
করিম সাহেব সরকারি ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার। আগেকার দিনের ভাষায় ছাপোষা কেরানি। একদিন করিম সাহেবের ঘর আলোকিত হল সুমন নামের তার ফুটফুটে ছেলের জন্মের মধ্যদিয়ে।
পৃথিবীতে জন্মের প্রথম দুই বছর মানুষের চেয়ে অসহায় কোন প্রাণী নেই। সৃষ্টির অন্যান্য প্রাণীরা জন্মের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই উঠে দাড়াতে শেখে। অথচ একজন মানুষকে নিজের পায়ের উপর ভর দিয়ে দাড়াতে দেড় থেকে দুই বছর লেগে যায়। এই দুই বছর করিম সাহেবের স্ত্রীকে কি অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছে তা শুধুমাত্র একজন মা ছাড়া পৃথিবীর কেউই উপলব্ধি করতে পারবে না। আর মাতৃ গর্ভের কষ্টের কথা বোঝানো সাধ্য কারই বা আছে।

ছেলে বড় হওয়ার সাথে সাথে মা বাবার দায়িত্বও বাড়তে থাকে। সুমনের খাওয়া দাওয়ার খেয়াল রাখা স্কুলে আনা নেওয়া করা আরো কত কি? ছেলের সুশিক্ষার জন্য করিম সাহেব এবং উনার স্ত্রীর চেষ্টার অন্ত নেই ।ছেলেকে ভাল স্কুলে ভর্তি করার জন্য প্রথমেই তিন লাখ টাকা ডোনেশন গুনতে হল। ভাল টিচার বাসায় রেখে পড়ানোর জন্য মাসে ৫ হাজার টাকা গুনতে হয়। নিজের শার্ট প্যান্টের বয়স ৩-৪বছর হলেও সেদিকে তাকানোর সময় নেই কিন্তু সন্তানের জন্য প্রতিমাসে নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করা চাই ই।

একসময় তার সন্তান স্কুলের গন্ডি পার হয়ে কলেজ জীবনে পদার্পণ করে। নাকের নিচে তার সরু গোফের রেখা, তখনি বাবার কাছে আবদার একটি দামী স্মার্ট ফোন চাই। করিম সাহেবের আপত্তি থাকলেও ছেলের মায়ের চাপাচাপিতে ক্রেডিট কার্ড থেকে লোন নিয়ে কিনে দেওয়া হল ছেলের জন্য দামী স্মার্ট ফোন। ক্রেডিট কার্ডের এই টাকা শোধ করার কথা চিন্তা করে করিম সাহেব যখন ব্লাড প্রেশারের চাপ সামলাতে ব্যস্ত, তখন ছেলে বাপের টাকায় গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে গুলশানের চাপ সামলাও রেস্টুরেন্টে সেল্ফি তোলায় ব্যস্ত।


ছেলে একসময় ইন্টমিডিয়েট পাশ করলো। রেজাল্ট জিপিএ ৪.৫। এই রেজাল্টে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চ্যান্স পাওয়া সম্ভব নয়, কিংবা ছেলের ইচ্ছাও নেই পাবলিকে পড়ার। পাবলিকে পড়বে ছোটলোকের ছেলেমেয়েরা। ছেলে পড়তে চায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে।

ওদিকে করিম সাহেবের গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে ৫০০টাকায় কেনা জুতাটাকে অপারেশন করতে করতে মুচি বলে দিয়েছে এই জুতার জন্য এটাই শেষ অপারেশন। করিম সাহেবের স্ত্রীর শাড়ি ব্লাউজগুলোর যা তা অবস্থা,তিনি তার স্ত্রীকে বললেন তোমাকে একটা নতুন শাড়ি কিনে দেই। তখন উনার স্ত্রীর উওর,আমার শাড়ি নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, সুই দিয়ে একটু সেলাই করে নিলেই হবে। তুমি আমার ছেলেকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ভর্তি করে দাও।

একসময় ছেলের পড়াশুনা শেষ,চাকুরীও পেয়ে গেছে।এদিকে বাবার চাকুরীও শেষ,চাকুরীর শেষে যা বেনিফিট পেয়েছিলেন ছেলেকে পড়াতে এবং হাতখরচ দিতে গিয়ে যে লোন হয়েছিল তা শোধ করতে গিয়ে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ওদিকে ছেলের গার্ল ফেন্ড ছেলেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। অতঃপর করিম সাহেব ছেলেকে বিয়ে করিয়ে দিলেন। শুরু হল ছেলের সুখের সংসার। কিন্তু এত পুরানো বাসা ছেলের বউয়ের মনে ধরছে না। তাই নতুন বাসা নিলো ছেলে। কিছুদিন পরই ছেলের বউয়ের আচরণ পাল্টাতে শুরু করলো।

ছেলে বাবা মাকে গ্রামের বাড়ি চলে যেতে অনুরোধ করলো। কিন্তু ছেলেতো জানেনা গ্রামের বাড়ির সব সম্পত্তি তার পড়াশুনার পিছনেই ব্যয় হয়ে গেছে। অতঃপর বাবা মায়ের আশ্রয় হল বৃদ্ধাশ্রমে।করিম সাহেব ও তার স্ত্রী শেষ জীবনটা বৃদ্ধাশ্রমে বসে মৃত্যুর প্রহর গুনতে লাগলেন।

ছবি: গুগল
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই এপ্রিল, ২০১৮ রাত ৮:৩৪