somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

তালপট্টি ভূখণ্ড থাকলে সাগর কমত এ দেশের

১০ ই জুলাই, ২০১৪ সকাল ৯:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ডুবে যাওয়া দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের অস্তিত্ব থাকলে বাংলাদেশের সাগর এলাকা এখনকার চেয়ে আরো কমে যাওয়ার জোর আশঙ্কা ছিল। কারণ ১৯৪৭ সালের রেডক্লিফের সীমানা রেখা অনুযায়ী দক্ষিণ তালপট্টি এলাকা ভারতের মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণী মামলায় ভারত দক্ষিণ তালপট্টিকে ‘দ্বীপ’ বা ভূখণ্ড দাবি করে সীমারেখা টানার ‘বেস পয়েন্ট’ হিসেবে ধরার যুক্তি তুলে ধরে। আদালতের কাছে ওই দাবি গৃহীত হলে বেস পয়েন্টের যুক্তিও গুরুত্ব পেত। ফলে বর্তমান সমুদ্রসীমা রেখা (১৭৭ ডিগ্রি ৩০ মিনিট) বাংলাদেশের আরো ভেতরের দিকে আসত। অর্থাৎ বর্তমানের চেয়ে কম সাগর অঞ্চল পেত বাংলাদেশ। গত সোমবার নেদারল্যান্ডসের স্থায়ী সালিসি আদালতের রায়ে বাংলাদেশ বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার পেয়েছে। অথচ দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের অর্ধেকও দিতে রাজি ছিল না ভারত। সার্বিক বিচারে আদালতের রায়ে বাংলাদেশ বিশাল জয় পেয়েছে।
আদালতের রায়ের ফলে রায়মঙ্গল নদীর পুরোটাই বাংলাদেশ পেয়েছে। অন্যদিকে হাড়িয়াভাঙ্গা নদী পড়েছে ভারতে। আদালতের রায়ের আগে ভারত পুরো রায়মঙ্গল নদীটিই নিজের দাবি করে আসছিল। তবে সমুদ্র বিশেষজ্ঞ নূর মোহাম্মদ বলেছেন, বাংলাদেশ সাগর এলাকার বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আদালতে গেছে। তালপট্টি দ্বীপের মালিকানার বিরোধ নিয়ে যায়নি। তা ছাড়া সমুদ্র আইনের (ল অব দ্য সি) অধীন এই আদালত নদী বা দ্বীপ ভাগাভাগির কাজ করেন না। আদালত রেডক্লিফের সীমান্ত রেখা বরাবর সাগরের সীমানা টানায় ওই নদীগুলো দুই দেশের ভাগে পড়েছে।
এদিকে ডুবে যাওয়া দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ প্রসঙ্গে মামলার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ওই দ্বীপটি ডুবন্ত অবস্থায় ভাঙনের শিকার হয়ে নিচে ঘোরাঘুরি করছে বা মিশে গেছে। এমন হতে পারে যে দ্বীপটি আবার কোনো এক সময় জেগে উঠবে। তবে সেটি আগের স্থানে নাও হতে পারে।
জানা গেছে, তালপট্টি দ্বীপ যেখানে ছিল, এর ঠিক পাশ দিয়ে সীমানা রেখা টানা হয়েছে। ওখানে দুটি চ্যানেল আছে। একটি অগভীর, অন্যটি গভীর। ভারতের দাবি ছিল, গভীর চ্যানেলটিকে আধাআধি ভাগ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ীও এর যৌক্তিকতা ছিল। তবে আদালত গভীর চ্যানেলটির পুরোটিই বাংলাদেশকে দিয়েছেন, আর অগভীর চ্যানেলটি দিয়েছেন ভারতকে। ওই ভাগাভাগির সময় তালপট্টি ভারতের দিকে গেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, নৌ চলাচলের অধিকার বিবেচনায় গভীর চ্যানেল থেকেও ভারতের কিছু পাওয়ার কথা ছিল। নৌ চলাচলের অধিকার এখন বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমন ধারণার পরও গভীর চ্যানেলের পুরোটাই বাংলাদেশের ভাগে পড়েছে। বাংলাদেশ ১৮০ ডিগ্রি বরাবর সীমানা রেখা চেয়ে ১৭৭ ডিগ্রি ৩০ মিনিট বরাবর পেয়েছে। অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ও আলোচনায় এতটা পাওয়ার বিষয়েও সন্দেহ ছিল।
সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা ভাগ হয়েছে ১৯৪৭ সালের রেখা অনুযায়ী। এখানে কারো কিছু করার নেই।
এখানে ভারতও কিছু করতে পারেনি, বাংলাদেশও পারেনি। আদালত ১৯৪৭ সালের ভাগটি নতুন করে বলে দিয়েছেন। ভারতের বিচারক শ্রিনিবাসা রাও অন্য চার বিচারকের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে বলেছেন, এত এলাকা বাংলাদেশের পাওয়ার কথা নয়।
জানা গেছে, গত মাসের শেষ সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরে আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও সমুদ্রসীমার সম্ভাব্য রায়-পরবর্তী বিষয় উঠেছিল। ভারতের দিক থেকে প্রত্যাশা ছিল রায় নিয়ে খুব উচ্ছ্বাস না দেখানোর। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতকে বলা হয়েছিল, দীর্ঘদিনের এ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান দুই দেশের জনগণেরই বিজয়।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ২০০৮ সালের পর ভারত-বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা নিয়ে চারটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছে। ভারতের দিক থেকে বরাবর বলা হয়েছে, তারা পাঁচটি সীমানা এরই মধ্যে সমাধান করেছে সমদূরত্ব (ইকুয়িডিস্ট্যান্স) পদ্ধতিতে। ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে ‘প্রভিশনাল ইকুয়িডিস্ট্যান্স’ করে সীমারেখা নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তারা সমদূরত্ব পদ্ধতির বাইরে যেতে পারবে না। বাংলাদেশের ন্যায্যতার দাবি ভারত বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০১০ সালে বাংলাদেশ মানচিত্র সংশোধন করে ডুবে যাওয়া দক্ষিণ তালপট্টি নিজের বলে দেখালেও আদালত তা গ্রহণ করেননি। অতীতের নথিপত্রগুলোতেও দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ এলাকা ভারতের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত এমন প্রমাণ মিলেছে। ১৯৭৬ সালের দিকে ভারত প্রথম দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপকে নিজেদের বলে ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটিতে নোটিশ পাঠিয়েছিল।
ভারতের সঙ্গে মামলায় বাংলাদেশের পক্ষের ডেপুটি এজেন্ট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (সমুদ্রবিষয়ক ইউনিট) রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম বলেন, ‘১৯৪৭ সালের রেডক্লিফের রেখা যেখানে এসে শেষ হয়েছে সেখান থেকেই সমুদ্রসীমা শুরু হয়েছে। আর তা সোজা শুরু হয়েছে। সোজা শুরু হওয়ার কারণে ওই জায়গাটুকু, যার পরিমাণ ১ দশমিক ১৩ বর্গকিলোমিটার, সেটি ভারতের দিকে পড়েছে। সেখানে পানির ওপর কিছুই নেই। মূলত আমাদের দেখতে হবে, আদালত কী দেখেছে। আদালত সেখানে পানি দেখেছে। তারা পানি ভাগ করেছে। দ্বীপ বলে সেখানে কিছু নেই।’ তিনি বলেন, ‘এমনকি আদালত যখন সরেজমিন এখানে এসেছিল তখনো আমরা এই তালপট্টিকে দ্বীপ হিসেবে দেখাতে পারিনি। ভারত প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তারা ইনফ্রারেড ক্যামেরা দিয়ে চেষ্টা করেছিল ওই স্থানটিকে দ্বীপ হিসেবে দেখাতে। কিন্তু তারাও ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, “ভারত তালপট্টি এলাকাকে দ্বীপ প্রমাণ করে ‘বেস পয়েন্ট’ হিসেবে দেখাতে চেয়েছিল। দ্বীপটি যদি বেস পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা যেত, তাহলে সীমানা রেখা আমাদের বর্তমান সীমানার আরো ভেতরে চলে আসত। এর ফলে সীমানা রেখা সোজা যেত না। তাদের দাবিও সে রকম ছিল। আদালত যেহেতু তাদের দাবি মানেনি, সেহেতু তালপট্টি দ্বীপ বলে সেখানে কিছু নেই। থাকলে তো ভারতের দাবি অনুযায়ী সমদূরত্ব পদ্ধতিতে রেখা হতো। সে ক্ষেত্রে আমরা সাগর আরো বেশি হারাতাম।”
মো. খুরশেদ আলম বলেন, ‘প্রথমত, ১৯৪৭ সালের রেডক্লিফের সীমানা সবার জন্য মানার বাধ্যবাধকতা আছে। এখানে আমাদের তেমন কিছুই করার নেই। দ্বিতীয়ত, যেহেতু তালপট্টি দ্বীপটি এখন নেই সেখানে পানি ভাগ হয়েছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে, ৫০ বছর পর দ্বীপটি আবার জেগে উঠবে কি না? জেগে উঠলেও আমাদের তেমন কিছু করার থাকবে না। একইভাবে সীমারেখার পূর্ব পাশে যদি কোনো দ্বীপ জেগে ওঠে, যে জায়গা ভারতের দাবির মধ্যে ছিল ও রায়ে বাংলাদেশের মধ্যে পড়েছে, সেখানেও তারা কিছু করতে পারবে না।’
মো. খুরশেদ আলম বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যখন দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হয় তখনো ভারতকে বলেছিলাম, আপনারা সাড়ে ১২ হাজার বর্গকিলোমিটার নেন, আমাদের সাড়ে ১২ হাজার বর্গকিলোমিটার দেন। ভারত বলেছে, না, পুরোটাই ছেড়ে দিতে হবে। সেখানে মামলার রায়ে ৭৫ শতাংশ আমাদের দখলে আসাকে আমি মনে করি বাংলাদেশের জন্য বিরাট অর্জন।’
না জেনেই তালপট্টি নিয়ে এত আলোচনা : সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞ এবং সমুদ্র অঞ্চল ও সীমানা রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদ গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ যা রায় পেয়েছে তা সন্তোষজনক। তিনি বলেন, ‘তালপট্টি নিয়ে যাঁরা কথা বলেন, তাঁদের কাছে আমি জানতে চাই এর ভৌগোলিক অবস্থান তাঁরা জানেন কি না। তাঁরা এর উত্তর দিতে পারেন না। তালপট্টি আদৌ দ্বীপ ছিল কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ দ্বীপ হতে হলে জোয়ার ও ভাটা উভয় সময়েই সেটিকে ভেসে থাকতে হয়। শুকনো ভূখণ্ড ও ব্যবহার উপযোগী থাকতে হয়।’ তিনি বলেন, ‘তালপট্টির যৌথ (বাংলাদেশ ও ভারত মিলে) জরিপ হয়নি। গোপনে জরিপ হয়েছে বলে শুনেছি। তবে ৩০ বছর ধরে তালপট্টির কথা বলা হলেও এ দেশের কোনো মানচিত্রে এটি ছিল না। ১৯৭০ সালের আগেও তালপট্টি দ্বীপ ছিল না। এখনো বাস্তবে এর অস্তিত্ব নেই। এটি এখন কেবলই স্মৃতি।’
৮টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×