somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তাহমিদ রহমান
একজন অলস মানুষ; ভালোবাসি স্বপ্ন দেখতে, চিন্তা করতে, আর কবিতা লিখতে।পেশায় চিকিৎসক, তবে স্বপ্ন দেখি সাহিত্যের সাথে নিবিড় সখ্য গড়বার।ছাত্রজীবনে জড়িত ছিলাম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে, ভবিষ্যতে কাজ করতে চাই কন্যাশিশু নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে।

অনিকের গল্প (পর্ব ৩)

৩০ শে নভেম্বর, ২০২৫ রাত ৯:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




অধ্যায় ১ঃ হাসপাতালের নাইট শিফট (৩য় খন্ড - সমাপ্য)

( পর্ব ২ এর পর)

.......................


বাস তার স্টপেজে এসে থামল। অনিক নেমে গেল।

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে শুরু করল অনিক। পাঁচ মিনিটের হাঁটা। ছোট্ট একটা রাস্তা, দুপাশে সারি সারি ফ্ল্যাট — দোতলা, তিন তলা, ইটের দেয়াল, সাদা জানালা। Stratford-এর এই এলাকা লন্ডনের মান অনুযায়ী সস্তা, কিন্তু তবুও ব্যয়বহুল।
অনিকের ফ্ল্যাট দ্বিতীয় তলায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠল। চাবি দিয়ে দরজা খুলল।
ভেতরে ঢুকল।
ছোট্ট ফ্ল্যাট — সাড়ে চারশ স্কয়ার ফুট। লিভিং রুম, রান্নাঘর, বেডরুম, বাথরুম।

অনিক জুতো খুলে ব্যাগ সোফায় ফেলল, জ্যাকেট হ্যাঙ্গারে টাঙাল। ফ্ল্যাটটা নীরব — শুধু রেফ্রিজারেটরের মৃদু গুঞ্জন। জানালা দিয়ে ধূসর আলো, বাইরে মেঘলা আকাশ।রান্নাঘরে গিয়ে ডিম ভাজল, দুটো রুটি টোস্ট করল। খেল — স্বাদ নেই, শুধু পেট ভরানো। যান্ত্রিক। প্লেট ধুয়ে পানি পান করে বেডরুমে গেল। পর্দা টানা, অন্ধকার। বিছানায় শুয়ে পড়ল।
চোখ বন্ধ করল। কিন্তু মাথায় হাজারো চিন্তা।

মিসেস প্যাটারসনের কথা মনে পড়ল — "Doctor, never get old………it's not fun at all."
বুড়ো হওয়া। একা হওয়া। শরীর ভেঙে পড়া।
অনিকের বয়স ত্রিশ। এখনও তরুণ। কিন্তু মনে হলো সে বুড়ো হয়ে গেছে ভেতর থেকে।
জীবনে কী চায় সে?

প্রেম? হ্যাঁ। কিন্তু কোথায় পাবে?
বন্ধু? হ্যাঁ। কিন্তু লন্ডনে কে আছে?
পরিবার? ঢাকায়। হাজার মাইল দূরে।
তাহলে কী আছে তার কাছে?
একটা চাকরি। একটা খালি ফ্ল্যাট। একটা একা জীবন।

চোখ খুলে সিলিংয়ের দিকে তাকাল। সাদা, ফাঁকা। কোণায় একটা দাগ — পুরোনো লিক, কখনো ঠিক করা হয়নি।
মোবাইলের স্ক্রিন অন করল। সকাল আটটা বেজে পনেরো। ঢাকায় দুপুর দুটো।
WhatsApp-এ মায়ের মেসেজ এখনো খোলা - "ভালো আছো, বাবা? খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো করছ তো? শীত বেশি?"
টাইপ করতে গিয়ে থামল। কী লিখবে?

"হ্যাঁ মা, ভালো আছি" — মিথ্যা।
"মা, আমি একা। আমি ক্লান্ত" — সত্যি, কিন্তু লেখা যায় না।
মোবাইল বালিশের পাশে রেখে আবার চোখ বন্ধ করল। এবার ঘুম এল। ধীরে ধীরে। ক্লান্তি তাকে টেনে নিয়ে গেল অন্ধকারে।
স্বপ্ন দেখল।

ঢাকা। মেডিকেল কলেজের ক্যাফেটেরিয়া। বন্ধুরা বসে আছে — হাসছে, গল্প করছে, চায়ের কাপ হাতে। কেউ সিগারেট ধরাচ্ছে। কেউ মোবাইলে লাউড স্পিকারে গান শোনাচ্ছে।
অনিকও আছে সেখানে তাদের মাঝে — হাসছে, কথা বলছে। জীবন্ত।
হঠাৎ সব ঝাপসা হয়ে গেল। বন্ধুরা মিলিয়ে গেল। ক্যাফেটেরিয়া খালি হয়ে গেল। শুধু অনিক একা বসে আছে। চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে গেছে।

জেগে উঠল।
দুপুর একটা। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়েছে — যথেষ্ট নয়, কিন্তু আর ঘুমাতে পারছে না। মাথা ভারী, মুখ শুকনো।
বাথরুমে গেল অনিক। মুখ ধুল। আয়নায় তাকাল — চোখ লাল, চুল এলোমেলো, খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গজিয়েছে। শেভ করা দরকার। কিন্তু এখন না।
রান্নাঘরে গিয়ে চা বানাল — দুধ, চিনি, বাংলাদেশি স্টাইল। সোফায় বসে চায়ে চুমুক নিল। গরম। চমৎকার!
ল্যাপটপ খুলল। Netflix। কিছু একটা দেখবে ভেবেছিল। কিন্তু মন নেই। বন্ধ করে দিল।
জানালায় গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে রাস্তা, গাড়ি যাচ্ছে, মানুষ হাঁটছে। জীবন চলছে।
আজ শনিবার। আগামীকাল রবিবার। দুদিন ছুটি। তারপর আবার হাসপাতাল, আবার সাড়ে বারো ঘণ্টার দীর্ঘ শিফট।
এই কি জীবন?

রাহুলের মেসেজ এসেছে — "আজ রাতে পাব, রাত আটটা। শোরডিচ। সিলিহর্স পাব। আসবে?"
যাবে? নাকি এখানে বসে থাকবে?
টাইপ করল। "দেখি।"
রিপ্লাই এল। "ঠিক আছে। জানিও।"
ফোন সরিয়ে রাখল।
আবার জানালায় তাকাল। বাইরে মেঘ কেটে একটু রোদ বেরিয়েছে। ধূসর আকাশে একটুকরো নীল।
হয়তো বেরোবে, হাঁটবে, পাবে যাবে। হয়তো!

কিন্তু এই মুহূর্তে সে শুধু দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে, চায়ের কাপ হাতে, একা।
লন্ডনের নভেম্বর। শীত নামছে। দিন ছোট হচ্ছে। রাত দীর্ঘ হচ্ছে।
আর অনিক আহমেদ — ত্রিশ বছর বয়সী, সুদর্শন, ভাবুক, একাকী এক প্রবাসী বাংলাদেশী — দাঁড়িয়ে আছে তার খালি ফ্ল্যাটে, এবং ভাবছে:

এই কি সব?
নাকি আরও কিছু আছে?
নাকি কোথাও, কেউ তার জন্য অপেক্ষা করছে?

সে জানে না। এখনও জানে না।
কিন্তু জীবন চলছে। সময় গড়াচ্ছে। আর কোথাও, হয়তো, কোন একটা নতুন গল্প শুরু হতে চলেছে।


...............(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ডিসেম্বর, ২০২৫ রাত ৩:৫২
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একলা আমি...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৫

সব মানুষের ভিতর একটা একলা 'আমি' থাকে। যে আমি হাজার মানুষের ভিড়েও নিজের একাকিত্বকে আগলে রাখে। সেখানে একটা 'তুমি'ও থাকে। যে তুমি, চিরবিরহের। যে তুমি অনেক দূরের, যাকে চোখ দেখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরাব পিনে দে.....

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫১



মির্জা গালিব সম্পর্কে একটি গল্প চালু আছে। একদিন তিনি মসজিদে বসে মদ্যপান করছিলেন। তখন মুসল্লিরা তাকে বাধা দিয়ে বললেন "মসজিদ আল্লাহর ঘর, মদ্যপানের জায়গা নয়।" তখন মির্জা গালিব তাঁর বিখ্যাত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বালছাল মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:৩৬



প্রথম পাতায় ব্যান ব্লগারের একটি পোস্টে ব্লগার রাজীব নূর মন্তব্য করে বলেছেন - “ওদের কে ‘বালছাল’ লিখতে দেন। বিনোদন নষ্ট করবেন না।”

বাহ! কী চমৎকার গণতান্ত্রিক দর্শন! এতদিন জানতাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইবাদতে মানুষের লাভ, না করলেও আল্লাহর কোন ক্ষতি নাই

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩১



সূরাঃ ১০৩ আসর, ১ নং থেকে ৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১। মহাকালের শপথ।
২। মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্থ্য
৩। কিন্তু উহারা (ক্ষতিগ্রস্থ্য) নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী কে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৫৭


বাংলাদেশে কোনো অর্থমন্ত্রীর বিদায়ের পর একটা জিনিস প্রায় দেখা যায় । তাঁর একটা লিগ্যাসি তৈরি হয় । স্মরণসভার মতো পত্রিকায় “যুগান্তকারী সংস্কার”, “সাহসী সিদ্ধান্ত”, “দূরদর্শী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×