somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিষ্ফল অবরোধের চার মাস, প্রত্যাহারেও অক্ষম বিএনপি জোট

০৫ ই মে, ২০১৫ রাত ১২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাস্তবে কোনো কার্যকারিতা না থাকলেও আজ মঙ্গলবার চার মাস পূর্ণ করছে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের ডাকা ‘অনির্দিষ্টকালের অবরোধ’। সংখ্যার দিক থেকে অবরোধের আজ ১২০তম দিন। কার্যকারিতা না থাকলেও জোটের পক্ষ থেকে অবরোধ প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও দেয়া হয়নি। যার ফলে দেশের আন্দোলনের ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই অবরোধের কারণে নতুন এক রেকর্ড গড়লো বিএনপি। নজিরবিহীন এই অবরোধের শুরু থেকেই রাজনৈতিক কার্যকারিতা না থাকলেও ছিল নাশকতা, বিশেষ করে পেট্রোল বোমা সন্ত্রাসে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ভীতসন্ত্রস্ত ছিল জনজীবন।

প্রসঙ্গত, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৫ জানুয়ারি রাজধানীতে ডাকা সমাবেশকে কেন্দ্র করে ওইদিন নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যেতে পুলিশি বাধা পেয়ে গুলশান কার্যালয়ের ফটকের ভেতরেই দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের সামনে লাগাতার অবরোধের ডাক দেন ২০ দলীয় জোট প্রধান ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ওইদিন তিনি বলেছিলেন, ‘পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা না করা পর্যন্ত অবরোধ চলতে থাকবে’। এরপর ১৯ জানুয়ারি এবং ১৩ মার্চ দু’দফায় সংবাদ সম্মেলনেও তিনি বলেছেন, ‘যৌক্তিক পরিণতিতে না পৌঁছা পর্যন্ত অবরোধ চলবে।’

তবে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া গত ৫ এপ্রিল আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিয়ে গুলশানের বাসায় ফিরে যাওয়ার পর থেকেই ঘোষণা ছাড়াই অবরোধ ‘অকার্যকর’ হয়ে যায়।

‘গত ৫ জানুয়ারি আপনি যে অবরোধ ডেকেছিলেন, তা এখনও অব্যাহত আছে কি-না’- ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দু’দিন আগে গত ২৬ এপ্রিল খালেদা জিয়ার ডাকা সংবাদ সম্মেলনে তার কাছে এই প্রশ্ন রেখেছিলেন এই প্রতিবেদক। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘অবরোধ আমি ডাকিনি, এটা ছিল ২০ দলীয় জোটের কর্মসূচি। আপনারা জানেন, আমরা এখন নির্বাচন (সিটি)সহ কিছু ঝামেলায় আছি। যার কারণে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকও ডাকা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া আপনারা তো দেখছেন অবরোধ এখন আর তেমন সক্রিয় নেই, এই মোটামুটি আছে আর কী।’

গত ৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধ এখনও বহাল আছে কী নাই-এনিয়ে সৃষ্ট অস্পষ্টতা কিংবা ধুম্রজাল সম্পর্কে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান গতকাল সোমবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘অবরোধের এখন আর কার্যকারিতা নেই, আমাদের দল ও জোটের নেতা-কর্মী ও দেশবাসী সবাই এভাবেই বিষয়টিকে মেনে নিয়েছে। এটিই হচ্ছে বাস্তবতা। তাছাড়া অবরোধ কর্মসূচি পালনের জন্য আমরা নতুন করে আহ্বানও জানাইনি। যার কারণে এখন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে এটিকে প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয়তাও আছে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে এই অবরোধের বিষয়ে নতুন চিন্তার সুযোগ দেয়াও সমীচীন হবে না।’ তাহলে ভবিষ্যতে কেউ যদি প্রশ্ন তোলে যে, বিএনপি ইতিহাসের দীর্ঘতম সময়....দিন ধরে অবরোধ করেছিল, তখন বিএনপি কী জবাব দেবে? এই প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘এটা অবশ্য একটা বিষয়। তবে সেটি বলার সুযোগ নেই।’

তবে ২০ দল শরিক ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘অবরোধ ওই অবস্থায় আছে আর কী! প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয়নি-এটা ঠিক। যেহেতু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রহ্যাহার করা হয়নি, সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় অবরোধ এখনও বহাল রয়েছে।’

অবরোধ চলমান আছে কী নেই-এনিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দল শরিকদের সমন্বয়হীন বক্তব্য থাকলেও রাজনৈতিক কর্মসূচিকেন্দ্রিক সহিংসতার দীর্ঘতম এক রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে এই অবরোধে, যাতে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। ২০ দলের টানা এই অবরোধে নিহত হয়েছেন ১৫৩ জন, যার ৯০ জনই সাধারণ মানুষ। এরমধ্যে বেশিরভাগেরই মৃত্যু হয়েছে পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হয়ে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটানা এত সময় ধরে অবরোধের ইতিহাস নেই। অতীতে এরকম নাশকতা বা সাধারণ মানুষের প্রাণহানির এত ঘটনাও ঘটেনি। তা ছাড়া আগে কখনোই সাপ্তাহিক ছুটি বা জাতীয় দিবসে আন্দোলন কর্মসূচি থাকতো না। যা এবার হয়েছে। অতীতের সব আন্দোলন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষকে নিশানা করে আগে কখনো হামলা হয়নি। আগে রাজনৈতিক আন্দোলন মানে ছিল পুলিশের হামলা, তাদের সঙ্গে মারামারি কিংবা দুই পক্ষের সংঘর্ষ। কিন্তু এবার রাজনীতিতে নতুন অস্ত্র হিসেবে যুক্ত হয়েছে পেটো্রলবোমা। যদিও এনিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক জোট একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের গ্রন্থ বাংলাদেশের তারিখ, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট প্রকাশিত সংবাদপত্রে হরতালচিত্র (১৯৪৭-২০০০) বইয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর আগে টানা অসহযোগ কর্মসূচি চলেছে ২০ দিন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আওয়ামী লীগ এই কর্মসূচি দিয়েছিল।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, সবচেয়ে বড় আন্দোলন হয়েছে এরশাদ সরকারের পতনের দাবিতে। আট বছর বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন হলেও ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর পুলিশের গুলিতে চিকিত্সক শামসুল আলম মিলন মারা গেলে এরশাদ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। এরপরই টানা আন্দোলনের ঘোষণা আসে। নয় দিনের মাথায় (৫ ডিসেম্বর) এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

এবারের টানা অবরোধ-হরতালে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিয়েও স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এরইমধ্যে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রকাশ উপলক্ষে বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি জানিয়েছে, টানা হরতাল-অবরোধ, সহিংসতাসহ রাজনৈতিক অস্থিরতায় চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) ১৭ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। তাই চলতি অর্থবছরে ১ শতাংশ কমে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেয় বিশ্বব্যাংক। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) গত ৫ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করে, জানুয়ারি থেকে মধ্য মার্চ পর্যন্ত আড়াই মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতায় উত্পাদন ব্যবস্থায় ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। যা মোট জিডিপি’র দশমিক ৫৫ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলে সমপরিমাণ পণ্য ও সেবা উত্পাদিত হতো, যা জিডিপিতে যোগ হয়ে এর আকার বড় করতো বলেও মনে করে সিডিপি।

সূত্র
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×