somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মা বিহীন দিনগুলো

১৩ ই মে, ২০১০ রাত ১২:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সময়টা ১৯৯৩ সাল এর দিকে। ক্লাস থ্রির বার্ষিক পরিক্ষা শেষ; ফোরে উঠলাম। ক্লাস ও শুরু হয়ে গেছে। ঠিক তখনি স্বিদ্ধান্ত হল যে আমাকে উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ যেতে হবে, মানে গ্রাম থেকে ঢাকাতে চাচার বাসায় থেকে পড়াশোনা করতে হবে। এই খবর পাওয়ার পরে খুশিতে লাফাচ্ছি। ঢাকা যাব পড়তে; ভাবতে ভালই লাগছিল। মাথায় আর কোন ভাবনার উদয় হচ্ছিল না। যথা সময়ে চাচার সাথে ঢাকা রওনা দিলাম। লঞ্চে করে ঢাকা যাচ্ছি অনেক ভাল লাগছে। রাতে ঘুমালাম। ভোরে যখন ঘুম ভাঙল তখন ইতোমধ্যে ঢাকা চলে আসছি।

তখনি মনের মধ্যে একটা হাহাকার বোধ করলাম। কারন আজ ঘুম থেকে উঠে আমার মায়ের মুখ দেখা হয়নি। মিরপুরে চাচার বাসায় আসলাম। শুরু হল আমার শহুরে জীবন। বাসার পাশে একটা স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হল। ক্লাস এ যেতে শুরু করলাম। কিন্তু জীবনে ছন্দ খুজে পাচ্ছিলাম না। মায়ের কথা খুব মনে পরত। আর সারক্ষন কান্না পেত। আমার এক একটা দিন মনে হতে লাগল এক একটা বছরের মত। ক্লাসে যেয়ে পিছনে বসে থাকতাম। মন বসত না। মনে হত ক্লাস আর শেষ হয় না। বিকালে স্কুল থেকে এসে কোন কাজ পেতাম না। বারান্দায় যেয়ে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, রাস্তার মানুষ দেখতাম। বিকেলগুলো যে এতটা বিষন্ন হতে পারে আমার জানা ছিল না। মাকে ভুলতে পারছিনা এক মুহুর্তের জন্য। সব সময় গলার কাছটাতে কান্না উঠে এসে দলা পাকিয়ে থাকত। সন্ধ্যা ফুরায়; রাত আসে। রাতের খাবারের পরে ঘুমাতে যায় সবাই, আমিও যাই। সবাই ঘুমিয়ে পরে। আর আমার কান্না শুরু হয়। আমার মনে হয় এই পৃথিবীতে আমার আপন কেউ নাই। আমি বড় একা। আমি কেমন ঘোরের মধ্যে চলে যাই। সিলিং এর সাথে ফ্যান ঘুরছে। বারান্দা থেকে দরজা হয়ে ল্যাম্পপোস্ট এর আলো পরত অর্ধেকটা ফ্যান এ। অশরিরী লাগত ব্যাপারটা আমার কাছে। মনে হত আমার এই কষ্টের জীবনটা ওই চলমান ফ্যানের মতই চলতে থাকবে। কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে পরতাম। সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে পড়ে যেত আমার মা আমার কাছে নাই। এখন কেউ বলেনা ‘আব্বু উঠো, সকাল হয়ে গেছে’। বুকটা ভেঙে কান্না আসত । কান্না চেপে রাখতে পারতাম না। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতাম পেটে ব্যাথা করতেছে। আজ ও অনেকেই জানেনা আমার সেই কান্নার কারন। প্রত্যেকটা দিন আমার একইভাবে কাটতে লাগলো।

মায়ের কাছে চিঠি লিখতাম, মাসে তিন চারটা। কি লিখব বুজতে পারতাম না। কষ্টের কথাগুলো লিখতে পারতাম না চিঠিতে। ভাবতাম আমার কষ্টের কথা শুনে মা যদি আমার জন্য কান্না করে। মায়ের কান্না ভেজা চোখ আমি কল্পনা করতে পারতাম না। মা যখন আমাকে চিঠি লিখত আমি তার মধ্যে মায়ের স্নেহের গন্ধ খুজে বেড়াতাম।

একবার টাইফয়েড হল। গায়ে প্রচন্ড জ্বর। একশ পাঁচ একশ ছয় পর্যন্ত উঠে যায় জ্বর। সারাক্ষন পাশে মাকে খুজে বেড়াই। মায়ের হাতের একটু ছোয়া কপালে পেতে খুব ইচ্ছা করে। মা একটু হাত বুলিয়ে দিলেই আমি ভাল হয়ে যাব। মনে হচ্ছিল আমি আর বাচবো না। আমি মরে গেলে মা অনেক কাদবে ভেবে আমার কান্না পাচ্ছিল। আবার মায়ের উপর অনেক অভিমান হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমার মা নাই। এই পৃথিবীতে যার মা নাই আমি তার কষ্টটা অনুভব করতে পারছিলাম।

এক সময় জ্বর ভাল হল। কিন্তু আমার সময় আগের মতই কাটছে। পড়ালেখায় মন নাই। রেজাল্ট ভাল হচ্ছে না। এভাবে দীর্ঘ এক বছর কাটল যেখানে আমার একটা দিন ছিলনা যেদিন আমি কাদিনাই। একদিন আমার সব কান্না শেষ হল। আমাকে আবার বাড়িতে নিয়া আসা হল। কারন যেই পড়াশোনার উন্নতির জন্য আমাকে ঢাকা পাঠান হয়েছিল আমি তা করতে ব্যার্থ হয়েছি।

এর পড়ে দশটি বছর কেটে গেছে। আমি ইন্টার এ পড়ছি। কোন একদিন কি যেন একটা কাজে মায়ের আলমিরা খুলে খোজাখুজি করছিলাম। হঠাৎ কিছু চিঠি পেলাম। পড়ে দেখি এগুলো মায়ের কাছে আমার লেখা সেই চিঠি গুলো। মা আজও যা স্বযত্নে রেখে দিয়েছেন। মা আমি চাইনা আমার কারনে তোমার চোখে জ্বল আসুক। তোমায় অনেক ভালবাসি মা।

... ... ... ... ... ... ... ... ... ...

লেখাটা 'মমতাময়ী'তে প্রকাশিত।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০১০ রাত ১২:২৪
১৮টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রফিকুল ইসলামের ২য় বিয়ে করার যুক্তি প্রসঙ্গে chatgpt-কে জিজ্ঞেস করে যা পেলাম...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৭ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



ইসলামে একাধিক বিয়ে বৈধ, তবে সেটা বড় দায়িত্বের বিষয়। শুধু “বৈধ” হলেই কোনো সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তম বা সবার জন্য উপযুক্ত হয়ে যায় না। Qur'an-এ বহু বিবাহের অনুমতির সাথে ন্যায়বিচারের শর্তও... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এখনই কওমী মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে দিন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৭ ই মে, ২০২৬ রাত ৮:৪৮


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এখনই কওমী মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে দিন। এর জন্য যদি আকাশ ভেঙে পড়ে, তাহলে ভেঙে পড়ুক। এর কারণে যদি দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা-ই হোক। এখনই উপযুক্ত সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমজনতা আর রাজনীতি

লিখেছেন কিরকুট, ০৭ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:১৮

দেশটা এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে চায়ের দোকানের বেঞ্চি থেকে শুরু করে ফেসবুকের কমেন্টবক্স পর্যন্ত সবাই ভূরাজনীতির গোপন উপদেষ্টা। কেউ ন্যাটো বুঝে, কেউ "র" এর ফাইল পড়ে ফেলেছে বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজনৈতিক দল গঠনের মতো জনপ্রিয়তা ইউনুস সাহেবের ছিলো না ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই মে, ২০২৬ রাত ২:২৬


মাঝে মাঝে আমি ইউটিউবে বা মাহফিলে গিয়ে হুজুরদের ওয়াজ শুনি। শোনার কারণটা ধর্মীয় যতটা না, তার চেয়ে বেশি হলো আমাদের সমাজের হুজুররা দেশীয় অর্থনীতি বা সামাজিক ইস্যুগুলো নিয়ে সাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সীমিত মগজ, লিলিপুটিয়ান, ডোডো পাখি (সৌজন্যে - চাঁদগাজী)...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ১১:২৯



১. যেনা করব আমরা, ৫০১-এ যাব আমরা, পার্কে যাব আমরা। তুমি তো আলেম। তুমি কেন যাবে? তুমি তো ইসলামের সবক দাও সবাইকে। তুমি মাহফিলে কোরআন, হাদীস বয়ান কর। তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×