
একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০১২ সালের ১৭ জুন গ্রেফতারের পর ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে মীর কাসেমকে কারাগারে পাঠানো হয়। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ২০১৩ সালের ১৬ মে মীর কাসেমের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মীর কাসেমের যুদ্ধাপরাধের বিচার। এরপর মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয় এবং সেখানেই ওই ১৮ নভেম্বর সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। ২০১৩ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৪ জন। এরপর ২১ ও ২২ এপ্রিল মীর কাসেম আলীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন তার ছোট বোন মমতাজ নুরুদ্দিনসহ তিনজন। সাক্ষ্য-জেরা এবং দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে চলতি বছর ৪ মে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।
২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আলবদর কমান্ডার মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়ে মীর কাসেমের বিরুদ্ধে আনা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে দুইটি ছিলো হত্যার। এই দুই অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। বাকি আটটি অপরাধে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। এর সবগুলো ছিলো অপহরণ, নির্যাতন ও বন্দি রাখার। চারটি অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় তাকে খালাস দেয়া হয়েছিলো। ওই বছরে তিনি রায় বাতিল চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে আপিলের ওপর শুনানি করেন রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষ। শুনানি শেষে ৮ মার্চ আপিল বিভাগের রায় হয়। রায়ে আপিল বিভাগ ১১ নম্বর অভিযোগে (মুক্তিযুদ্ধকালে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরদিন মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে আটক করে আলবদর সদস্যরা। ২৮ নভেম্বর মীর কাসেমের নির্দেশে আলবদররা তাঁকে দিনভর নির্যাতন করে। নির্মম অত্যাচারে জসিম মারা যান। পরে নিহত আরও পাঁচজনের সঙ্গে জসিমের মরদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়) মৃত্যুদণ্ড এবং ১২ নম্বর অভিযোগে (একাত্তর সালের নভেম্বরের কোনো একদিন হাজারী লেনের বাসা থেকে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, রঞ্জিত দাস ও টুন্টু সেনকে আটক করে মীর কাসেমের নেতৃত্বাধীন আলবদর সদস্যরা। ওই সময় হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হাজারী লেনের ২৫০ থেকে ৩০০ ঘরে আগুন দেওয়া হয়। পরে জাহাঙ্গীর আলমকে আলবদররা ছেড়ে দিলেও রঞ্জিত ও টুন্টুকে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন ও পরে হত্যা করা হয়) থেকে মীর কাসেমকে খালাস দেয়। এছাড়া ২ নম্বর অভিযোগে (একাত্তরের ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রামের চাক্তাই এলাকা থেকে লুত্ফুর রহমান ও সিরাজকে আটক করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন) ২০ বছর দণ্ড, ১৪ নম্বর অভিযোগ (একাত্তরের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে নাসিরউদ্দিন চৌধুরীকে আটক করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করে) ১০ বছর কারাদণ্ডের রায় বহাল রাখে আদালত।
৩ নম্বর অভিযোগ (১৯৭১ সালের ২২ অথবা ২৩ নভেম্বর মীর কাসেমের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে তার কদমতলা বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়), ৭ নম্বর অভিযোগ (মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে সাত/আট জন যুবক ডাবলমুরিং থানা থেকে সানাউল্লাহ চৌধুরীসহ তিন জনকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়), ৯ নম্বর অভিযোগ (২৯ নভেম্বর নুরুজ্জামান ও তার চাচাতো ভাইসহ সাত জনকে অপহরণ ও নির্যাতন) ও ১০ নম্বর অভিযোগে (আসামির নির্দেশে মো. জাকারিয়াসহ চারজনকে অপহরণ ও নির্যাতন) ট্রাইব্যুনাল মীর কাসেমকে সাত বছর করে ২৮ বছর কারাদণ্ড দেয়। আপিলে ওই ট্রাইব্যুনালের ওই দণ্ড বহাল রাখে। তবে ৪ (২৪ নভেম্বর ডাবলমুরিং থানায় সাইফুদ্দিন খানকে তার নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে আল বদর বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন) ও ৬ নম্বর (চট্টগ্রাম শহরের একটি চায়ের দোকান থেকে হারুন অর রশিদ খান নামে একজনকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেল এবং সালমা মঞ্জিলে নির্যাতন করা হয়) অভিযোগে ৭ বছর করে ট্রাইব্যুনাল দণ্ড দিলেও আপিল বিভাগ কাসেমকে খালাস দেয়।
এই রায়ের রিভিউ আবেদন করেন মীর কাসেম। গত ২৮ আগষ্ট ওই রিভিউ পিটিশনের ওপর শুনানি শেষ হয়। শুনানি শেষে মঙ্গলবার ৩০ আগস্ট রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করা হয়। এদিন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তার রিভিউ পিটিশন খারিজ করে দেয়। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। একবাক্যে রায় ঘোষা করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘রিভিউ পিটিশন ইজ ডিসমিসড’। রায়ে বলা হয়, ‘উই ফাউন্ড হিম গিলটি কনভিকশন ইজ মেইনটেনেবল’। আপিল বিভাগ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ, আটক রেখে নির্যাতন এবং হত্যার দায়ে মীর কাসেমের ফাঁসির দণ্ড বহাল রাখে। তবে রিভিউর রায়ে অন্য দণ্ডের বিষয়ে কিছু সংশোধনী আনা হয়।
উল্লেখ্য, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের দায়েরকৃত সাতটি আপিলের ওপর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেছে আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোলা, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় কার্যকর করেছে সরকার। তবে ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলো। আপিলে ওই সাজা পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় মারা গেছেন জামায়াত নেতা গোলাম আযম ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীম। পরে এসব আপিল অকার্যকর ঘোষণা করা হয়।
সূত্র
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ভোর ৬:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



