নীলার সংগে শেষ কথা হয় ৬ মাস আগে। বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে হন্যে হয়ে চাকরি খুজছিলাম ১ বছর ধরে। কিন্তু এই করোনার মাঝে বিশ্ব যেখানে থমকে গেছে, চাকরি তো কোন ছাড়। আমার নীলা অনেক ধৈর্য্য ধরেছে। ধনী ব্যবসায়ীর একমাত্র মেয়ে, গুণধর পাত্রের অভাব তার হবে না আমিও জানতাম। সেখানে সে শুধুমাত্র আমার জন্যে বসে থেকেছে এতটা দিন। ওকে গর্ব করে বলতাম, পাসটা শুধু একবার করে নেই, এরপর দেখো, চাকরি একটা জুটে যাবেই। আমার কথায় কোনদিন আপত্তি করে নি। ওর মনে আমিই ছিলাম সব, আমার কথাই শিরোধার্য। কি অসুখে, কি বিপদে, কি প্রয়োজনে- সব কিছুতেই আমিই ছিলাম তার একমাত্র ভরসার স্থল। রমনা পার্কে তার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে দুজনে মিলে দেখতাম এক সুখের স্বপ্ন, লাল-নীল সংসার। যেই সংসারে বিপদ আসলে হাল ধরবো দুজনে, যত ঝাপ্টাই আসুক কোনদিন হাতটা ছাড়বো না। কি ছেলেমানুষই না ছিলাম। কোন শালা বলে জীবনটা প্রেমময়? জীবন হচ্ছে একটা মরুভূমি, প্রেমের কোন অস্তিত্ব এখানে পাওয়া যাবে না, সব মরীচিকা। সব শুধুই মোহ। চোখের কোণা দিয়ে যে জল গড়িয়ে পড়ছে, সেটাও এই মোহভঙ্গের ফসল।
এই যাহ। নীলার কথা বলছিলাম, কখন যে ফিলোসফিতে মোড় নিলাম খেয়ালই নেই। ১ বছরের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর যখন কোন চাকরি জুটলো না, তখন হঠাত করে নীলার বাবা আমাকে ফোন দেয়। তার একটাই অনুরোধ, আমি যেনো তার একমাত্র মেয়েকে মুক্তি দেই, তার জীবনটা নিয়ে যেনো আর না খেলি। মেয়ের জীবনটা অনেক রঙ্গিন। তার এক বন্ধুর ছেলে প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, বিয়ের পর মেয়ে সিঙ্গাপুরে থাকবে। ওখানে তাদের নিজস্ব বাড়ি। মেয়ের আর কোনদিন দেশেই ফিরতে হবে না। আরো কত কি। সোজা কথায়, অনেক তো হলো বাবা, এবার বিদেয় হও। অতি দুঃখে নাকি মানুষের হাসি আসে, কথাটার প্রমাণ ওইদিন পেলাম। মলিন একটা হাসি ঠোঁটের কোনায় ঝুলে থাকলো। সারাটা জীবন পড়াশোনা করে আসলাম শিক্ষা আর সম্মানের আশায়, সারাটা জীবন বিশ্বাস করে এসেছি টাকাই সব কিছু নয়, শিক্ষাই মুক্তির পথ। আর আজ শিক্ষা মাথা কুটে মরছে, জিতে যাচ্ছে অর্থ-সহায়-সম্পত্তি।
ও হ্যাঁ। তিনি অবশ্য আমাকে বলেছিলেন নীলা এই বিয়েতে রাজি না। সে সারা জীবন আমার জন্যেই বসে থাকতে চায়। আমার যেদিন চাকরি হবে সেদিন আমার ঘরে এসে উঠবে। তার এই রঙ্গিন চশমার রঙ্গিন স্বপ্ন আমাকেই ভাঙ্গতে হবে। উনি ভাঙ্গলে নাকি নীলা কোনদিন তার দিকে আর মুখ তুলে তাকাবে না। আমি হয়তো পারতাম তার এই আদেশ না মেনে আমার মতো করে দিন কাটাতে। কিন্তু নীলাকে যে একটু বেশিই ভালোবাসি। আমার জীবনটা যাহয় হোক, সে যেনো জীবনে সুখী হয়।
২০২১ এর জানুয়ারী মাসে আমাদের ৫ বছরের সম্পর্কের ইতি টানলাম আমি। নীলার চোখ দিয়ে অঝড় ধারায় পানি পড়ছিলো। আমি ছিলাম একেবারে পাথর। শেষবারের মতো তার হাতটা ধরে তাকে রিকশায় তুলে দেই। রিকশা ছুটে যায় তার গন্তব্যের দিকে। সাথে নিয়ে যায় আমার ভালোবাসার একমাত্র মানুষটাকে।
অনেকেই বলেছে, সামনে আরো প্রেম আসবে, এসব যেনো ভুলে যাই, যেনো সামনে পা বাড়াই। আমি শুধুই হাসি। প্রেম যতই আসুক, সত্যিকার প্রেম একটাই। আজ আমার প্রেম আমার সঙ্গে নেই। সুখেই আছে সে আশা করি। ভালো থাকুক আমার ভালোবাসা। সুখে থাকুক আমার নীলা।

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০২১ রাত ১২:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




