বাংলাদেশ সীমান্তে মায়ানমারও আগ্রাসন চালানোর সাহস দেখাচ্ছে। গত শুক্রবার বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে দুদফায় গোলাগুলি চলে প্রায় দেড় ঘণ্টা। বিজিবির এক সদস্য নিখোঁজ হওয়ার পর তিন দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড-বিজিবি সদস্যদের ওপর বিনা উস্কানিতে অতর্কিত মর্টার হামলা চালায় মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ-বিজিপি। দুপক্ষে শত শত রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়। বিজিবি-বিজিপি সদস্যদের গোলাগুলির পর আতঙ্কে এলাকার বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। এর আগে বুধবার বিজিপির হাতে নিহত হয়েছে বিজিবির এক সদস্য। নিহতের লাশও তারা ফেরত দিতে চায়নি। এ টানাপড়েনের মধ্যে ওই বিজিবি সদস্যের লাশ ফেরত চাইতে গেলে তারা আবার গুলি করে। মায়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এ অপকর্মের ঘটনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মুখস্থ রুটিন কাজটি করেছে। সেটি হলো প্রতিবাদ জানানো।
এর আগেও বিভিন্ন সময় মায়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ওপর বিনা কারণে হামলা চালানোর ঘটনা রয়েছে। এবারের ঘটনা মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা ইয়াবাসহ অবৈধ মালামালের চালান বন্ধ নিয়ে। এ ব্যাপারে বিজিপির সঙ্গে যোগাযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া মিলছিল না। সর্বশেষ বুধবার ৫২ নম্বর বর্ডার পিলার পরিদর্শনের সময় বিজিবি সদস্যদের ওপর বিনা কারণে হামলা চালায় বিজিপি সদস্যরা। এ সময় বিজিবির নায়েক মিজানুর রহমানকে ধরে নিয়ে যায় বিজিপি। সেখানে নিয়ে হত্যা করা হয় তাকে।
মায়ানমারে এখনও কার্যত চলছে সামরিক জান্তার শাসন। এ কারণে সভ্য দুনিয়ার সঙ্গে দেশটির কূটনৈতিক বা সম্মানজনক সম্পর্ক নেই। এমন নাজুকতর একটি দেশও স্বাধীন-সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে হুমকি দেয়ার সাহস দেখাল। এটাই বাস্তবতা।
মায়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত ১৫২ কিলোমিটার। প্রায় পুরো সীমান্তই দুর্গম পার্বত্যাঞ্চল। অভিযোগ রয়েছে, এই সীমান্তপথে মাদক চোরাচালানের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রও বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সম্প্রতি সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি। সেই সঙ্গে নতুন করে বেশ কিছু সীমান্ত চৌকি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ রকম একটি সময়ে বিনা উসকানিতে এ ধরনের হামলা নানা প্রশ্নেরই জন্ম দেয়। এর আগে ২০১২ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক আদালতের রায় অনুযায়ী বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত অঞ্চলে বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত হওয়ার পরও মায়ানমার সীমান্তে অনুরূপভাবে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে দুই দেশের আলাপ-আলোচনায় সেই উত্তেজনার সাময়িক প্রশমন হয়। এবারের ঘটনার পর বাংলাদেশের পতাকা বৈঠকের আহ্বানে এখনও মায়ানমারের পক্ষ থেকে সায় মেলেনি। কিন্তু এটি মোটেই কোনো যৌক্তিক পদক্ষেপ নয়। যে কোনো সীমান্তবর্তী দুটি দেশের মধ্যে নানা কারণে মতভেদ দেখা দেয়া অস্বাভাবিক নয়। সেই বিরোধ বা মতভেদ কাটানোর সর্বোত্তম পথ হচ্ছে আলাপ-আলোচনা। শক্তি প্রদর্শন উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতিই নিশ্চিত করবে। তাই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা দরকার। এছাড়া সীমান্তে কি ঘটেছে জনগণের সরকারের বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তা আজও জানানো হয়নি। উদ্বেগ নিরসনের জন্য পুরো বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে।
কে না জানে রোহিঙ্গা জঙ্গিরা অতীতে এক সময় যেভাবে বাংলাদেশ ভূখণ্ড ব্যবহার করে মায়ানমারের সরকারি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাত তা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ এদের অর্থ প্রবাহের উত্সগুলোও অনেকটা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এ বিবেচনায় বাংলাদেশ এখন মায়ানমারের কাছ থেকে বাড়তি ও আন্তরিক সহযোগিতা আশা করতেই পারে। সীমান্তে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির এ দায় সম্পূর্ণভাবে মায়ানমারের। সীমান্তে উত্তেজনার লাগাম টেনে ধরা দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের স্বার্থেই প্রয়োজন। দুই দেশের সীমান্তে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তা নিরসন করতে হবে কূটনৈতিকভাবেই। সেই সঙ্গে বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থেই এও বিবেচনায় নিতে হবে কেন আমরা এত দুর্বল, কোথায় আমাদের গলদ।
সুটর

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



