ভিন্নমতের মাধ্যমে ভাল সমাধানের সুযোগ থাকে। ভিন্নমত থাকা মানেই যুক্তির খেলা। ভিন্ন মতে নতুন কিছু বের হয়ে আসে।একজন অন্যজনের সাথে সহমত হতে পারেন যেমন, ঠিক তেমনই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কিন্তু আমাদের দেশের প্রায় সবাই দ্বিমত সহ্য করতে পারেন না ।ব্যক্তি জীবন থেকে জাতীয় জীবন, রাজনৈতিক জীবন থেকে ধর্মীয় জীবন কোথাও কেউ দ্বিমত গ্রহন করতে পারেন না। এর পিছনে আমার একটা অবজারভেশন আছে।একটি কারন হতে পারে এমন; বৃটিশ শাসিত এই উপমহাদেশ,তাই বৃটিশদের কিছু বৈশিষ্ট্য এই উপমহাদেশের মানুষের মাঝে প্রবাহমান। বৃটিশরা “ইয়েস স্যার” নীতিতে আসক্ত।সেটি এখন বাঙালি রক্তে ধারণ করে। অধস্তন সব সময় উচ্চস্তরের মানুষের সাথে একমত হবেন এটাই “ইয়েস স্যার” নীতিরর প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য।এতে করে বিশাল এক তৈলবাজ জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটে।যাতে করে সৃজনশীলতা নষ্ট হয়, জাতি হয় অন্তঃসার শূন্য। আমি একজনের সাথে একমত নাও হতে পারি তাই বলে তাকে অশ্রদ্ধা করতে পারি না।এটা ঠিক হবে না । সবার উচিৎ সহনশীল হওয়া।ভিন্নমত পর্যালোচনার মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধান করা। আসুন আমার সাথে দ্বিমত পোষন করুন যুক্তি দিয়ে- এই চর্চা থাকা উচিৎ একটি সুখি, সমৃদ্ধ দেশ গড়ার জন্য।
আমরা লক্ষ্য করছি যে সবাই কেমন প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠছে। কিছু হলে ধরো তকতা মারো পেরেক অবস্থা। ধর্মীয় অসহিষ্ণতা তো চরমে উঠেছে। ওই বেটা মালায়নের বাচ্চা এমন কথা শোনেনি এমন কোন হিন্দু পাওয়া যাবে না। অথচ এই বঙ্গভূমিতে আজ যারা মুসলমান তাদের সবাই এসছে সনাতন ধর্ম থেকে পরিবর্তিত হয়ে। তাহলে এমন প্রতিক্রিয়াশীল কেমন করে হলাম আমরা যাদের পূর্ব পুরুষ হিন্দু ছিল? কেউ একজন নাস্তিক, সে লিখেছে স্রষ্টা বলে কিছু নেই, তাতেই ঝাপিয়ে পড়ল একদল মানুষ চাপাতি নিয়ে। কিন্তু তারা জানেনা যুক্তিতর্ক বলে একটা বিষয় আছে। নাস্তিকের এক কলমের জবাব তুমি হাজার কলমে দাও, সে একটা বই লিখলে তুমি দশটা বই লেখ। তোমার লিখতে সমস্যা কোথায়? আমরা আমাদের বিশ্বাস কলম দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করব। আমি মুসলিম আমার বিশ্বাস অবশ্যয়ই কলম দিয়ে যুক্তি সহ লিখব।যদি না জানা থাকে কোন বিষয় তবে অবশ্যয়ই পড়াশোনা করে লিখব। দরকার হলে সময় নিব। আমার হাতে কলম আছে, বুক সেলফে কোর'আন আছে, আরো আছে বহু মুনিষীর বই, আছে বিজ্ঞানের বই। তাহলে আমাকে কেন চাপাতি ধরতে হবে?
আমাদের দেশ একটি যুক্তিহীন জাতি তা আমি মানি না। মুক্তিযুদ্ধ আমরা করেছি যুক্তি ও আবেগ দিয়ে। নানান পথপরিক্রমায় এখন আমরা এই পর্যায় এসে পৌছেছি। আমরা যুদ্ধ করেছিলাম, কারন আমাদেরকে নিপীড়ন করা হচ্ছিলো সর্বদিক দিয়ে। পাকিস্তানিরা অস্ত্র নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিল আমাদের নিরীহ মানুষের উপর। আমরাও তাদের অস্ত্রের পালটা জবাব দিয়েছিলাম। অথচ আজ আমাদের একটি অংশ কলমের জবাব কলম দিয়ে দিতে জানেনা! এটা কি জ্ঞানের অভাব? হ্যা অবশ্যয়ই জ্ঞানের অভাব।জ্ঞান ও সততার সংকট হলেই মানুষ অস্ত্র ধরে।
আমরা এখন একটি অস্থির সময়ের মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে কেউ কারো কথা শুনছি না, শুধু বলেই যাচ্ছি যা ইচ্ছে। মনে হচ্ছে যুক্তিহীন তর্কে আমরা একে অপরকে হারাতে চাচ্ছি। কিছু বোঝার আগেই অনর্গল বলে যাচ্ছি। গ্রাম বাংলার একটা গল্প মনে পড়ে এ ক্ষেত্রে। এক স্ত্রী তার পতির সাথে যুক্তিতে না জিততে পেরে বলেছিল “কানে বেধে দিব ঢেঁকি”। পাসের একজন জিজ্ঞেস করেছিল এর মানে কি? তখন সেই স্ত্রী বলেছিল তর্কে না জিততে পারি কান তো ভারি হলো। আমার মনে হচ্ছে সেই রকম একটি সময় আমরা পার করছি। এই মনোভাব যে কোন শান্তিপূর্ণ সমাধানে অন্তরায়। নতুন করে আবার ভাবতে হবে এই সমাজ নিয়ে। স্বাধীণতা সংগ্রামের অন্যতম কারন ছিল আমাদের যুক্তিসঙ্গত দাবিগুলো পশ্চিম পাকিস্তানিরা মানতে চাচ্ছিল না। সেদিন আমরা যুক্তিসঙ্গত কারনে নিজেদের মত করে স্বাধীণ হতে চেয়েছিলাম এবং সেই যুক্তি ও আবেগ ধারণ করেই আজ আমরা মুক্ত। আমাদের যুক্তি ও আবেগ দুটোই ছিল সেদিন। যুক্তিহীন আবেগের দাম নেই।তাই আমাদের সবাইকে যুক্তি দিয়ে যেমন দ্বিমত পোষণ করতে হবে ঠিক তেমনই যুক্তি দিয়েই দ্বিমত কে একমতে পরিণত করতে হবে অথবা সেই দ্বিমত অধিকতর শ্রেয় হলে সেটাকে গ্রহন করতে হবে।
তানজির খান
কবি,ব্লগার ও নাগরিক সাংবাদিক
ইমেইলঃ [email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জানুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




