somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হত্যাকাণ্ডটি বিশেষ কেন?

০৯ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


৭ এপ্রিল (২০১৬) সোহাগী জাহান তনুর খুনি শনাক্ত করে গ্রেপ্তার দাবিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি থেকে ২৫ এপ্রিল সারাদেশে অর্ধদিবস হরতালের ঘোষণা দিয়েছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো। কুমিল্লা সেনানিবাসের প্রাচীরহীন সীমানার মধ্যে নাট্যকর্মী ও ভিক্টোরিয়া কলেজের ওই ছাত্রী নিহতের ১৭ দিনেও কোনো খুনি শনাক্ত না হওয়া এবং ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত না পাওয়ায় এর সুষ্ঠু তদন্ত নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে বাম ছাত্র সংগঠনগুলো। ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেশের বিশিষ্টজনরা বলেছেন, সুরক্ষিত জায়গায় তনুকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, তারা কি স্থানটি সরেজমিনে দেখেছেন?

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের পুরো এলাকা দেয়াল দিয়ে ঘেরা নয়। উপরন্তু যে জায়গায় তনুর মৃতদেহ পাওয়া গেছে, সেটি পার্শ্ববর্তী গ্রামের কাছে। ধানক্ষেতের আল দিয়ে জঙ্গলময় উক্ত স্থানে সহজেই প্রবেশ করা যায়। তাছাড়া কিছুদিন আগে ওই এলাকা দিয়ে সেনানিবাসের প্রাচীর স্থাপনের সময় গ্রামবাসীদের বাধার মুখে কাজটি অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। এ জন্য সুরক্ষিত জায়গায় হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলা হলেও তা যথার্থ নয়।

অন্যদিকে ফেসবুক এবং অনলাইন মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া রক্তাক্ত নারীর ছবিটি ২০১৩ সালে বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত ভিয়েতনামের একজন নারীর ছবি। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির জন্য নারীটিকে খুন করা হয়েছিল। সেই ছবিকে তনুর বলে প্রচার করা হয়েছে কেন, কোন মোটিফে তনুকে রক্তাক্ত দেখানো হয়েছে, তা পরিষ্কার করা দরকার। তনুর প্রকৃত ছবি কেন মিডিয়াতে প্রচার করা হয়নি, সেটিও রহস্যজনক। তাছাড়া তনুর ধর্ষণ বিষয়ে উপাখ্যান কে প্রথম প্রচার করেছে? যে ব্যক্তি বলেছে তনু ধর্ষিতা, সে কি তার মরদেহ দেখেছে? এমনকি কুমিল্লার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা জনৈক সাংবাদিককে বলেছেন, তাদের মনে হয়েছে তনু ধর্ষণের শিকার। কিন্তু তিনিও ভাল করে মরদেহ দেখেননি। পরে অবশ্য লাশ তুলে ময়নাতদন্তে দেখা গেছে, তনু ধর্ষণের শিকার হয়নি।

তনু হত্যাকাণ্ডে ‘সুরক্ষিত’ বিষয়টি আসলে অমূলক। যারা বলছেন তারা জানেন না জায়গাটি অরক্ষিত। এ জন্য ঘটনাটিকে যারা ‘বিশেষ’ বলে চিৎকার করছেন, আসলে তারা কি বোঝাতে চাইছেন? বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি লাশ পড়লে কি সেই প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থী দায়ী হয়ে পড়েন? কিংবা পুলিশের একজন সদস্যের অপরাধের দায় কি গোটা পুলিশ সংস্থার কাঁধে বর্তায়? এজন্য সুরক্ষিত তত্ত্বের কথা খাটে না তনুর মৃত্যুর ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, তনু হত্যার ঘটনাটি এত গুরুত্ব পাচ্ছে কেন? নিকট অতীতে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতায় মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা, ব্লগারদের হত্যা কিংবা বিদেশিদের হত্যাসহ অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তনু হত্যার পার্থক্য কোথায়? উত্তর হলো, ‘ক্যান্টনমেন্ট’। ক্যান্টনমেন্টের সীমানায় প্রাচীরহীন এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে বলেই তনুহত্যার প্রতিবাদে সোচ্চার বামপন্থী সংগঠনগুলো ছাড়াও সুশীল সমাজ। অনেকে হয়ত ঘটনার আদ্যোপ্রান্ত না বুঝেই শামিল হচ্ছে প্রতিবাদের কাতারে। আবেগ, অনুভূতি কিংবা দুর্বলতা, যাই বলি না কেন, বিষয় একটিই, তা হলো ক্যান্টনমেন্ট তথা সেনাবাহিনী। কিন্তু আমরা কেউ বলছি না কেবল ক্যান্টনমেন্ট কেন, বাংলাদেশ তথা বিশ্বের কোনো স্থানে এমন নৃশংস এবং বর্বর হত্যাকাণ্ড কাম্য নয়। কোনো হত্যাকাণ্ডই মেনে নেওয়া যায় না। ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলে এটা প্রমাণ করে না যে, এতে সেনাসদস্যরাই সম্পৃক্ত। কারণ ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় শুধু সামরিক বাহিনীর লোকজন নয়, অনেক বেসামরিক লোকজনও থাকে। আর ঘটনার সঙ্গে সেনাসদস্যরা জড়িত তারও কোনো প্রমাণ নেই। তারপরও দেশের কিছু সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী তনুহত্যায় সেনাবাহিনীর দিকে তীর ছুড়ে মারছে।

তাদের বক্তব্য এমন যে, ক্যান্টনমেন্টের মতো সংরক্ষিত এলাকায় ঘটনাটি ঘটেছে, কাজেই ঘটনার সাথে সেনাসদস্যরা জড়িত। এর আগেও আমরা দেখেছি কোনো ঘটনা ঘটলে সেনাবাহিনীকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। কাজেই আমাদের অহংকার এই সেনাবাহিনীকে ঘায়েল করার অপচেষ্টা বরাবরই লক্ষ করা গেছে। তনু হত্যার সুষ্ঠু বিচার এবং দোষীদের শাস্তি হোক তা আমরা সবাই চাই। কারণ এই হত্যার বিচার না হলে অপরাধীরা ছাড় পেয়ে যাবে এবং মানুষ দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাবে। তারপর ভাবতে হবে ক্যান্টনমেন্টে আমাদের মতো রক্তে-মাংসে গড়া মানুষই থাকে। সেখানে ফেরেশতা থাকে এমন ভাবারও কোনো কারণ নেই। আমরা কেবল তনুহত্যার প্রতিবাদ করেই চলছি, কিন্তু অনুধাবন করার চেষ্টা করছি না সমাজে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কেন ঘটছে? প্রতিবাদের ফলস্বরূপ অপরাধীদের শাস্তি হচ্ছে, কিন্তু তারপরও থেমে নেই এইসব জঘন্য ঘটনা। মৃত্যুদণ্ড দিলেই যদি সমাজের নানা অনাচার, খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি দূর হতো তাহলে শাইখ আব্দুর রহমান কিংবা এরশাদ শিকদারের ফাঁসির পর সমাজে আর কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটত না।

দেশে যখন ধর্মীয় মৌলবাদীরা ব্লগার হত্যাযজ্ঞ চালায় কিংবা বিএনপি-জামায়াত যখন পেট্রোল বোমায় মানুষকে পুড়িয়ে মারে, তখন আমাদের প্রতিবাদ বেশি বেগবান হয় না। কয়েকদিন নামমাত্র মানববন্ধন করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে দেশের বামপন্থী এবং সুশীল সমাজ। সন্ত্রাসী হামলায় যখন মানুষের প্রাণহানি হয়, তখনও নীরব ভূমিকা পালন করে কিছু মহল।


যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দমাতে অপশক্তি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে তখনও প্রতিবাদ তেমন দৃঢ় হয় না। কিন্তু তনুহত্যায় সেনাবাহিনীর গন্ধ পাওয়া যায়, তাই বুঝি এতো প্রতিবাদ, হরতালও আহ্বান করা করা হয়। এর মানে কি এই নয় যে, আমরা মৌলবাদী, সন্ত্রাসী এবং অন্য অপশক্তিকে ছাড় দিতে পিছপা হলেও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর। এক্ষেত্রে প্রতিবাদের ভাষা তীব্র, দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর। তবে কেন আমাদের এই মনোভাব? সেনাবাহিনী তো দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জাতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত। তাদের কোনো দুর্বলতা পেলে আমরা এতো উঠে পড়ে লাগি কেন? আর এতো মরিয়াই বা কেন হই। তবে কি আমরা ধর্মীয় মৌলবাদীদের প্রতি সদয় এবং সেনাবাহিনীর প্রতি নির্দয়? কোনো সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়াই তনুহত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে আজ ইমরান এইচ সরকাররা সরব। তবে একথা ঠিক, খুনিদের গ্রেফতার করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। কিন্তু তার জন্য সময় দরকার।

প্রথম থেকেই ইমরান এইচ সরকার এই হত্যাকাণ্ডকে নিয়ে মাঠ গরম করার চেষ্টা করছেন। যেখানে গায়িকা কৃষ্ণকলির স্বামীকে গৃহকর্মী হত্যার দায় থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, সেখানে তনুহত্যার বিষয়টি না জেনে এত তৎপরতা দেখানোর কারণ কি? সাধারণ মানুষকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা নয় কি?
অবশ্য সেনাবাহিনীকে অযথা বিতর্কিত করার প্রয়াস সফল হবে না। তাছাড়া সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তনুহত্যার বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশবাহিনীসহ সকল আইন-শৃঙ্খলা সংস্থা এই হত্যার তদন্তে নিয়োজিত। অন্যদিকে নারী সংগঠনগুলোও উচ্চকণ্ঠ। এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করা এখন সেনাবাহিনীর জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের ভাবমূর্তি দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িত। এজন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কোনো বক্তব্য দিয়ে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হবে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের শামিল।
সুত্র

সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই এপ্রিল, ২০১৬ রাত ২:৩৩
১৩টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমি কে? রাজাকার!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:০১



ভারতে দেশপ্রেমের সজ্ঞা কী? ভারতে একজন কট্টরপন্থীর দেশপ্রেম হলো প্রথমত পাকিস্তান বিরোধী হতেই হবে। দ্বিতীয়ত মুসলিম বিরোধী হতেই হবে। এই দুই ছাড়া কোনভাবেই সে ভারতকে ধারণ করেনা এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

সিনেমার গল্পঃ মেঘের অনেক রং - যে মেয়েটিকে মেঘ বানিয়ে দেওয়া হলো

লিখেছেন রাজসোহান, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৭



সিনেমা শুরু হয় সবুজ দিয়ে। ওয়াইড ফ্রেমে পাহাড়, গা বেয়ে নেমে যাওয়া রাস্তা, আর রাস্তায় ছোট্ট একটা গাড়ি। ক্যামেরা কাটে গাড়ির ভেতরে। দুইজন মানুষ কথা বলছেন, নিতান্ত সাধারণ কথা। আবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

খেলা ফাইনাল হয়ে যেতে পারে আগামীকাল ...

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:৪৮


আগামীকাল অপপ্রচারকারীদের খেলা ফাইনাল হয়ে যেতে পারে। গ্যাস আর বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরকারকে কাবু করার দিন ফুরিয়ে এসেছে। 'কাছিমের মতো গর্ত থেকে বের হয়ে' যারা এতদিন সরকারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন ভোরের গান

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭


নতুন ভোরের গান



কষ্টের দিন পেরিয়ে এবার
আসবে আলোর গান,
নতুন দিনের নতুন সুরে
জাগবে সবুজ প্রাণ।

নষ্ট স্মৃতির আড়ষ্টতা
ঝরিয়ে দেবো অনেক দূরে,
নিজের মনেই ভালোবাসার
নূপুর বাজবে সুরে সুরে।



ভ্রষ্ট পথের আঁধার কেটে
ভোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগে চার বছর একদিন হয়ে গেল । কি আশ্চর্য!

লিখেছেন সামরিন হক, ৩১ শে আগস্ট, ২০২৬ ভোর ৬:৪৭

অবজ্ঞা

তোমার বিশেষ ঘৃণা দ্বারা আক্রান্ত আমি
চারপাশ ঘিরে ফেলেছে ঘৃণারা আমাকে
আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছে আমাকে তোমার ঘৃণা
আমার কথা শোন
আমি কখনই মনুষ্যত্বের সীমা পার করিনি
কিন্তু তোমার ঘৃণায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×