
দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে। গত ছয় বছরে অতি দারিদ্র্যের হার কমেছে সাড়ে চার শতাংশ। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বাংলাদেশে বর্তমানে অতিদারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। একই হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ছিল ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ, ২০১০-১১ অর্থবছরে ছিল ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশে ‘অতিদারিদ্র্য’ মানুষের সংখ্যা কমে এসেছে। দারিদ্র্য বিমোচনে এই অগ্রগতি সন্দেহাতীতভাবেই আমাদের জন্য গর্বের। চেষ্টা করলে আমরাও যে পারি, সে বিষয়টিই স্পষ্ট হয়েছে।
দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে ধারাবাহিকতা তা এই অঞ্চলের ভারত, পাকিস্তান ও ভুটানের চেয়ে অনেক ভালো। গত সোমবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলন করে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগে দৈনিক ১.২৫ ডলারের (প্রায় ১০০ টাকা) কম আয়ের মানুষদের আন্তর্জাতিকভাবে অতিদরিদ্র বিবেচনা করা হতো। মূল্যস্ফীতির কারণে ২০১৫ সাল থেকে দারিদ্র্য পরিমাপের এই ভিত্তি ১.৯০ ডলার (প্রায় ১৫০ টাকা) করা হয়। প্রকৃত চিত্র পাওয়ার জন্য ডলারের বিপরীতে টাকার বাজারদরের পরিবর্তে ক্রয়ক্ষমতা (পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি) বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বর্তমানে বাংলাদেশের ১২ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষের দৈনিক আয় ১৫০ টাকার কম। কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক সহায়তা ছাড়াই বাংলাদেশ স্বল্পসময়ের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, লিঙ্গসমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং শিশুমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। বিশেষ করে চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূলে উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কারণে বিশ্বে এখন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। এ ঘটনা বাংলাদেশের সাফল্য ও অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে মাইলফলকই বলা যায়। বলা হয়, দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে দেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির পেছনে সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রম, বেসরকারি পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগ এবং একই সঙ্গে সামাজিক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখন এ প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করতে পারলে বিশ্বে আমাদের অবস্থান আরো সুদৃঢ় হবে।
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ‘শূন্যে’ (৩ শতাংশের নিচে নেমে এলেই তাকে শূন্য ধরা হবে) নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে বাংলাদেশে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বাংলাদেশকে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। তারা বলছে, দেশের অর্থনীতিতে এখনো কিছু উদ্বেগ রয়েছে। স্থিতিশীলতা থাকলেও উদ্বেগ কাটেনি। বিনিয়োগ না হয়ে সঞ্চয়ের অর্থ পাচার হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, তিনটি চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। আর তা হলো বেসরকারি বা ব্যক্তি বিনিয়োগ কম, রেমিট্যান্স প্রবাহ বর্তমানে নিম্নমুখী এবং আন্তর্জাতিক অর্থপ্রবাহ কমেছে। ব্যক্তি বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ায় সরকারি ও ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের ব্যবধান বেড়েছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা রয়েছে। অর্থের অভাব নেই কিন্তু অর্থ যাচ্ছে রিজার্ভ ভিত্তিতে এবং অর্থ পাচার হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রবৃদ্ধি অর্জনের গতি ব্যাহত হলে বেড়ে যাবে দারিদ্র্যের হারও। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অর্থনেতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই হবে, এর জন্য সবধরনের চ্যালেঞ্জ দৃঢ়ভাবে মোকাবেলা করেই এগুতে হবে। বিনিয়োগে গতি সঞ্চার, অর্থপাচার রোধ, অভ্যন্তরীণ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারই নিশ্চিত করতে পারে সাফল্যের কাক্সিক্ষত শিখরে আমাদের অবস্থান। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্যের ধারা অব্যাহত রাখতে সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই অক্টোবর, ২০১৬ সকাল ১০:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




