানীর কিছুকাল সময় লেগেছিল ।

ইতিপূর্বে অঙ্গরাজা কর্ণ তাঁর প্রিয় মিত্র দুর্যোধন পত্নী ভানুমতীর সাথে যতবারই পাশা খেলেছেন ততবার নিজের যুদ্ধে জেতা কোনো রাজ্য পাশার পন হিসাবে রেখেছেন আর পরাজয় বরন করে রাজ্যহারা হয়েছেন । তারপর দুর্যোধন তা পুনরায় ফিরিয়ে দিয়েছেন । আসলে এ ছিল দুই মিত্রের খেলা । একজন যদি আনুগত্য দেখান তো অপরজন সেই আনুগত্যের প্রতি সম্মান দেখান । কিন্তু ভানুমতীও ক্ষত্রিয়কন্যা । এইভাবে জয়ী হতে তিনি সম্মত নন। তাই ভাসুসেনা চতুর্থবার দিগ্বিজয় করে যখন পাশা খেলতে এলেন তখন দুর্যোধন মহিষী স্মিত হাস্যের সাথে তাঁকে বললেন ' হে বীরশ্রেষ্ঠ , এবারেও যদি আপনি পরাজিত হন তবে আপনার পত্নী ভ্রূশালী অত্যন্ত ব্যথিত হবেন ! তাঁর ইচ্ছা অন্তত একবার আপনি আমাকে পরাজিত করুন । এইকথা স্মরণে রেখে খেলবেন অঙ্গরাজা । '

সেই খেলায়ই এইসময় চলছে ।আজ ভাসুসেনার কাছে ভানুমতীর পরাজয় সুনিশ্চিত । কিন্তু এই অজেয় পুরুষকেই তিনি একাধিকবার পরাজিত করেছেন ।হোক না তা বীরের আত্মসর্ম্পন ! এই চিন্তা রানীকে আনমনা করে দিল । । রানী দ্যুতক্রিড়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন । অঙ্গরাজা রানীকে খেলা ছেড়ে না ওঠার অনুরোধ করলেন । কিন্তু রানী কর্ণপাত করলেন না । তখন রাজা তাঁর অঞ্চলপ্রান্ত ধরে তাঁকে খান্ত করার প্রচেষ্টা করলেন ।তাঁর অনিচ্ছাকৃত তর্জনীস্পর্শে চূর্ণবিচূর্ণ হোলো রানীর দীর্ঘ মুক্তো হার । অষ্ট হাতের শক্তি যাঁর এক হাতে আছে তাঁর তর্জনীস্পর্শে এমন ঘটনাই ঘটতে পারে । ঠিক এই সময় তাঁরা যুবরাজ দুর্যোধনের কক্ষে প্রবেশের সংবাদ পেলেন ।
এই অকিন্চিৎকর ঘটনা কর্ণ ও ভানুমতী দুজনকেই স্তব্ধ করে দিয়েছিলো । কর্ণ যে তাঁর স্বামীর প্রাণাধিক প্রিয় সখা , একথা ভানুমতীর অজ্ঞাত নয় । কিন্তু সেইসঙ্গে তিনি দুর্যোধনের ক্ষাত্র তেজ সম্পর্কেও অবগত আছেন ।

কুরুঅন্তপুরে প্রবেশাধিকার ভাসুসেনা অর্জন করেছেন । কারন তিনি রাজমাতা গান্ধারীর স্নেহধন্য । তাই এই প্রবেশাধিকারকে দুর্যোধনের দান বলা যায় না । দানের ক্ষেত্রে দাতার মহত্ম থাকলেও গ্রহীতার গরিমা থাকে না । আর দাতা কর্ণ দান করেন কিন্তু দান নেন না । একথা সুবিদিত । আজ কি কর্ণের অর্জিত সম্মানে কালিমা লিপ্ত হবে , শুধুমাত্র ভানুমতীর কারনে । এক কুশ্রী ইতিহাসের সাক্ষ্য হবেন তিনি ?
রানীর এহেন চিন্তাধারার মধ্যেই দুর্যোধন কক্ষে প্রবেশ করলেন । একটি মুক্তো তাঁর পদপিষ্ট হতেই এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ালেন যুবরাজ ।তারপর ভূপতিত একটি মুক্তো নিজের করতলে তুলে নিলেন এবং স্মিত হাস্যের সাথে বললেন ' প্রিয় সখা , তুমি কি নিশ্চেষ্ট থাকবে নাকি আমার প্রিয়তমার মুক্তো হারের মুক্তোগুলো একত্রিত করতে আমায় সাহায্য করবে ? '

কর্ণ ও দুর্যোধনের মিত্রতা আজও রানী ভানুমতীর মুক্তোহারের মতোই শুভ্র , সমুজ্জ্বল ।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ৯:৩৪
২৯টি মন্তব্য ৩১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চন্দ্রপ্রভা

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

চন্দ্রপ্রভা
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

তোমাকে দেখে মোহিত হই চন্দ্রপ্রভা
রোদ পড়লে চকচক করে
এতই সুন্দর লাগে
একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি।
তোমাকে ছুঁতে ইচ্ছে করে
কিন্তু পাই না যে সাহস।
তুমি নাই বলে কি এত ঝড়?
তুমি পাশে নাই বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি কি পেলেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৬



বাংলার দুই নোবেল জয়ী রবি ঠাকুর আর ডঃ ইউনুসের পিছনে অনেক কথাই তো বললেন।
ব্লগ লেখায় ভরিয়ে ফেললেন!
খোদা তাঁদেরকে যে জায়গা দিয়েছেন, তা থেকে এক চুল কি নিচে নামাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমরা নেহা বোরা কে বাংলাদেশের কথা বোলো না

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২


নেহা বোরাকে তোমরা বাংলাদেশের কথা বোলো না। বোলো না যে, তিনি যখন বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ভূয়সী প্রশংসা করছেন, তখন বাংলাদেশে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুনেরা ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে জেয়াফত খাওয়ার আন্দোলন... ...বাকিটুকু পড়ুন

জগন্নাথবাসীগণ, আমার কথা শুনছেন কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

জগন্নাথবাসীগণ,
আপনাদের গরু কোরবানি যদি হযরত জাবের (রাঃ)-এর মতো
নবীজীর সম্মানে হয়ে থাকে, তাহলে মোবারকবাদ।
আর, শুধু প্রতিবাদ দেখাতে একটি অবলা পশুকে হত্যা করে থাকলে,
তার জন্যে খোদার দরবারে বিচার দিলাম।
...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনন্দন নাবিহা সাকলায়েন: ৩০ বছর পরের এআই পটেনশিয়াল

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৭ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৩:৩৮


কনসেপ্ট টা খুবই সোজা...পৃথিবীর তাবত মানুষ ই জানে যে আপনার বিশ বছর বয়সে শরীরে যে কোষ গুলি আছে তা আপনার ৬০ বছর বয়সের কোষ আর সেইম না ..লম্বা সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×