somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অপরাহ্নের আঁধার (দুই)

২৩ শে মার্চ, ২০০৯ রাত ১২:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দু পা এগোতেই আবার সেই কাশি শোনা যায়। এবার যেন একটু সন্দেহ জাগে মনে। কাশিটা মেয়েলি কাশি মনে হচ্ছে! মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকিয়েই চমকে ওঠে সে।
আলো আঁধারীর বুকে জেগে আছে একটা নারী অবয়ব। পরনে রংচঙে শাড়ি। দূরের ল্যামপোস্টের হালকা আলোতেও সস্তা জরীপাড় শাড়ী ঝিকমিক করছে। ঠোটে কড়া লিপিস্টিক। অবিন্যস্ত শাড়ির আঁচল। বারবার লুটিয়ে পড়তে চাইছে। বয়স বেশি হবে না। বড় জোর আঠারো উনিশ। কিংবা তারও বেশি। চিনতে পারে হাসান। সমাজের লোকজন আড়ম্বর করে তাদের নাম রেখেছে অস্পৃশ্যা, পতিতা, বেশ্যা, পণ্যাঙ্গনা। যেন মানুষ নয়, মানুষেরই কোন জাত। সরীসৃপের যেমন প্রজাতি থাকে।
হাসানকে চুপ করে থাকতে দেখে আরেকটা জোরালো কাশি দিয়ে মেয়েটা এবার কথা বলে উঠে।
‘এক রাইত দুইশো ট্যাকা।’
মেয়েটার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। ল্যামপোস্টের আবছা আলোয় মেয়েটাকে ঝাপসা মনে হচ্ছে। হাসান শাহরিয়ার কিছু না বলে সামনের দিকে হাঁটা দেয়। এরা পাপী। পাপ বেঁচে পেট চালায়। সমাজ এদের কাছ থেকে দূরে থাকার নিয়ম করেছে। সমাজের একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে তারও উচিত নিয়ম পালন করা। শুধু শুধু দাঁড়িয়ে থেকে এদের পাপের আহবান শোনার কোন মানে হয় না। হাসান শাহরিয়ার নিজের পথে এগিয়ে যায়। মেয়েটা তাও পিছু ছাড়ে না।
‘আপনের জন্য একশো ট্যাকা।’
এবার যেন খানিকটা অবাক হয় হাসান। থমকে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে তাকায়। (যদিও অন্ধকারে মেয়েটির চেহারা দেখা যাচ্ছে না।) দুইশো থেকে এক লাফে একশ! নারী মাংসের মূল্য এত কম! বাজারে কসাইরাও তো পশুমাংস বিক্রি করে এর চেয়ে বেশি দামে! তবে কি নিয়তির কাছে নৈতিকতার স্থান পশুর চেয়ে নিচে?
হাসানকে কিছু বলতে না দেখে ওর মৌনতাকেই সম্মতি ভেবে নেয় নারী। উল্লাসে ওর হাত জড়িয়ে ধরে। গলায় ঝরে পড়ে নির্লজ্জ উচ্ছ্বাসÑ ‘আমার ঘরটা বেশি ভালো না, তয় আপনের চিন্তার কারণ নাই। ঘর পছন্দ না হইলে মাসীর ঘরও নেয়া যাইবো। চলেন।’
সম্ভ্রম বিবর্জিতা এই নারীর আহবান কেন যেন ফেলতে পরে না হাসান শাহরিয়ার। সেটা কি সাংসর্গিক সুখ লাভের আশায় নাকি অন্য কিছু তা তার নিজেরও জানা নেই। মোহাচ্ছন্নের মত সে হাঁটতে থাকে মেয়েটার পিছু পিছু।
নিজেকে সে এক সময় আবিষ্কার করে একটা ঝুপরি ঘরে। ঘরে ঢুকেই মেয়েটি দ্রুত হাতে হারিকেন জ্বালিয়ে নেয়। তাকে বসায় ঘরের একটিমাত্র আসবাব জরাজীর্ণ খাটটাতে। এলোমেলো কুঁচকানো চাদর দেখেই বোঝা যাচ্ছে শেষ ঝড়ের রেখে যাওয়া তাণ্ডবচিহ্ন ওটা। কত লোক এখানে রক্ত-মাংসের খেলা ভেলতে আসে? হাসানকে বিছানার চাদরের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি কী বুঝলো কে জানে, ত্রস্তা হাতে চাদর টেনে ঠিক করে দেয়। তেল চিটচিটে ওয়ারওয়ালা বালিশ দুটোও দুহাতে থাবাথুবি দিয়ে তুলা ফুলিয়ে নরম করে নেয়। সবই করছে সে মাথা নিচু করেই। ঘরে ঢোকার পর পরই অন্যরকম হয়ে গেছে মেয়েটা। হঠাৎ বাইরে একটা অস্পষ্ট আওয়াজ শোনা যায়। প্রায় সাথে সাথে ঘর থেকে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে যায় মেয়েটা।
ভেতর থেকে ওদের কথা শুনে কিছুই বুঝতে পারে না হাসান শাহরিয়ার। চুপচাপ বসে তবু শোনার চেষ্টা করে। দুটো মহিলা কণ্ঠের আলোচনার স্বর কিছুক্ষণের বিরতিতে যেন ঝগড়ার স্বরে পাল্টে যাচ্ছে। হারিকেনের শিখাও যেন তাদের স্বরের সাথে পাল্লা দিয়ে তির তির করে কাঁপছে। হারিকেনের হলুদ আলোয় পুরো ঘরটা ফ্যাকাসে হয়ে আছে। তাতে আবছাভাবে চোখে পড়েÑ দেয়ালের এক কোণে রশিতে এলোমেলো ভাবে ঝুলে থাকা একটা কালো ব্লাউজ আর কালো পেটিকোট। ঠিক তার নিচে মেঝেতে তৈজসপত্র, একটা টিনের বাসন, অ্যালমুনিয়ামের গ্লাস কাঙালের মত গড়াগড়ি খাচ্ছে ময়লা একটা ন্যাকড়া পাশে। পতিতার পতিত সংসার।
মাথা নিচু করে মেয়েটা এসে ঢোকে। সশব্দে দরজার খিল আটকে দেয়। এগিয়ে এসে কোন ধরণের ইতস্তত না করেই বসে পড়ে খাটে, ঠিক তার গা ঘেঁষে। হাসান অবাক হয়ে দেখে মেয়েটির চোখ রক্ত লাল। হারিকেনের হলুদ আলো সেটুকু নি®প্রভ করতে পারে না মোটেও। মাথা নিচু অবস্থাতেই মেয়েটি প্রশ্ন করে।
‘সাহেব? ঘর আপনের পছন্দ হয়েছে?’
হাসান এর উত্তরে কী বলবে ভেবে পায় না। চুপ করে থাকে। মেয়েটা যথারীতি মৌনতাই সম্মতি ধরে আরও কাছ ঘেঁষে।
লাফিয়ে লাফিয়ে বেশ কিছু মুহূর্ত পার হয়ে যায়। দুজনেই আড়ষ্ট হয়ে পাশাপাশি বসে থাকে। কথা জোগায় না মেয়েটির গলায়। অবাক বিস্ময় নিয়ে সে তাকিয়ে থাকে সাহেবটির দিকে। অন্য সাহেবরাতো এতক্ষণে তাকে ছিড়ে কুড়ে খেতে শুরু করে দিত। তবে কী ইনি লজ্জা পাচ্ছেন? নাকি ধর্মভয়? নাকি ঘৃণা? মেয়েটি কী করবে ভেবে পায় না। অগত্যা বুকের আঁচলটা ইচ্ছে করেই ফেলে দেয়। ব্লাউজের মধ্যাঞ্চলে বিকট হয়ে ফুটে থাকা মাংসল সৌন্দর্য চোখে পড়ে হাসানের। বুঝতে পারে, যৌবনস্ফীত বুকের কাঁচা মাংসের প্রলোভন দেখাচ্ছে। কিন্তু ওর চোখ দেখে মেয়েটা বুঝতে পারছে না কী ঘটতে চলেছে। তবে আঁচ করার চেষ্টা করছে কখন ঝাপিয়ে পড়বে এ হিংস্র হায়েনাটা। খুবলে খুবলে খাবে তার পাপ, ক্ষুধা, দারিদ্র।
একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে হাসান শাহরিয়ারের। এগিয়ে এসে মেয়েটার বুকের আঁচল তুলে দেয়। পকেট থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে বাড়িয়ে ধরেÑ ‘নাও।’ হতবিহ্বল বারবনিতা হাসানের তুলে দেয়া আঁচলটা গা মাথায় জড়িয়ে নেয়। যন্ত্রের মত হাত বাড়িয়ে নেয় টাকাটাও। অভিনব এ প্রত্যাখ্যানের কারণ খুঁজে পেয়ে আরও আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। অনুভব করে, ঘৃণার শীতলস্পর্শী একটা সরীসৃপ বুক ছেঁচড়ে হেঁটে চলেছে হৃদয়ের প্রকোষ্ঠ থেকে প্রকোষ্ঠে। তবে কী... তবে কী...!
সে কথা জানায় না আগন্তুক। নিজ হাতে দরজা খুলে বেরিয়ে আসে ঘরের বাইরে।
চলবে...
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন চালাতে শহরে থাকা কিন্তু বেঁচে থাকা যেন বাড়িতেই

লিখেছেন Sujon Mahmud, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৯

ঈদের ছুটিটা কেমন যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল, এই তো সেদিন বাড়ি গেলাম—মায়ের হাতের রান্না, বাবার গল্প, ছোট মেয়ের হাসি, আর স্ত্রীর সেই নীরব অভিমান… সবকিছু মিলিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

×