somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বীরাঙ্গনা নয়, মুক্তিযোদ্ধা : কেয়া বিশ্বাস

০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ ভোর ৬:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমার তখন ১৭ বছর বয়স। আমার নাম ছিল মীরা বণিক। যুদ্ধের আগুনে পুড়ে আমি এখন কেয়া বিশ্বাস। আমার বাবার নাম ছিল রূপলাল বণিক। মায়ের নাম শৈলবালা বণিক। যুদ্ধের ঝড়ে তারা হারিয়ে গেছে!
একাত্তরের একদিনের কথা বলছি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীসহ এ দেশীয় দোসরদের একটি দল গোপালগঞ্জের বণিকপাড়ায় এসে পৌঁছে। পাড়ায় ঢুকেই তারা নির্বিচারে ঘরবাড়ি পোড়াতে থাকে। আমাদের বাড়িও এর থেকে রেহাই পেল না। আমার মা-বাবা আমার ছোট ছোট ভাই-বোনদের নিয়ে আত্মরক্ষার জন্য এদিক সেদিক ছুটছিল। আমি ভয়ে ঠাকুরদাকে (গোপাল বণিক) জড়িয়ে ধরি। এক পাকিস্তানি সৈন্য এসে আমাকে একটা টান দিয়ে ঠাকুরদার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিল। ঠাকুরদা আমাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য অনুনয় করতে থাকলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করল। চোখের সামনে দাদু আমার ছটফট করতে করতে মারা গেলেন। তারপর ওরা আমাকে টেনেহিঁচড়ে আমাদের গ্রাম থেকে আধা মাইল দূরে পাকিস্তানি বাহিনীর দিগনগর ক্যাম্পে নিয়ে গেল। যাওয়ার আগে আমাদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। একাত্তরে নির্যাতনের কথা জানতে চাইলে ভোরের কাগজের কাছে এভাবেই কষ্টগাঁথা মেলে ধরলেন সর্বস্ব হারানো কেয়া বিশ্বাস। ছলছল চোখে এই মা বলেন, বাঁচার জন্য অনেক চিৎকার করে মাফ চাইলাম, ছাইড়া দিতে কইলাম। ওদের দয়া হলো না। উল্টো মজা করতেছিল মালাউনের বাচ্চা বলে বলে। ক্যাম্পে আমার ওপর চললো পাশবিক নির্যাতন।
মাঝে মাঝে ভাবতাম, আত্মহত্যা করে জীবনটা শেষ করে দেই। কিন্তু সেই সুযোগ পাইনি। মাসখানেক পর মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পটি দখল করে উদ্ধার করে আমাদের। তখন আমি গুরুতর অসুস্থ, বলতে গেলে মরা মানুষ। উদ্ধার হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে নানা ধরনের সেবা করেছি।
১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। এরপর বাড়ি গিয়ে দেখি বিরানভূমি হয়ে গেছে! কোথাও কেউ নেই! শুনেছি সবাই ভারতে চলে গেছে। বুকটা তখন কান্নায় হু হু করে উঠেছে। চারদিক যেন অন্ধকার লাগছিল। আমার কোনো আশ্রয় নেই! কিন্তু দয়া হয় একজনের। তিনি মুক্তিযোদ্ধা রোকনুদ্দিন মোল্লা। নিজের মেয়ের মতো তার বাড়িতে আশ্রয় দেন।
তখন আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের অনুরোধে তিনি স্বাধীনতার মাসখানেক পরে আমাকে বিয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আলী বিশ্বাসের সঙ্গে। সেও ৮ নম্বর সেক্টরে হেমায়েত বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি গত ৬ বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ করলেও যার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নেই। আর মানইজ্জত সব হারিয়েও আমার নামও কোথাও কোনো তালিকায় নেই। তিনি বেঁচে থাকতে জীবন দুঃখ কষ্টে কেটে গেছে। কিন্তু এখন আমার জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
স্বাধীনতার জন্য ইজ্জত হারাইলাম, স্বজন হারাইলাম। কিন্তু অপমান ছাড়া কিছুই পাইনি। একটু সাহায্যের জন্য যে যেখানে বলেছে, দৌড়াই গেছি। হতাশা নিয়ে ফিরে এসেছি।
দেশের জন্য স্বজন ও ভিটেমাটি হারালাম, মান গেল, ইজ্জত গেল। বলতে গেলে জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। নিঃস্বতা নিয়ে অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, এখনো ঘুরছি। কিন্তু কেউ পাশে দাঁড়াচ্ছে না। সাহায্য করছে না। এমনকি বীরাঙ্গনার তালিকাতেও আমার নাম নেই, মুক্তিযোদ্ধা তালিকাতেও নেই। এতো হারানোর পরও কোথাও তালিকাভুক্ত হলাম না! এটা কি আমার প্রতি অন্যায় নয়?
আমার শেষ ইচ্ছা মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় আমার নাম তালিকাভুক্ত করুক। আমাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান দিক। এই সম্মান না পেলে মরেও শান্তি পাব না।
কেয়া বিশ্বাস বলেন, এক কন্যাসহ ৩ ছেলে নিয়ে ৪৪ বছর ধরে খেয়ে-না খেয়ে জীবনযাপন করতেছি। নানা রকম রোগবালাই বাসা বেঁধেছে শরীরে। দেখার কেউ নেই!
একটু ভালো করে বাঁচার আশায় কতদিকে দৌঁড়াচ্ছি, কোনো লাভ হচ্ছে না। শুনেছি, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অনেক দয়ালু। মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ান। তিনি কি একবার এ অভাগাদের পাশে দাঁড়াবেন?
শুনেছি, তিনি আমাদের মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দিয়েছেন। কথাটা শুনে সীমাহীন কষ্টের মাঝেও খুশি লাগছে। তারপরও মনের কষ্টে মাঝে মাঝে ভাবি, দেশ স্বাধীন হইয়া লাভ কী হইল? আমরা কি এমন দেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম? আমি আজ পথে পথে ঘুরতাছি। এইডা তো উচিত বিচার হইতাছে না?
যুদ্ধাপরাধী রাজাকাররাই তো আমাদের পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিছে। তারা কি আমাদের চিনত? ওই জানোয়ার যুদ্ধাপরাধীর বিচার হইতাছে এতে অনেক খুশি লাগতাছে। যা বলে বুঝাইতে পারব না।
কিন্তু দুয়েকজনকে নয়, সবগুলারে ধরে ধরে ফাঁসি দিতে হবে। তবেই শান্তি পাব।
সূত্র
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ ভোর ৬:৩৩
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২০


৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবস....

দেখা হবে যুদ্ধ ফুরোলে সন্ধের মাহফিলে;
দেখা হবে ঠিক চেনা রাস্তার অচেনা-অন্ত্যমিলে।
ছড়াব আবার শস্যের দানা দেশ থেকে মহাদেশে
মানুষই জেতে, খুঁজে নেয় আলো অন্ধকারের শেষে...

তোমার গল্পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বস্ত্রশিল্পের জন্য আমি সরকারের যথাযথ স্থানে থাকলে কি করতাম !!!

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৬



গত ১০ দিন হল দেশের বস্ত্র শিল্পের উপর আঘাত খুব চিন্তার বিষয়। অনেক আগে বিচ্ছিন্নভাবে বস্ত্রশিল্প নিয়ে কথা বলেছিলাম। আজ সব মিলিয়ে কিছু চিন্তা করলাম। তার কিছু এখানে নোট... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নির্মূলে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১৭


প্রস্তাবিত প্রকল্প: স্বাবলম্বী বাংলাদেশ - দারিদ্র্যমুক্তির নতুন নগর

আমি যদি সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল বিভাগের প্রধান হতাম, তাহলে আমার প্রথম লক্ষ্য হতো বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে বাস করা ১ কোটি ৭০... ...বাকিটুকু পড়ুন

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

×