২০১৪ সাল।
প্রথমবারের মতোন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেছি। এয়ারপোর্টের বাহিরে অপেক্ষা করছেন কাকা-কাকী।এদিকে ইমিগ্রেশনে হলো প্যাঁচ, কাগজ-পত্র ক্লিয়ার না করে বের হতে পারছিনা।
সময় চলে গেছে একঘন্টা, আমরা যে এসেছি এই খবর দেওয়ার জো নেই।
মার্কিন দেশে সময়জ্ঞান খুব কড়া, উনারা নিশ্চিত ভেবে নিবেন আমরা কোনো কারণে আসতেই পারিনাই। হয়তো দূরের পথ পাড়ি দিয়ে আবার বাসায় চলে যাবেন।
কুইন্স থেকে কেনেডি, কম দূরত্ব না। যাত্রাবাড়ি থেকে কুমিল্লা-বিশ্বরোড সমান দূর হবে?
হতে পারে!
সে যাইহোক, আমাদের কাছে মার্কিন সিমকার্ড নাই, এয়ারপোর্টে ওয়াইফাই পাবো কিনা অনিশ্চিত।কাকার বাসার ঠিকানাও জানিনা ভালো করে।একবার উনারা চলে গেলে কঠিন বিপদ!
সিদ্ধান্ত নিলাম কারো থেকে চেয়ে নিয়ে ফোনকল করবো। ভদ্রলোকের দেশ, সাহায্য করার লোকের তো অভাব হবেনা। তাছাড়া চারপাশে দস্তুরমতো পুলিশের লোক। আগেও দেখেছি, তাছাড়া নভেল- সিনেমা মারফত জেনেছি, উন্নত বিশ্বের পুলিশ খুব উপকারী, আদতেই জনগণের আপনা লোক।
তো, গেলাম পুলিশের কাছে,
'আমার খুব প্রয়োজন একটা ফোনকল করা। আঙ্কলকে ফোন দিয়ে জানাতে হবে আমরা পৌছেছি, ইমিগ্রেশনে একটু দেরী হচ্ছে। আমার কাছে কয়েন নেই, বুথ ব্যবহার করতে পারছিনা, উপায় বাতলে দাও কি করতে পারি।'
কিন্তু পুলিশ উপায়হীন, নিয়ম নাকি নেই, সাহায্য করতে পারবেনা এই ব্যাপারে। কোনো তথ্যও দিতে পারলোনা।
একজন, দুইজন, তিনজন - একই প্রশ্ন আর একই উত্তর।
'স্যরি।'
এবার এক সাহেব মতোন শ্বেতাঙ্গকে বললাম। সাহেবরা ত ভালোই নিয়েছেন আমাদের থেকে, অতীতের প্রায়শ্চিত্ত করতে দিলেও দিতে পারেন একটা ফোনকলের সুযোগ।
না, সাহেবের ফোনে সীম কিংবা নেটওয়ার্ক,কি যেন নাই, দিতে পারলেন না।
আমাদের চোখে সব সাদা চামড়াই সাহেব, হূলস্থুল ব্যাপার। তবে সব সাদা-ই ইংরেজ না বাস্তবে, ইনিও তাই,মেক্সিকান বা লাতিনো। হয়তো এজন্য প্রায়শ্চিত্তির জ্বালা ছিলোনা তিনার।
বাঙালী আমি, জাতে-রক্তে বর্ণবাদ-সাম্প্রদায়িকতা-বিভক্তির সর্বকলা,সর্বজ্ঞান কেটলীর পানির মতো ফুটছে। তাই এতোক্ষণ গেছি খালি সফেদ গাত্রধারীদের কাছে, যদিও চারপাশে কৃষ্ণাঙ্গও ছিলো প্রচুর।
ছোটোবেলায় কে যেন বলেছিলো ওরা বড় ডেঞ্জারাস, তাছাড়া দু-চার কথার কাটাকাটিতে আত্মীয়ের মধ্যে একজনকে রীতিমতো গুলি করে দিয়েছিলো। অতএব, ওদের কাছে চাওয়ার সাহস হয়নি।
হঠাৎ কাঁধে হাত, রিফ্লেক্সে ফিরলাম পেছনে। ছাইরঙ্গা টু-পীস পড়া, চোখে রীমড চশমা, পঞ্চাশোর্ধ একজন ভদ্রলোক। আরেকহাতে কালো মোবাইলখানা বাড়িয়ে রেখেছেন। চোখের ইশারায় এগিয়ে দিলেন।
কাকাকে কল দিলাম, কথা হলো।
ফোন ফিরৎ দিলাম, সাথে অন্তরিক ধন্যবাদ।
'এটা কোনো ব্যাপারই না, আরো কল করা প্রয়োজন হলেও করতে পারো'
না, আর প্রয়োজন ছিলোনা। আরেকবার ধন্যবাদ দিয়ে, স্মিত হাসি উপহার পেয়ে নিশ্চিন্তে ইমিগ্রেশনের ওয়েটিং এর জায়গায় ফেরৎ গেলাম।
হ্যা, উনি কৃষ্ণাঙ্গই ছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ....
পরিচিত অবয়বগুলো বিপদে পাশে থাকেনা, অথচ এভাবেই অচেনা মানুষ অপ্রত্যাশিত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। সেই সাথে কিছু ভুল ভাঙ্গে,আর কিছু ভুল নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



