যাত্রার আজ অষ্টম দিন ৷ নতুন দিল্লীতে আছি ৷ পাহাড়গঞ্জ এলাকার হোটেল ভাড়া দেখছি কলকাতা থেকেও কম ৷ সাতশ টাকায় এসি সহ ডাবল বেডের রুমে আছি ৷ সিঙ্গেল বেড আরও কম ৷ আর এর থেকেও কম মানে ৩০০-৪০০ টাকায়ও পাওয়া যায় ৷ এ রুমগুলোর কথাটা বলার কারণ এগুলোও অতটা খারাপ নয়, আর আমরা যেটাতে আছি ওটাতে রুম সার্ভিস, ওয়াই-ফাই, ড্রিঙ্কিং ওয়াটার, কোল্ড এন্ড হট ওয়াটার ফর বাথ, টিভি উইথ ৫০০ চ্যানেলস, লন্ড্রি (পেইড সার্ভিস) সহ কত কী ! তাছাড়া রেস্টুরেন্ট এবং ইনস্ট্যান্ট ফোন অর্ডার, ট্যাক্সি সার্ভিস, ট্রেন বুকিং, মানি চেঞ্জার তো আছেই ৷ সবকিছুর জন্য ৭৫০ টাকা প্রতিদিন! এতটা ভাবিনি আমি ৷
এবারে নতুন দিল্লীর কথা বলি ৷ ভারতের রাজধানী আসলেই ৷ মেট্রোরেল (টিউব), এসি বাস সার্ভিস (খুবই কম ভাড়া), ট্যাক্সি(খরচ অনেক), সিএনজি(ভাড়া রিজনেবল, মিটারে যা আসে তাই), ঘোড়াগাড়ি, এমনকি গরু গাড়ি পর্যন্ত আছে ! রিক্সা, ব্যাটারি রিক্সাও আছে ৷ নতুন দিল্লীতে লিকার (ওয়াইন, হুইস্কি, বিয়ার প্রভৃতি) লেজিটিমেট, মানে আইনত প্রাপ্ত বয়স্ক সবাই বিনে বাধায় কিনছে ৷ আর ভোটের রেজাল্টের দিন 'ড্রাই ডে' বলে তার আগের রাতে লোকে হুড়মুড়িয়ে কিনছে ৷ মানুষ এত উৎসাহের সহিত ওরা এসব খায় ! আমি তো ভাই কোক পর্যন্ত খাই না (আম্মু মানা করেছে), অগত্যা আমের জুস(মাজা
এবার আসি দিল্লীর কথায়, মানে আসল দিল্লী, পুরনো দিল্লী ৷ রেড ফোর্টে গিয়ে আমার মাথা সত্যি খারাপ হয়ে গিয়েছিল ৷ কী অসাধারণ স্থাপত্য ! আমার আনাড়ি চোখেও ওর শিল্পের গুণে মুগ্ধ ৷ ওতে একটা অডিও ভিজ্যুয়াল শো হল ৷ বেশির ভাগ কথায়ই উর্দুতে বলে বেশি বুঝিনি ৷ শাহজাহান যে বাকি সব স্থাপত্যের মত এটাও বানিয়েছেন তা জানলাম ৷ উনার মেয়ে চাঁদনি চক মার্কেটের উদ্যোক্তা তাও জানলাম ৷ দিল্লী জামে মসজিদ, রাম মন্দির দেখা হল ৷ চাঁদনি চকে খাওয়া হল ! পানি পুরীও খেলাম ৷ সঙ্গীদের বোঝাতে পারলাম না পানি পুরী আর ফুচকা এক নয় ৷ দিল্লী স্টেশন আর নতুন দিল্লী স্টেশন আকাশ পাতাল তফাৎ; একটা শিল্পের ধারক কিন্তু বাহক নয়, আরেকটা নতুনকে আষ্টেপৃষ্ঠে মুড়িয়ে আছে ৷ মেট্রোরেলের স্টেশনগুলো অস্বাভাবিক সুন্দর ৷ আমাদের বাস স্ট্যান্ডগুলোর দুরাবস্থা বোধ হয় এই ভাল লাগার একটা কারণ ! রাস্তাগুলো কী পরিষ্কার! বিশেষ করে, চাণক্যপুরী, রাজিভ চক, প্যাটেল চক, ইন্ডিয়া গেট, রাইসিনা রোড, রাফি মার্গ, কেন্দ্রীয় সচিবালয়, লোকসভা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, প্রেসিডেন্ট প্যালেস, মাওলানা আজাদ রোড এলাকাগুলো ৷ জনপথে এসে হাঁটতে গিয়ে সারাদিনের কষ্ট আর মনে নেই ৷ নতুন দিল্লীর সব থেকে ভাল দিক বোধহয় গাছ ৷ ঢাকায় গাছগুলো যদি পানির কারণে না মরে যেত তাহলে হয়ত আমরাও ৷ বাসে বসে ইন্ডিয়ান আর্মির এক ক্যাপ্টেন সুচা সিংয়ের সাথে কথা হল ৷ ভদ্র লোক, পাঞ্জাবিরা এত ঠাণ্ডা গলায় কথা বলতে পারে জানা ছিল না, চায়না সীমান্তে ছিলেন এখন নতুন দিল্লীতে কাজ করেন ৷ এক সময় আসলাম ইন্ডিয়া গেটে ৷ এ এক আলাদা ব্যাপার ৷ ইন্ডিয়ান বহু লোক এসেছে ঘুরে দেখতে তাদের স্বাধীনতার প্রতীক এ স্তম্ভে ৷নিজ চোখে এ জায়গা দেখা হয়নি যে আগে এদের অনেকেরই ! নতুন জমানার ইন্ডিয়ানরা এসে দেখলাম গানের কলি খেলছে ! স্বাধীনতা উদযাপনের কত রূপ এরা দেখাবে ৷ জিজ্ঞেস করতেই একজন বলল ছুটির দিনে ঘুরতে এসেছে ৷
এরপর সোজা হেঁটে গেলাম প্রেসিডেন্ট প্যালেস ৷ জায়গাটা নাকি ৮০০ একরের উপর! ৮০০ একর, ২৪০০ বিঘা, ৪৮০০০ কাঠা! কি করে পারে এরা! তারপর নর্থ ব্লক আর সাউথ ব্লক দেখলাম ৷ সাউথ ব্লকে প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বসেন ৷ নর্থ ব্লকে বসেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রী ৷ পাশেই লোকসভা, সামনে রাইসিনা রোড; পাশে জনপথ রোড ৷ ১০ জনপথে থাকেন সোনিয়া গান্ধী ৷ সুনসান হয়ে আছে ৷ অথচ রাইসিনা রোড পার হয়ে যে সেন্ট্রাল সেক্রেটেরিয়েট আছে, কস্তুরিবা গান্ধী মার্গে বিজেপির সমর্থকেরা উল্লাস করছে ৷ কালকেই হয়ত প্রণব বাবু মোদিকে চিঠি পাঠাবেন ৷ কী আশ্চর্য, একটা দেশের ক্ষমতার পালাবদল চাক্ষুষ করছি ! ওদের এত বড় বড় কার্যালয়গুলো সবার জন্য উন্মুক্ত, আমাদের অনেক দূর রোড থেকেই ব্লক করে রাখে ৷ যা হোক এই এলাকাটা অনেক প্রাঞ্জল, লোকারণ্য ৷ আধুনিক নারীরা হাঁটুর উপর স্কার্ট বসে সবুজ মাটি পেয়ে শুয়ে আছে, পাশেই বোরখা পরা এক নারী তার ছেলেকে নিয়ে দেখতে এসে আশ্চর্য হচ্ছে ৷ আমি ইন্ডিয়া গেট বলুন, আর প্রেসিডেন্ট হাউস বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বলুন কিছুই জানতাম না ৷ পুলিশকে জিজ্ঞেস করতেই স্যার বলে সম্বোধন করে বলে দিল ৷ পুলিশের ব্যবহার কলকাতায় আর নতুন দিল্লীতে পুরোই আলাদা ৷ এখানকার পুলিশ অনেক সাহায্যপরায়ণ, সহিষ্ণু এবং হাস্যোজ্জল ৷ কলকাতায় বা ঢাকায় এটা সম্ভব নয় বোধহয় ৷ আগে বলেছিলাম ঢাকা কলকাতা থেকে এগিয়ে তবে এবারে স্বীকার করছি, নতুন দিল্লী আমাদের সাথে রেসেই নেই ৷ কতটা যে এগিয়ে আছে ! পুরনো, নতুন দিল্লীর সবকিছুই ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু এই ক্রমে লেখা ৷ সবকিছুই ৷ এতকাল পরে এসেও ওরা উর্দু লেখে, পড়ে, পত্রিকা বের করে ৷ সব কিছু কী করে যুগের পর যুগ পাশাপাশি থাকতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ দিল্লী ৷ গাছের এক পাশে এক যোগি বসে আছেন, ঐ প্রান্তে জায়-নামাজ পাতা রয়েছে ! লোকগুলো ধর্ম-কর্ম করে বেমালুম মিশে যাচ্ছে ৷ নদীর দুটো শাখা যেন সাগরে আবার মিলে গেল !
সে হিসেবে দিল্লী (পুরনো) অনেকটাই পিছিয়ে ৷ এখানে মেট্রোরেলের স্টেশনে চাকচিক্য নেই, বাজার নোংরা(কিন্তু খাবার অসাধারণ!), রাস্তাঘাট অসম্পূর্ণ, ফ্লাইওভারের কাজ হয়ত শুরুই হয়েছে গত বছর ৷ লোকজনের আচারও কেমন, অনেক অ্যান্টিস্যোশাল পার্কের পাশে বসে নেশা করছে ৷ অথচ পণ্ডিত নেহেরু পার্ক দেখে লোকে তাজ্জব বনে যাবে ৷ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ৭ রেসকোর্সে ৷ দেখা হয়নি, যাওয়ার ইচ্ছে আছে ৷ চাঁদনিচকে খেলাম, ভাল কিন্তু দামটা একটু বেশিই ৷ খাওয়ার কথা যখন চলেই এল নতুন দিল্লীতে আমার সেরা খাওয়ার জায়গা মনে হয়েছে সাই বাবা ভোজনালয়, নতুন দিল্লী রেলওয়ে স্টেশনের সামনেই ৷ এসি আছে, তবে চাকচিক্য নেই ততটা ৷ কিন্তু খাওয়ার মান সেরা, দাম কম ৷ পিওর ভেজিটেরিয়ান রেস্টুরেন্ট কিন্তু ডোমিনোজ পিজায় যে ঠকেছি তার থেকে ঢের ভাল ৷ আলুর দম, আলু জিরা, চানে কি ডাল (চানার ডাল), পরোটা, ভাত যা-ই খান ভাল লাগবে ৷ একবারের বেশি অর্ডার দেয়া লাগবে না, উল্টো বেঁচে যাবে ৷ পরিমাণে এতই বেশি যে আমারও থেকে যায় প্রায় প্রত্যেক আইটেম ৷ আসলে একবার খাবেন ৷ আশা করছি খারাপ লাগবে না ৷ এ শহরে ঠাণ্ডা জল ২ টাকা, লেবু পানি ১০ টাকা, লেবু-চিনি পানি ১৫ টাকা ৷ দিল্লীর সব খাবারে টক দিবেই ৷ আমার টক খাওয়া হয় না, তাই পুরো স্বাদ পাওয়া হয় না ৷ আমার বোন যদি সাথে থাকত কত যে ভালবেসে খেত ৷ ওর আবার এক খাওয়ার সাধ খুব ৷ মিস করছি অনেক ওকে ৷ যাক সে কথা ৷ দিল্লীর মেয়ে দেখতে পাইনি, বেশির ভাগই বোরখা পরেন ৷ নতুন দিল্লীর মেয়েরা অস্বাভাবিক সুন্দরী, আর চাল-চলনে এগিয়ে গেছে বহুত ৷ লোকজনের ব্যস্ততা অনেক এ শহরে, পিক আওয়ারে মেট্রোতে লোকের ভিড় দেখলে বোঝা যেত ! পাঞ্জাবি অনেক, ইউপির লোকেরা এসে একটু নীচের দিকের কাজ করছে ৷ সে তুলনায় বাঙালি নেই ৷ প্রণব বাবু বোধহয় এ শহরে বড্ড একা !
হোটেল ভাল, খাবার ভাল, লোকগুলো ভাল ৷ অভিজ্ঞতা নতুন ৷ শেষ হয়ে আসছে সময় ৷ আজকের লেখাটা তিন দিনের রিকালেকশন ৷ আরও আছে ৷ এক লেখায় দিতে পারলাম না ৷ এ শহরের জন্য একটা লেখা কিছুই নয় ৷ তবে একটা সিদ্ধান্তে আসতেই পারি - পুরনো দিল্লী এখনো দিল্লীই রয়ে গেছে, নতুন দিল্লী ডেলি হয়ে গেছে ৷ মানুষগুলোও কেমন যেন অচেনা নতুনে ৷ পুরনোয় গেলে মনে হয়, "এ দিল্লী হে মেরে ইয়ার, বাস ইস্ক মোহাব্বাত পেয়ার ৷
মে ১৬, ২০১৪
রাত ১১ টা বেজে ৩০
হোটেল লর্ডস, পাহারগঞ্জ,
নতুন দিল্লী ৷

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


