somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রামু ট্রাজেডি মানবতার এক বড় বিপর্যয়

২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সকাল ৯:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আজ ২৯ সেপ্টেম্বর, রামু ট্রাজেডি দিবস। ২০১২ সালে বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব শুভ মধুপূর্ণিমার আগের রাতে এদেশের নিরীহ এবং শান্তিপ্রিয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্ম, পরিবার ও প্যাগোডা-উপাসনালয়ের ওপর যে আঘাত হানা হয়েছিল, তা ছিল অতি করুণ ও হৃদয়বিদারক। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলংকিত অধ্যায়। আজ এ দিনে আমি সেসব বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী ও বৌদ্ধভিক্ষুদের স্মরণ করি, যারা সে রাতে আহত হয়েছিল এবং যাদের প্যাগোডা ও ধর্মীয় স্থাপনা ভস্মীভূত হয়েছিল।
সেদিন বাংলাদেশসহ বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষ এবং জাতিসংঘসহ দেশ-বিদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সংস্থা ও সংগঠন এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছিল। দল, মত ও নানা ধর্ম-বর্ণের সবাই সমবেদনা জানিয়েছিল এবং সবাই বলেছিল, এ ঘটনা মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও নাশকতাকেও হার মানিয়েছে। সে ভয়ংকর রাতের কথা শুনলে এখনও রামু, উখিয়া ও পটিয়ার বৌদ্ধ জনসাধারণ, শিশু-কিশোর, আবালবৃদ্ধবনিতা শুধু কাঁদে আর অঝোরে চোখের জল ফেলে।
রাতটি ছিল বৌদ্ধদের অনেক প্রত্যাশিত বুদ্ধকে মধুদান করার আগের রাত। জ্যোৎস্নার আলোও ছিল এলাকাময়। আর নিমিষেই সেটি হয়ে গেল বাংলাদেশের ইতিহাসে জঘন্যতম এক কালরাত।
একজন বৌদ্ধযুবক উত্তম বড়ুয়ার ফেসবুকে মিথ্যা-বানোয়াট একটি ধর্মীয় অনুভূতির গুজব ছড়িয়ে এ রকম একটি নারকীয় ঘটনা ঘটবে, সেটি আমরা কখনও ভাবতে পারিনি। পূর্বাপর ঘটনার দৃশ্য এবং পরবর্তীকালে সরেজমিন অনুসন্ধান করে জানা গেছে, এটি ছিল সম্পূর্ণ একটি সাজানো ঘটনা।
না হলে এত অল্প সময়ের মধ্যে কিভাবে শত শত মানুষ জড়ো হয়। হাতে এত লাঠি, দাসহ নানা ধরনের দুষ্প্রাপ্য বিস্ফোরকদ্রব্য কীভাবে আনা হয়? উন্মুত্ত জনতার মিছিল, মিটিং এবং দ্রোহ যেন ছড়িয়ে পড়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। সন্ধ্যা আসতে না আসতেই শুরু হয়েছিল সেদিন এই নৃশংস বর্বরতা। সেদিন শুধু দেখা গেছে চারদিকে আগুনের ধোঁয়া আর লেলিহান শিখা। দাউ দাউ করে একটার পর একটা জ্বলছে বৌদ্ধ বাড়িঘর, আর প্রাচীন প্যাগোডাগুলো। অথচ সেখানকার পুলিশ, র‌্যাব, আর্মি ও বিজিবিসহ জেলার সব প্রশাসন ছিল একেবারেই নীরব ও নিষ্ক্রিয়। অনুরোধ জানিয়েও সাহায্য পাওয়া যায়নি কারও কাছ থেকে। সেদিন প্রশাসন এবং সরকারের এহেন নীরব ভূমিকায় দেশ-বিদেশে প্রশ্ন উঠেছে- কেন এ রকম হল?
সেদিন রাতে সীমা বিহারসহ রামুর চার-পাঁচশ’ বছরের পুরনো ঐতিহ্য বারটি বৌদ্ধ বিহার ও প্যাগোডা পোড়ানো হল। বুদ্ধমূর্তিগুলো পোড়ানো হল, ভস্মীভূত করা হল। হাজার বছরের প্রাচীন পুঁথি-পুস্তক, পাণ্ডুলিপি, নানা বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও নানা ভাষায় লিখিত পবিত্র বৌদ্ধ ত্রিপিটক নিমিষেই পুড়ে ছারখার হয়ে গেল।
শুধু রামু নয়, পরদিন পার্শ্ববর্তী উখিয়ার বৌদ্ধ অধ্যুষিত পল্লীর বাড়িঘর ও নানা স্থানের পাঁচটি বৌদ্ধ বিহার পোড়ানো হল। উগ্রপন্থীদের নগ্নতা এরপরও থেমে থাকেনি। চট্টগ্রামের পার্শ্ববর্তী পটিয়া থানার কয়েকটি বৌদ্ধগ্রাম ও দুটি বৌদ্ধ বিহার এবং নানা ধরনের বৌদ্ধ ঐতিহ্যগুলোকে আগুন দিয়ে জ্বালানো হয়েছিল। সে এক ভয়ংকর দৃশ্য এবং বীভৎস রাত বাংলার মাটিতে বৌদ্ধদের জন্য। যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।
স্বাধীন বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা কারও কাম্য ছিল না। আজ বলতে দ্বিধা নেই, এরকম বাংলাদেশ তো আমরা চাইনি। স্বাধীনতা যুদ্ধ তো এজন্য হয়নি। আমরা চেয়েছিলাম একটি সোনার বাংলাদেশ যেখানে থাকবে আমাদের সহ-অবস্থান, পারস্পরিক মেলবন্ধন। ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, থাকবে না কোনো রকম বৈষম্যও। বাকস্বাধীনতা থাকবে, লেখনীর স্বাধীনতা থাকবে; আরও থাকবে আমাদের মৌলিক অধিকারের স্বাধীনতা। কিন্তু কই? সেদিন তো আমরা সেটা দেখিনি? একই ভূখণ্ডে আমরা বসবাস করি। একই দেশের আমরা নাগরিক এবং একই চেতনাকে আমরা ধারণ করি। তারপরও কেন বৌদ্ধদের ওপর এ আঘাত? আমাদের সংবিধান বলে ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।’
আমরা তো কেউ ধর্মের বাইরে নই। আমরা জানি ধর্মের গৌরব, ধর্মের তাৎপর্য ও ধর্মের অনুশাসন সুমহান। ধর্ম কাউকে আঘাত দেয় না, ধর্ম মানবতাকে খণ্ডিত করে না। ধর্মীয় দৃষ্টিতে সব মানুষ সমান এবং সমভাবে মর্যাদাবান। সূর্যের আলো যেমন সমভাবে পৃথিবীর বুকে পতিত হয়, ধর্মের মানবিক আলোও তেমন। এটাই ধর্মের মহিমা, এটাই ধর্মের শাশ্বত রূপ।
এই তো শারদীয় পূজার পর আসবে আমাদের ঈদুল আজহা। এরপর আসবে বৌদ্ধদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব শুভ প্রবারণা। আমাদের ধর্মের এ সংস্কৃতির মেলবন্ধন আজকের নয়, আবহমানকালের। এজন্যই আমরা গর্ব করি। তাই আমরা আজ সব ভেদাভেদ ভুলে যেতে চাই। আমরা আগের সেই শান্তির বাতায়নে ফিরে যেতে চাই। সব ধরনের ভয়ভীতি কাটিয়ে উঠতে চাই। দুঃখ-বেদনা প্রশমিত করতে চাই। আমরা আবার ফিরে পেতে চাই আমাদের সেই হারানো গৌরব আর হারানো সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে। সদাশয় সরকারের কাছে আমাদের শুধু দাবি ছিল ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও সত্য উদ্ঘাটন করা। নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা। কিন্তু এখনও তা হয়নি। কেন হয়নি তা জানি না। তবে এ দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। আমরা
প্রার্থনা করি, সবার মনে বিবেকবোধ জাগ্রত হোক। রামু, উখিয়া ও পটিয়াবাসীর সব দুঃখ, ব্যথা প্রশমিত হোক। আমাদের দেশসহ সমগ্র বিশ্বে সহিংসতা দূর হোক। বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক।
সুত্র
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জঙ্গল পরিষ্কার করে সাপ তাড়ানাে...

লিখেছেন অপলক , ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪১

নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে: পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে বসবাসকারী স্থায়ী হিন্দু অধিবাসীরা চাইলে খুব সহজে তাদের নাগরিকত্ব দেবে ভারত। যদি এই খবরটা সত্য হয়, তবে বাংলাদেশের জন্য সেটা মারাত্মক ভয়ঙ্কর ঘটনা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি’কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলার কোনো কারণ নাই!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৩



জাতীয় সন্মাননা কি কোনো গোপন বিষয় । একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা’কে গার্ড অফ অনার দিতে এত অনীহা কেনো বর্তমান সরকারের ‼️

আজ বারবার আমার গোআ’র কুপুত্রের একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাড়ে হাজার বিজ্ঞানী এবং একটি স্ক্যামের গল্প

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২৮


জুলাইয়ের কোটা আন্দোলনের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের অংশ হিসেবে পাকিস্তান বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘নলেজ করিডোর’-এর আওতায় আল্লামা ইকবাল বৃত্তি চালু করে। ২০২৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৮


হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

জাপানের এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের একটি পোস্ট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হাসাহাসি চলছে। আমার মনে হয়, হাসির আড়ালে আসল প্রশ্নটা চাপা পড়ে যাচ্ছে।

ঘটনাটা কী
প্রধানমন্ত্রী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:২৯


এখন পর্যন্ত প্রকাশিত এক্সিট পোল অনুযায়ী, কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন ৬১টি নিশ্চিত করতে পারেনি।
নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট, প্রায় ৫১–৫২ আসন।
গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট: প্রায় ৪৯–৫১ আসন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×