
দেশে বিহারি ক্যাম্পগুলোতে বিদ্যুতের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বাড়লেও বিল পরিশোধ করছে না এসব ক্যাম্পের বাসিন্দারা। ১৯৯২ সালের জরিপ মোতাবেক দেশের ১৭টি জেলায় ৭০টি বিহারি ক্যাম্প রয়েছে। এসব ক্যাম্পের মধ্যে দুটি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির আওতাধীন ৮টি বিহারি ক্যাম্পেই বিল বকেয়া পড়েছে ৭৬ কোটি টাকার বেশি। সম্প্রতি এই ৮ ক্যাম্পের বকেয়া বিলের টাকা পরিশোধের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) আওতাধীন ৮টি বিহারি ক্যাম্পে ৭৬ কোটি ২৫ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে। এর মধ্যে পিডিবির আওতাধীন ক্যাম্পে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৬ কোটি ৭৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা বকেয়া পড়েছে। এ ছাড়া ডেসকোর আওতাধীন ক্যাম্পে গত অক্টোবর পর্যন্ত বকেয়া পড়েছে ৩৯ কোটি ৪৬ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। বিশাল অঙ্কের এই বকেয়া পরিশোধের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দারা এদেশে সব ধরনের নাগরিক সুবিধাই গ্রহণ করছে। নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ নাগরিকের মতোই রাষ্ট্রের সব ধরনের সেবামূল্য তাদের পরিশোধ করা উচিত। কিন্তু তারা তা করছে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী এদেশে আটকে পড়া উর্দুভাষী অবাঙালিদের (বিহারি) সকল প্রকার বিল দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এসব বিল পরিশোধ করে। কিন্তু যখন আটকে পড়া এসব অবাঙালিরা বাংলাদেশের নাগরিক হয়েছেন তখন কনভেনশনের শর্ত মানা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, এখন সরকারের উচিত তাদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া। এদের কেউই বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছে না। দীর্ঘদিনের এই বকেয়া বিল পেতে বিদ্যুৎ বিভাগ এখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে দেনদরবার করলেও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে তা আদায় করা যাচ্ছে না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে পাঁচ লাখ বিহারি রয়েছেন। এদের মধ্যে দেড় লাখেরও বেশি ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় উচ্চ আদালতের এক রায়ে বলা হয়েছে, যাদের জন্মস্থান বাংলাদেশে তাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে। আদালতের এই আদেশের পর অর্ধেকেরও বেশি বিহারি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়েছে। কিন্তু ক্যাম্পে বসবাস করায় তাদেরও আটকে পড়া পাকিস্তানি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অথচ তারা সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য ও নাগরিক সুবিধা ভোগ করছেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান আলাদা হয়ে যায়। তৎকালীন সময়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মুসলমানরা মুসলিম দেশে বাস করতে আগ্রহ দেখায়। ওই সময় পাকিস্তান সরকার কৌশলে তাদের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বর্তমানে বাংলাদেশে থাকার ব্যবস্থা করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবাঙালি উর্দুভাষীরা পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আন্তর্জাতিক রেডক্রস বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় উর্দুভাষী অবাঙালিদের বসবাসের জন্য ক্যাম্প স্থাপন করে। যা জেনেভা ক্যাম্প হিসেবে পরিচিত।
পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে মক্কাভিত্তিক এনজিও রাবেতা আল ইসলাম বাংলাদেশে বসবাসকারী উর্দুভাষী অবাঙালিদের ওপর জরিপ করে। সেই জরিপ মোতাবেক দেশের ১৭টি জেলায় ৭০টি ক্যাম্প রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার মোহাম্মদপুরে ৬টি ও মিরপুরে ২৫টি। বাকি ৩৯টির মধ্যে বগুড়া, গাইবান্ধা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর ও নীলফামারীতে একটি করে, নারায়ণগঞ্জে ৩টি, যশোরে ৯টি, রংপুরে ২টি, রাজশাহীতে ২টি, চট্টগ্রামে ৫টি, ঈশ্বরদীতে ৪টি ও খুলনায় ৫টি ক্যাম্প রয়েছে। এসব ক্যাম্পের বসবাসকারীরা নাগরিক সুবিধা নিলেও এর বিপরীতে সেবামূল্য পরিশোধ করছে না।
সূত্র
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ ভোর ৬:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



