somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্লগের সূচনা ও বাংলা ব্লগ (দ্বিতীয় পর্ব)

১৩ ই অক্টোবর, ২০১২ রাত ১২:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম পর্ব

ব্লগের জনপ্রিয়তা পর্ব

১৯৯৯ সাল এবং তার পর থেকেই ব্লগ ব্যবহার বাড়তে থাকে। ১৯৯৮ সালের অক্টোবরে ব্রুস আবেলসন ‘ওপেন ডায়েরি’ (http://www.opendiary.com) নামের একটি কমিউনিটি সাইট চালু করেন। অনলাইনে দিনপঞ্জি লেখার সুযোগ করে দেয় ‘ওপেন ডায়েরি’। বর্তমানে পাঠকের অংশগ্রহণ, লেখক-পাঠকের মিথস্ক্রিয়াকে ব্লগের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘ওপেন ডায়েরি’-ই প্রথম কমিউনিটি সাইট যাতে একজনের লেখায় অন্য আরেকজন মন্তব্য করতে পারতেন। ১৯৯৯ সালের মার্চে ব্র্যাড ফিটজপ্যাট্রিক ‘লাইভ জার্নাল’ (http://www.livejournal.com) নামের একটি সাইট তৈরি করেন। এই সাইটটি অনলাইনে ব্যক্তিগত লেখা প্রকাশের সুযোগ করে দেয়। ওপেন ডায়েরি এবং লাইভ জার্নাল নামের সাইট দুইটির বৈশিষ্ট্য একটি এগ্রেগেটর বা প্রথম পাতা ছিল যেখানে সবার লেখা আসত। এখনও সাইট দুইটি চালু রয়েছে। তুলনামূলকভাবে লাইভ জার্নাল বেশি জনপ্রিয়। ১৯৯৯ সালের জুলাইয়ে এন্ড্রু স্মেলস চালু করেন ‘পিটাস.কম’। ১৯৯৯ এর সেপ্টেম্বরে চালু হয় ডায়েরিল্যান্ড, যেখানে ব্যক্তিগত দিনপঞ্জিমূলক ব্লগ কমিউনিটির ওপর জোর দেওয়া হয়। পাইরা ল্যাবসয়ের দুই প্রতিষ্ঠাতা ইভান উইলিয়ামস ও মেগ হুরিহান মিলে ১৯৯৯ সালের আগস্টে ব্লগার ডট কম চালু করেন। নিজেদের পণ্যকে জনপ্রিয় করে তুলতে ব্লগার ডট কমের আদলে যারা ব্লগ লেখেন তাদের নামকরণ করা হয় ব্লগার। ইভান উইলিয়ামস ও মেগ হুরিহান শব্দ হিসেবে ‘ব্লগার’কে জনপ্রিয় করে তুলেন। ব্লগার ডট কম চালুর পরেই ব্লগিং করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়। তাছাড়া ব্লগ ডিজাইনের পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্লগগুলো স্বক্বীয়তা পাওয়া শুরু করে। ব্লগার ডট কমের মাধ্যমেই ব্যক্তিগত ব্লগ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে গুগল ব্লগার ডট কম কিনে নেয়। তখন এটি ব্লগস্পট নামেও পরিচিতি পায়। বাংলা ব্লগিংয়ের শুরু হয় এই ব্লগস্পটের মাধ্যমে। ২০০৩ সালে অডিওব্লগার নামে একটি সাইট চালু হয়, যার মাধ্যমে অডিওব্লগিং সুবিধা পাওয়া যায়। ২০০৪ সালে ভিডিওগ্রাফার স্টিভ গারফিল্ড একটি ভিডিও ব্লগ সাইট চালু করেন এবং সেই বছরকে তিনি ‘ভিডিও ব্লগ বছর’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু হয় ‘ফ্লিকার’। এর মাধ্যমে ফটোব্লগ চালু করা সম্ভব হয়। ২০০৬ সালে চালু হওয়া টুইটার মাইক্রোব্লগিং বিষয়টিকে জনপ্রিয় করে তুলে। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে আনুশেহ আনসারি মহাকাশ থেকে ব্লগিং করেছেন (spaceblog.xprize.org/2006/09/page/6)।

বাংলা ব্লগের ইতিহাস

বাংলায় ব্লগ চালুর ক্ষেত্রে দুটি বিষয় জড়িত। এক. গুগল কর্তৃক ব্লগার ডট কম কিনে নেওয়া এবং দুই. ইউনিকোড বাংলা ফন্টের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি। ১৯৯৯ সালের ২৩ আগস্ট ব্লগার ডট কম যাত্রা শুরু করে। ২০০৩ ফেব্রুয়ারিতে গুগল ব্লগার ডট কম কিনে নেয়। তখন ব্লগার ডট কমকে জনপ্রিয় করে তুলতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয় গুগল। ধারণা করা হয় গুগলের প্রচারের ফলেই বাংলাভাষীরা ব্লগ সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠে। অন্যদিকে ১৯৯১ সালের অক্টোবরে ইউনিকোড স্ট্যান্ডার্ডে বাংলা স্ক্রিপ্ট যুক্ত হয়। তখন ১.০ সংস্করণ রিলিজ করা হয়। ২০০১ সালে ইউনিকোড বাংলা ফন্টের উন্নয়ন ঘটে। তবে বাংলা ইউনিকোড ফন্টের জনপ্রিয়তা পর্বের শুরু ২০০৩-০৪ সালের দিকে। বাংলা ইউনিকোড আর গুগলের ব্লগস্পট - এই দুইয়ের সম্মিলনেই যাত্রা শুরু করে বাংলা ব্লগ। বাংলাভাষী প্রথম ব্লগার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছেন কলকাতার সুকন্যা মজুমদার। তবে প্রথম বাংলা ব্লগসাইট হিসাবে যে সাইটটিকে (http://shonarbanglablog.blogspot.com) দাবি করা হয়েছিল তা এখন আর চালু নেই। ২০০৪ সালের এপ্রিলে সুকন্যা মজুমদার ও দেবাশীষ চক্রবর্তী মিলে ব্লগস্পটে বাংলা ব্লগ নামে একটি সাইট (http://banglatest.blogspot.com) চালু করেন। এই সাইটের মাধ্যমে তারা বাংলা ব্লগের প্রসারে কাজ করেন। সাইটটিতে তারা ২০০৪ সালের ৩ এপ্রিল ‘বাংলা ব্লগ কী ভাবে লিখবেন’ শিরোনামে একটি পোস্ট দেন। সেখানে ইউনিকোড ফন্ট ব্যবহার করে ব্লগস্পটে বাংলায় ব্লগ লেখার টিউটোরিয়াল দেওয়া হয়। ৪ এপ্রিল লেখাটি ‘Baby steps to a Bangla blog’ শিরোনামে ইংরেজিতে প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে সুকন্যা মজুমদার ও দেবাশীষ চক্রবর্তী একটি বাংলা ব্লগ ডিরেক্টরি তৈরি করেছেন (http://www.banglablogs.org)। সেসময় সুকন্যা মজুমদার ও দেবাশীষ চক্রবর্তী বিভিন্ন জনকে বাংলায় ব্লগ লেখার আমন্ত্রণ পাঠিয়েছেন বলে জানা যায়। এ ব্যাপারে প্রথম দিককার বাংলাভাষী ব্লগার রেজওয়ান ইসলাম লেখেছেন, “২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে কলকাতার দেবাশীষ ও সুকন্যা ব্লগস্পটে বাংলা ব্লগ শুরু করেন ও খুঁজে খুঁজে আগ্রহীদের আমন্ত্রণ জানান ও সাহায্য করেন শুরু করার জন্যে। আমার নিজের ইউনিকোড ও অন্যান্য বাংলা লিখন পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা ছিল না। আমার কম্পিউটারে তখন লেখো নামে একটি ইউনিকোড এডিটার ইনস্টল করে ব্লগে বাংলা লেখার চেষ্টা করলাম কিন্তু সেটি বেশ জটিল ছিল তাই আগানো সম্ভব হয় নি। ২০০৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বর প্রথম বাংলা ব্লগিং প্লাটফর্ম বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ (সামহোয়ার ইন) আত্মপ্রকাশ করলে বাংলা ব্লগিংয়ের ক্ষেত্রে নবদিগন্ত রচিত হয়। হাসিন ও এমরান বাংলার প্লাটফর্ম সমস্যার প্রথম বাঁধাটি ভাঙ্গে এমবেডেড এডিটর ব্যবহার করে। অনেকেই বাংলা টাইপিং জ্ঞান ও বাংলা কিবোর্ড ছাড়া ফোনেটিকে সহজে লিখতে সমর্থ হয়। ২০০৬ সালে ব্লগটি ইউনিকোড হলে পূর্নতা পায়। এর সাথে সাথে কিন্তু ব্লগস্পট ও অন্যান্য প্লাটফর্মে অনেকে লেখা শুরু করে ইউনিকোডের মাধ্যমে। (রেজওয়ান, বাংলা ব্লগ ও ব্লগ পলিটিক্স, সামহ্যোয়ারইন ব্লগ, ১১ আগস্ট ২০০৮)।

ব্লগস্পটের মাধ্যমে বাংলা ব্লগ শুরু হলেও তখন বাংলা ব্লগিং জনপ্রিয়তা পায়নি। সুকন্যা মজুমদার ও দেবাশীষ চক্রবর্তী যে ব্লগ ডিরেক্টরিটি তৈরি করেছিলেন তাতে ব্লগ তালিকাভূক্ত করার পদ্ধতি ছিল। তাতে ১৪৪টির মতো ব্লগ তালিকাভূক্ত হয়েছে। এর সবগুলোই ২০০৬ সালের পরে। এ থেকে ধারণা করা যায় ২০০৪ সালের দিকে বাংলা ব্লগ জনপ্রিয়তা পায়নি।

বাংলা ব্লগ কমিউনিটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সামহ্যোয়ারইন ব্লগ। ২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর সামহ্যোয়ারইন ব্লগ যাত্রা শুরু করে (আনুষ্ঠানিক তারিখ হিসেবে ১৬ ডিসেম্বরকে বিবেচনা করা হয়)। সামহ্যোয়ারইন ব্লগই প্রথম কমিউনিটি বাংলা ব্লগ। এমনকি সম্পূর্ণ বাংলায় তৈরি প্রথম ব্লগ সাইট হিসেবে সামহ্যোয়ারইন ব্লগকেই চিহ্নিত করা যায়। ব্লগার সুমন চৌধুরী লেখেছেন, “আমি বাংলা ব্লগিংয়ের শুরু বলে ধরতে চাই ২০০৫ সালের ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সামহোয়ারইনব্লগের জন্মকে। ইউনিকোডের তৎকালীন ঝামেলা এড়িয়ে সরাসরি বিজয়ে টাইপ করে ধুমধাম ব্লগিংয়ের আগাগোড়া বাংলায় প্রথম প্লাটফর্ম তৈরীর কৃতিত্ব তাদের। বাংলা ব্লগাবর্তের প্রথম ব্লগাররাও তৈরী হয় তাঁদের প্লাটফর্মকে ভিত্তি করে। এর দেড় বছর পরে আসে সচলায়তন আর প্যাচালী, আড়াই বছর পরে আমারব্লগ।” (সুমন চৌধুরী, নিয়মিত লেখা আর ব্লগের লেখা ৪, সচলায়তন, ২ সেপ্টেম্বর ২০০৮)। সামহ্যোয়ারইন ব্লগ চালু করা নিয়ে ব্লগটির পরিচালক সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা লেখেছেন, “বিশ্বে ব্লগসাইট শুরু হয়েছিল মূলত ইংরেজি ভাষায়। একসময় এমন কিছু সাইটে অন্য ভাষাভাষীদের জন্য সীমিত আকারে কিছু সুবিধা সংযুক্ত করা হয়। তবে একমাত্র বাংলা ভাষাকে উদ্দেশ্য করে একটা ওয়েব-ইঞ্জিন তৈরির ভাবনা সূচনা করে সামহ্যোয়ারইন। প্রথম পর্যায়ে প্রচলিত বাংলায় (যা ইউনিকোড সমর্থিত নয়) একটা পাটফর্ম তৈরি হয় ২০০৫, এবং ব্যবহারকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ২০০৫-এর ১৫ ডিসেম্বর। বাংলা ব্লগ তৈরির পূর্বে মূলত বাংলা ব্লগিং এর জন্য নিবেদিত একটা পাটফর্মের চাহিদা অনুভূত হচ্ছিল। ব্লগ সম্বন্ধে যারা পূর্ব থেকে পরিচিত তাদের সাথে সাথে ওয়েবের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা জনগোষ্ঠী ক্রমশ অনুভব করছিলেন যে মতামত-প্রকাশের জন্য ওয়েব হতে পারে তাদের স্বাধীনতার স্থান। কেবল প্রযুক্তি-জটিলতায় এর তৈরি ও ব্যবহার বিষয়ে পিছিয়ে পড়ছিল। বাংলা ব্লগ মূলত এই বিকল্প অথচ দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম পাটফর্মে বাংলা ভাষায় নিজের স্বাধীন মতামত প্রকাশে আগ্রহী জনগোষ্ঠীকে সুযোগ দিতে চেয়েছে। সহজে ও নিজের ইচ্ছেমত মাতৃভাষায় লেখার সুবিধা দেয়াই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।” (সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানা, সি নিউজ, ডিসেম্বর ২০০৯)। ২০০৬ সালের প্রথম ভাগেই সামহ্যোয়ারের জনপ্রিয়তা পর্ব শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক বছরের ব্যবধানে আরও অনেকগুলো বাংলা ব্লগ যাত্রা শুরু করে।

প্রথম বাংলা ব্লগসাইট

প্রথম বাংলা ব্লগ হিসেবে যে সাইটটিকে (http://shonarbanglablog.blogspot.com) মনে করা হতো সেটি এখন আর নেই। ২০০৪ সালের এপ্রিলে সুকন্যা মজুমদার ও দেবাশীষ চক্রবর্তী মিলে ব্লগস্পটে বাংলা ব্লগ নামে যে সাইটটি (http://banglatest.blogspot.com) চালু করেছিলেন তাকে বাংলা ব্লগের প্রথম দিককার সাইট হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এগুলোর কোনটিকেই পুরোপুরি বাংলা ব্লগ সাইট হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না নানা কারণে। দুটি সাইটেই বাংলা ইংরেজির মিশ্রন রয়েছে এবং দুটিই সাইট হিসেবে নিয়মিত নয়। যেমন বাংলাটেস্ট ডট ব্লগস্পট ডট কম সাইটে প্রথম পোস্ট দেওয়া হয় ২ এপ্রিল ২০০৪। তাতে বাংলা ইংরেজির মিশ্রন রয়েছে। দ্বিতীয় পোস্টটি বাংলায় দেওয়া হলেও ৪ এপ্রিল প্রকাশিত পোস্টটি সম্পূর্ণই ইংরেজিতে। ৪ এপ্রিলের পর সাইটটিতে আর কোন পোস্ট প্রকাশিত হয়নি। তাছাড়া পোস্টগুলোতে মন্তব্য করার উপায় নেই। সুকন্যা মজুমদার ও দেবাশীষ চক্রবর্তী পরবর্তীতে নিয়মিত বাংলায় ব্লগিং করেননি। দেবাশীষ চক্রবর্তী বর্তমানে হিন্দী ও ইংরেজিতে ব্লগিং করেন। অন্যদিকে সুকন্যা বর্তমানে ইংরেজিতে ব্লগিং করেন।

রেজওয়ান ইসলামের ব্লগটিকে (http://amibangladeshi.blogspot.com) বাংলা ব্লগিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাইট হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। রেজওয়ান ইসলামের ব্লগটির নাম ‘ছেঁড়া পাতায় কথামালা’। রেজওয়ান ইসলাম ২০০৪ এর এপ্রিলে বাংলায় ব্লগিং শুরু করলেও ইংরেজিতে ব্লগিং (rezwanul.blogspot.com) শুরু করেছেন ২০০৩ সালে। এ সম্পর্কে তিনি লেখেছেন, “সেটি ছিলো ২০০৩ সালের এপ্রিল মাসের কোন এক দিন। তখন ইরাক যুদ্ধের গরম খবরে পূর্ন পত্রিকাগুলো। হঠাৎ দেখলাম সালাম পাকশ এর ওয়েবলগ সম্পর্কে একটি লেখা। ওটি ছিলো ব্লগার এ হোস্ট করা। সালাম এবং অন্যান্যদের লেখা পড়ে আমার অন্য একটি জগৎ উন্মোচন হলো। আমার মনে হলো আমারও অনেক কিছু বলার আছে। উৎসাহী আমি নিজেই একটি ওয়েবলগ শুরু করলাম 'তৃতীয় বিশ্বের চোখে'। প্রথম দিকে আমার যাত্রা ছিল উদ্দেশ্যবিহীন। তারপর লক্ষ্য করলাম যে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিদেশীদের তেমন একটা ধারনা নেই। শুধু হেডলাইনে পড়া খারাপ খবরগুলো (বন্যা, দারিদ্র্য, মৌলবাদ) দিয়েই দেশের পরিচয়। এদেশের মানুষদের তো আর সেই ভুল ভাঙানোর তেমন সুযোগ নেই । তখন মনে হলো ওয়েবলগ হতে পারে বাংলাদেশীদের সেই কণ্ঠস্বর।” (রেজওয়ান, ওয়েবলগের জগৎ, সামহ্যোয়ারইন ব্লগ, ১৮ ডিসেম্বর ২০০৫)।

‘ছেঁড়া পাতায় কথামালা’ শিরোনামের ব্লগসাইটে রেজওয়ান ইসলাম প্রথম পোস্ট দিয়েছেন ২০০৪ সালের ৮ এপ্রিল। তবে সেই পোস্টে শিরোনাম ছিল ইংরেজিতে- ‘This is a test’। পোস্টের লেখা ছিল- “Hello World আমি ভালো আছি”। ২০০৪ সালের এপ্রিলে তিনি মোট ২ টি পোস্ট করেছিলেন। দুটিই বাংলা-ইংরেজির মিশ্রনে। ২০০৪ সালে আর কোন পোস্ট প্রকাশ করেননি রেজওয়ান। ২০০৫ সালে রেজওয়ান ইসলাম মোট ৫টি পোস্ট প্রকাশ করেন (জুন মাসে ৪টি ও জুলাইয়ে ১টি)। ২০০৫ সালের ৭ জুন প্রকাশিত পোস্টটি বাংলা ব্লগিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্লগিং ধারণার সঙ্গে যে দিনপঞ্জির সম্পর্ক রয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় পোস্টটি থেকে। পোস্টটির শিরোনাম ‘উদাস মন’। তাতে রেজওয়ান ইসলাম লেখেছেন, “আজ আমার খুব উদাস লাগছে। আবহাওয়াটা কেমন যেন। বাইরে কাঠ ফাটা রোদ্দুর। অফিসের ভিতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রন যন্তর কাজ করছে কিনতু আমার মনকে ঠান্ডা রাখতে পারছে না। খালি মনে হচ্ছে আমি এসব কি করছি কেন করছি। যদি হতাম একটি পাখি তাহলে মেঘের দেশে খালি ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম। কোন চিন্তা থাকতো না ভাবনা থাকতো না। খালি দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়াতাম।” ২০০৬ সালে রেজওয়ান ৩৯টি পোস্ট দিয়েছেন। সেসময় তিনি একটি ব্লগ ডিরেক্টরি তৈরি করেছিলেন।

প্রথম কমিউনিটি বাংলা ব্লগসাইট

প্রথম বাংলা কমিউনিটি বাংলা ব্লগসাইট সামহ্যোয়ারইন ব্লগ। ২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুপুর ২টা ২৬ মিনিটে ব্লগার দেবরার “ইমরান ব্লগ স্রষ্টা” শিরোনামের পোস্টের মাধ্যমে শুরু হয় এই সাইটের যাত্রা। সামহ্যোয়ারইন ব্লগ চালু করার প্রস্তুতিপর্ব সম্পর্কে জানা যায় ব্লগসাইটটির পরিচালক সৈয়দা গুলশান ফেরদৌস জানার বক্তব্য থেকে। তিনি বলেছেন, “২০০৪ সালের মার্চ মাসের একটি সকালে কাজের ফাঁকে mannfred mann`s earthband এর "somewhere in Africa" গানটি শুনতে শুনতেই মাথায় ‘somewhere in...’ গেঁথে যায়। ভাবনার শুরু হয় সামহোয়্যার ইন থেকেই। ভেবেই বসে ছিলাম না। কাজ শুরু করি পূর্ণ উদ্যোমে। ১ মে ২০০৫; আমাদের স্বপ্নকে সত্যি করে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেল সত্যিকারের সামহোয়্যার ইনের পরিকল্পনা। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া, লোকাল কমিউনিটি ইত্যাদি বিষয়গুলো মাথায় রয়েই যায়। ব্লগ, মার্কেট প্লেস, সিটিজেন নিউজ, ভ্রমণ সাইট, ইভেন্টস ইত্যাদি নিয়ে দুজন মিলে নানান পরিকল্পনা চলতে থাকে প্রতিদিন। ২০০৪ এর জুনে আমরা একটি কমিউনিটি ব্লগ প্ল্যাটফর্মের কথা ভাবি এবং সর্বস্তরের বাংলা ভাষাভাষির অংশ গ্রহণের কথা মাথায় রেখে তা বাংলাতেই হবে বলে সিদ্ধান্ত নিই।” কমিউনিটি ব্লগিংয়ের যাত্রাপর্ব সমন্ধেও ধারণা পাওয়া যায় জানার বক্তব্য থেকে। তিনি বলেছেন, “প্রকৃতপক্ষে ‘ব্লগিং’ ধারণাটি তখনও ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। জনমত তৈরির মূলধারার মাধ্যমগুলোতে যখন দ্বিপাক্ষিক অংশগ্রহণ সম্ভব নয় তখন দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রাত্যহিক জীবনের আলাপচারিতায় সর্বসাধারণের অংশ গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ দিকটি মাথায় রেখে এই বাংলা কমিউনিটি ব্লগিং এর শুরুটা করে দেয় সামহোয়্যার ইন। এ ক্ষেত্রেও সাফল্যের শুরুটা সেই হাতে গোনা কজন ব্লগারকে দিয়েই। কেননা আমরা সেই অল্প কজন ব্লগারকে খুঁজে নিয়ে তাঁদের সাথে পরিচিয় করিয়ে দিয়েছি এই প্ল্যাটফর্মটিকে।” (সৈয়দা গুলশান ফেরদোস জানা, জাতীয় স্বার্থে সোচ্চার হতে শেখায় ব্লগ, বাংলানিউজ, ১৮ ডিসেম্বর ২০০১)।

[একুশে বইমেলা ২০১২ তে শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত 'বাংলা ব্লগের ইতিবৃত্ত' বই থেকে]
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০১২ রাত ১২:৫২
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পুলিশও মানুষ, তাদেরকে সাহায্যের জন্য আমাদেরও এগিয়ে আসা জরুরী

লিখেছেন মাহমুদুল হাসান কায়রো, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ রাত ১:৪৩

রাত বারোটা বেজে ১০ মিনিট। কাকরাইল চৌরাস্তায় একটা “বিআরটিসি এসি বাস” রঙ রুটে ঢুকে টান দিচ্ছিলো। কর্তব্যরত ট্রাফিক অফিসার দৌড় গিয়ে বাসের সামনে দাড়ালেন। বাস থেমে গেল। অফিসার হাতের লেজার... ...বাকিটুকু পড়ুন

অবশেষে দৈত্যের পতন

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ রাত ২:৩১



ট্রাম্প দেশের ক্ষমতা হস্তান্তরকারী সংস্হাকে কাজ শুরু করার অর্ডার দিয়েছে; আজ সকাল থেকে সংস্হাটি ( জেনারেল সার্ভিস এজনসীর ) কাজ শুরু করেছে, নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের লোকেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটার তো বাহাদুরি মমিনরা নিল, বাকি ভ্যাকসিন গুলোর বাহাদুরি তাহারা নেয় না কেন?

লিখেছেন এ আর ১৫, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ সকাল ৮:৫২



বাহাদুরির বিষয় হলে যারা ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাড়াবাড়ি শুরু করেন, তারা জবাব দিবেন কি?
কার্দিয়ানিরা মুসলমান নহে কিন্তু যেহেতু বাহাদুরির বিষয় তাই ডঃ সালাম হয়ে গেলেন মুসলমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

নভোনীল পর্ব-১৪ (রিম সাবরিনা জাহান সরকারের অসম্পূর্ণ গল্পের ধারাবাহিকতায়)

লিখেছেন ফয়সাল রকি, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:৫১



- ময়ী, ময়ী! আর কত ঘুমাবি? এবার ওঠ।
দিদার ডাকতে ডাকতে মৃনের রুমে ঢুকলো। মৃন তখনো বিছানা ছাড়েনি। সারারাত ঘুমাতে পারেনি। ঘুমাবে কী করে? রাজ্যের দুঃশ্চিন্তা ভর করেছিল ওর... ...বাকিটুকু পড়ুন

পৌষের চাদর – মাঘের ওভারকোট

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৩৬




চাদর ম্যানেজ করতে পারতাম না বলে কায়দা করে প্যাচ দিয়ে একটা গিটঠু মেরে দিলে আমি দৌড়ানোর উপযুক্ত হতাম । লম্বা বারান্দা দিয়ে ছুটতাম । অবাক চোখে পৌষের কুয়াশা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×