
আজ নিশির সাথে আমার দেখা হবে বলতে গেলে প্রায় তিন বছর পর দেখা হতে যাচ্ছে, আজকেও দেখা করার ইচ্ছা ছিলনা তারপরও দেখা করতে হচ্ছে।
আজ নিশির জন্মদিন.......
নিশির জন্মদিনে একটু সামনে দাড়ানোর খুব ইচ্ছা করছিল তাই দুপুরে বিমানে উঠে বসলাম প্রথম প্রহরে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে ভোরের ফ্লাইটে ফিরে আসলে ঠিকঠাক মতই অফিস করা যাবে তাই।
নিশির সাথে পরিচয় হয়েছিল অনেকটা গল্পের মতই, আমি কোনদিনও প্রেমে পরবনা চিন্তা করে হিমু হতে চাইলাম। হলুদ পান্জাবিতে সিঙ্গাপুরে রাস্তায় হেটে চলি, দুইদিন পুলিশের হাতেও আটকা পরলাম। সব মিলিয়ে নিজের মাঝে যখন হিমুকে প্রায় মিলিয়ে নিয়ে ছিলাম ঠিক তখনি গালে টোল আর ঠোটের উপরে তিল ওয়ালা নিশি নামের মেয়েটার সাথে পরিচয়। আমাদের পরিচয়টাও ঠিক ফেইবুকেই হয়েছিল, বলতে গেলে নিশিকে না দেখেই আমি আমার হিমু থিউরি থেকে ফিরে আসলাম।
গত কয়েকটা দিন নিশির জন্য খুব মায়া লাগছিল তাই হঠাৎ করেই চিন্তা করলাম এবার নিশির জন্মদিনে আবার ওর সামনে দাড়াব, এক ফ্রেন্ডের মাধ্যমে এলইডি লাইটের ১ হাজার বেলুন কালেক্ট করলাম, একজনের সাথে কথা বল্লাম বেলুনে হেলিয়াম গ্যাসে পূর্ন করার জন্য। সময় যেহেতু ১৫ মিনিটের মত পাবে তাই উনার সাথে ২/৪ জন লোক নিতে বল্লাম সিলিন্ডার ৪টা নিবে সাথে। ফায়ার ওয়ার্কের ১৭৫ টা শুট নিলাম, যেহেতু এই বিষয়টা একটু রিক্স থাকে তাই দোকানের একজন কর্মচারী সাথে নিলাম।
১৭৩৫ টা গোলাপ হাতে আমার সব পরিকল্পনা সাজিয়ে নিশিদের বাসায় আসলাম ততক্ষনে ঘড়িতে রাত্র ১১টা বেজে গেছে, নিশিদের বাসা থেকে ছাদের চাবি নিয়ে সবাইকে ছাদে নিয়ে গেলাম। বেলুনে গ্যাস দেয়ার কাজ শুরু করল ৪জন, ফায়ার ওয়ার্ক ঠিক কর্নারে সিড়ির রুমের পিছনে রেখে একজন বসে আছে। অবশ্যক নিশিদের বাসার সবাইকে বলেছিলাম আমি ফোন করার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত যেন আমার আসার কথাটা নিশিকে না জানানো হয়, এমনকি কোন কারনে যাতে ছাদে আসতে না পারে এই বিষয়টাও দেখতে বল্লাম। ১০০০ বেলুনে গ্যাস পূর্ন করে এলইডি লাইড জ্বালিয়ে ছাদের রেলিং এর সাথে বেধে রাখা হয়েছে, মনে হচ্ছে এই ছাদটা এক টুকরো আকাশ যার মাঝে হাজারো তারকা ভিড় করে আলো ছড়াচ্ছে। নিশির সাথে পরিচয়ের প্রথম জন্মদিনে বলেছিলাম আমার ইচ্ছা আছে আকাশটাকে ৭টা খন্ডে বিভক্ত করে প্রিয় সাতজন মানুষকে উপহার দেব, তুমিও পাবে এক খন্ড আকাশ। আজ মনে হয় নিশিকে তার আকাশের অংশটা বুঝিয়ে দিতে এসেছি।
ঘড়িতে যখন ১১টা ৫৫ মিনিট তখনি নিশিকে ফোন করলাম, এত দিন পর আমার ফোন পেয়ে মনে হয় অনেকটা বড় রকমের ধাক্কা খেল। প্রায় ৬০ সেকেন্ড কোন কথায় বলেনি, ধাক্কাতো খাওয়ারই কথা। যে মানুষটা দিনে কম করে হলেও ২০ বার কল করে জ্বালাতো সেই মানুষটা হঠাৎ করেই হারিয়ে গেল কোথাও কোন সন্ধান পাওয়া গেলনা, একেবারেই পাওয়া গেলনা। অনেক দিন পর এই যন্ত্রনার মানুষটাই হঠাৎ করে ফোন করলে যে কারোই শক খাওয়ার কথা।
ছোট্ট করে বল্লাম একটু ছাদে আসবেন?
- কার ছাদে?
- আপনার বাসার ছাদে।
- আপনি আমার বাসার ছাদে কখন আসলেন?????? এমন হাজারো প্রশ্নের পর নিশি ছাদে আসতে রাজি হল।
নিশি ছাদের গেইটে দাড়িয়ে গেল, যেন সে আর হাটতে পারছেনা। পিছনে ওর পরিবারের সবাই দাড়িয়ে আছে, আসলে নিশির সাথে পরিচয়ের পর ওর পরিবারের সাথেও খুব ভাল একটা সম্পর্ক তৈরী হয়ে গিয়েছে। প্রতিটা মানুষ আমাকে খুব আপন করেই নিয়েছিল।
নিশির দাড়িয়ে থাকতে দেখে আমি নিজেই এগিয়ে এসে নিশির সামনে দাড়ালাম ফুলগুলি নিশির হাতে দিলাম, আজকে নিশির সাথে আমার পরিচয়ের ১৭৩৫ দিন পূর্ন হল তাই ততটা ফুল নিয়ে এসেছিলাম। খুবই সাধারন ভাবে জন্মদিনের উইশ করে নিশির সামনে একটা কেক রাখলাম, মেয়েটা মোমবাতি গুলি নিবিয়ে কাপা হাতে কেকটা কাটছে। এমন সময় সিড়ি ঘরের পিছন থেকে আকাশের দিকে আতশ বাজি গুলি উড়ে উড়ে যাচ্ছে, বিকট শব্দে ভিন্ন ভিন্ন কালারে আকাশটাকে সাজাচ্ছে। নিশি ছুরি হাতে নিয়ে কেকের পাশেই হাটু গেড়ে বসে পরল, ছাদের রেলিং থেকে বেলুন গুলির সুতা কেটে দেয়া হচ্ছে একটা একটা বেলুন নিশির আকাশে একটা তারা হয়ে উজ্জল আলো ছাড়াচ্ছে। কি চমতকার লাগছে আকাশটা, মনে হচ্ছে পৃথিবী নামক গ্রহে অন্য একটা পৃথিবী।
সবার দৃষ্টি যখন আকাশের দিকে আমি তখন পাশে থাকা ব্যাগটা কাধে নিয়ে সিড়ি পর্যন্ত হেটে গেলাম, পিছনে না তাকিয়েও বুঝতে পারছি নিশি আমার চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে। শরীরের সবটুকু শক্তিদিয়ে চেষ্টা করছে আমাকে ডাকতে কিন্তু আজকে মনে হয় নিশিটা বোবা হয়ে আছে, কিছুতেই মুখ থেকে একটু শব্দও বাহির হচ্ছেনা। আমি থামলাম কাধ থেকে ব্যাগটা রেখে একটা বক্স বাহির করে নিশির হাতে দিলাম, বক্সের কাভার খুলতেই যাকেযাকে জোনাকি গুলি উড়তে শুরু করল, নিশি নিঃশব্দে বসে আছে। হঠাৎ নজরে আসল নিশির চোখের নিচে চকচক করছে, তারমানে নিশি কাঁদছে?
নাহ! আর অপেক্ষা করা যাবেনা। গুরু বলেছে, চোখের পানির সামনে দাড়াতে নেই, এই একটা ক্ষুদ্র বিষয় অনেক কিছু বদলে দেয়ার ক্ষমতা রাখে......
আমি ব্যাগ কাধে নিয়ে সিড়ি দিয়ে নেমে আসছি, আর দূরে কোথাও সাউন্ড সিস্টেমে বাজছে -
সোনার মেয়ে, তোমায় দিলাম ভুবন ডাঙ্গার হাসি,
তোমায় দিলেম মধ্যদিনের, টিনের চালের বৃষ্টি রাশি,
আর দিলেম রৌদ্রধোয়া, সবুজ ছোঁওয়া পাতার বাঁশি,
মুখে বললাম না, বললাম না ভালবাসি।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ দুপুর ২:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



