somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

তরুন ইউসুফ
কাব্যগ্রন্থ : ট্রাফিক সিগন্যালে প্রজাপতি, না গৃহী না সন্ন্যাসী; রম্যগল্পগ্রন্থ : কান্না হাসি রম্য রাশি। ছোটদের বই : রহস্যে ঘেরা রেইনফরেস্ট ইতিহাস গ্রন্থ: শেরে বাংলা ও যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন কিছু দুষ্প্রাপ্য দলিল

‘গালি বিষয়ক কথকতা’

২৩ শে মার্চ, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমার এক বড় ভাই কোরানের হাফেজ । ছোটবেলায় উনি আমার গুরু ছিলেন । আম চুরি জাম চুরির গুরু । তার মাথায় হেভি হেভি সব দুষ্টু আইডিয়া আসতো । দুষ্টুমির কারনে আমার কাকা তাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়েছিলেন এবং তার অসাধারণ দুষ্টু বুদ্ধির জন্যই আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম । হাফেজ হওয়া সত্ত্বেও এখনও কিছু কিছু দুষ্টুমি তার মাথায় ভর করে । তবে সেগুলো সবই নিরীহ টাইপের এবং পরিচিত গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকে । সেই ভাইয়ের কাছেই শব্দটার অর্থ শিখেছিলাম । শব্দ এবং তার অর্থ বলার আগে শানেনুজুলটা বলে নেই ।
যতদূর মনে পরে রোজার ঈদের পরের দিনের ঘটনা । রাস্তা দিয়ে হাটার জন্য দুই ভাই বের হয়েছি । হাঁটতে হাঁটতে পাশের গ্রামে চলে গিয়েছিলাম । গ্রামের নাম পুরান বেড়া । তবে গ্রামের বেশির ভাগ লোকই বেশ অবস্থাসমপন্ন । হঠাত ঝগড়ার আওয়াজ । গ্রামের ঝগড়া, বুঝতেই পারছেন কি অবস্থা । ঝগড়াতে মাঝে মাঝে এমন সব গালি ব্যবহার করা হচ্ছিল যে কানও শুনতে লজ্জা পাচ্ছিল । সেই ঝগড়ায় অনেকগুল গালির একটি ছিল চুতমারানি । আমাদের ওই দিককার মানে সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের খুবই জনপ্রিয় একটি গালি । এর অর্থ আমি জানি না । যারা গালিটা দেয় তারাও জানে কি না সন্দেহ । যাই হোক আসল কথায় ফিরি । গালিটা কানে আসতেই আমার হুজুর ভাই বললেন ‘তরুণ তুই কি জানিস চুতমারানি ফার্সি শব্দ’ ।আমি বললাম ‘না ভাই আমি কোন ফার্সি শব্দই জানি না । চুতমারানি যদি আসলেই ফার্সি শব্দ হয় তাহলে এটাই প্রথম এবং একমাত্র শেখা ফার্সি শব্দ’ । ভাই একটু সিরিয়াস হয়ে বললেন আমি ইয়ার্কি মারতেছিনা । এটা আসলেই ফার্সি শব্দ এবং এর অর্থ খুব সুন্দর । টাসকি খেয়ে গেলাম ।
এবার আপনি একটা দৃশ্য কল্পনা করেন । ধরেন রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন । হঠাত আপনার সামনে একজন সুন্দর স্মার্ট যুবতী পড়ল । আপনার মনে খায়েশ জাগল ফার্সি বয়ানে তার রূপের প্রশংসা করবেন । ফার্সি চুতমারানিতে প্রভাবিত হয়ে আপনি তাকে বললেন ‘আপু আপনি চুতমারানি বা আপনাকে চুতমারানি লাগছে’, তাহলে কি অবস্থা হবে, কল্পনা করতে পেরেছেন? ফার্সিতে বুঝতে গেলে আপনি তার রূপের প্রশংসা করছেন । আর বাংলাতে ভয়ানক গালি । কথাটা বলতে না যতোটুকু সময় লাগবে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বেগে মেয়েটির পায়ের জুতা হাতে উঠে সেখান থেকে আপনার গালে পতিত হবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে । অথবা অফিসে আপনার বস কে একটু হাওয়া দিতে গিয়ে বললেন ‘স্যার আপনাকে চুতমারানি লাগছে’ মানে সুন্দর লাগছে । ব্যাস, হয়ে গেলো । দিতে যাবেন হাওয়া খেয়ে আসবেন ব্যাম্ব । আপনার ক্যারিয়ার পুরো বাঁশঝাড় । তার মাথার উপরে চাঁদের বদলে সর্ষে ফুল দুলবে । সুতরাং সাবধান ।
এবার ফাজিল শব্দটায় আসেন । মাদ্রাসায় যারা লেখাপড়া করেন ফাজিল শব্দটা তাদের কাছে লোভনীয় একটা ব্যাপার । মাদ্রাসায় যারা লেখাপড়া করেন তারা সবাই ফাজিল হতে চান । মাদ্রাসায় ফাজিল পাস মানে অনার্স পাস করা । ফাজিল আরবি শব্দ যার অর্থ উত্তম । তাহলে ফাজিল হওয়া মানে উত্তম হওয়া । এবার অন্য ফাজিল এ আসি । রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন । হাঁটতে হাঁটতে মুরুব্বি টাইপের কারও লুঙ্গি ধরে টান দিলেন । বেচারা লুঙ্গি সমলাতে গিয়ে আপনাকে ধরতে পারল না ঠিক কিন্তু আপনাকে উদ্দেশ্য করে বলল ফাজিল । কিংবা সোনার বাংলা গাইতে গাইতে ‘আমার সোনার বাংলা…..’ অংশটুকু নিচু গলায় গেয়ে কোন মেয়ের দিকে তাকিয়ে ‘আমি তোমায় ভালবাসি...’ অংশটুকু উচু গলায় তাকে উদ্দেশ্য করে ছুঁড়ে দিলেন । মেয়েটিও আপনার দিকে তাকিয়ে ফাজিল শব্দটা ছুঁড়ে দিল । যার অর্থ আদরের ক্ষেত্রে দুষ্টু আর বাঁদরের ক্ষেত্রে বদমাশ গোছের কিছু একটা । আপনই জানেন আপনি তার কাছে দুষ্টু না বদমাশ তবে অর্থের ভিন্নতা এবং প্রয়োগ নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন । অর্থাৎ মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে ফাজিল হলে আপনি উত্তম আর রাস্তায় কোন মেয়ে দ্বারা ফাজিল পদবী লাভ করলে আপনি দুষ্টু অথবা অধম । তবে ফাজিল শব্দটা যেখানে যেভাবেই ব্যবহৃত হোক না কেন ভুলেও মানপত্র, অভিনন্দন পত্র কিংবা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় ব্যবহার করবেন না কিন্তু । কারন এসব ক্ষেত্রে হে মহান, হে দার্শনিক, হে অমুক, হে তমুক ইত্যাদি বলা বা লেখা হয় । আপনি কোথাও লিখে বা বলে দিলেন হে ফাজিল, হে অমুক, হে তমুক, শুনবে কিন্তু ঐ হে ফাজিলটুকু । নিরীহ কেউ হলে বেঁচে যাবেন । ক্ষমতাধর দাদা টাইপের কেউ হলে কিন্তু রক্ষা নেই । সেক্ষেত্রে পেছনে বাঁশ, বগলে ইতিহাস আর হাতে হ্যারিকেন ।
আমরা যারা ইংলিশ মারপিটের মুভি দেখি তাদের কাছে ‘কাউবয়’ শব্দটা খুব পরিচিত । সাধারানত বন্দুক চালানোয় পারদর্শী ব্যক্তিকে আগের দিনে কাউবয় বলা হতো এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা হ্যাট পরত । কাউবয় নিয়ে আমার নিজের একটা ঘটনা বলি । চাকরি পাওয়ার পরের ঘটনা । আমার অফিসের একজন সিনিয়র পারসন শখ করে হ্যাট পরে এসেছেন । সবাই তার খুব প্রশংসা করছে এবং তার হাসি দেখে বোঝা যাচ্ছিল প্রশংসা শুনে উনি খুব খুশি । আমি তার খুশিকে আরেকটু বেশি উসকে দিতে বললাম স্যার, আপনাকে কাউবয় কাউবয় লাগছে । আমার প্রশংসা বাক্য শোনার সাথে সাথে স্যরের হাসিমাখা মুখটা নিম পাতার রস খেলে মানুষের মুখ যেমন হয় তেমন হয়ে গেলো । বুঝলাম কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে । উনি তখন কিছু বললেন না । লাঞ্চের পর একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে বললেন আচ্ছা হ্যাট পরে কি আমাকে গরুর রাখালের মত লাগছিল । বললাম না তো স্যার । স্যার বললেন তবে যে সকালে বললে আমাকে কাউবয় কাউবয় লাগছে । ল্যাও ঠ্যলা সামলাও । অবশ্য সে যাত্রায় জোড়াতালি দিয়ে রক্ষা পেয়েছিলেম । কাউবয় গালি না হলেও ইংলিশ মুভির কল্যানে অনেক গালিই বাঙালি যুবসমাজ রপ্ত করেছে । তার মধ্যে শিট, হলি শিট, বুলশিট, হলি কাউ (মানে জানি না গালিও হতে পারে নাও পারে) এর পাশাপাশি আরও কিছু আছে যেগুলো না লেখাই শ্রেয় । হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ে জেনেছি শিট মানে পায়খানা শ্রেণীর কিছু একটা । তাহলে বুলশিট মানে ষাঁড়ের পায়খানা আর হলিশিট মানে পবিত্র পায়খানা ।
এইরকম বাংলা, ইংরেজি, উর্দু , ফার্সি, আরবি, হিন্দি, বোধগম্য, অবোধ্য, দুর্বোধ্য বহুত কিসিমের গালি দিয়ে বাঙালির স্টক টইটুম্বুর । আমরা এতটাই গালি প্রিয় জাতি যে, দৈনন্দিন কথাবার্তায়, চলাফেরায়, বন্ধুদের আড্ডায়, ঝগড়ায়, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এমনকি আদর করে ডাকার ক্ষেত্রেও অনেক সময় গালি ব্যবহার করি । গালি আমাদের জীবনের এতটাই অপরিহার্য অংশ যে, আমাদের সংসদ ভবনেও মাঝে মাঝে গালাগালির প্র্যাকটিস চলে এবং এর কল্যাণেই চুদুরবুদুর, চোদনা ইত্যাদি আদি জনপ্রিয় শব্দ নতুন করে জনপ্রিয়তা পেয়েছে । শেষ করছি তবে শেষ করার আগে, বাঙালিকে গালাগালি পরিহার করতে বলছি না । কারন সেটা অসম্ভব একটা ব্যাপার । শুধু এটুকু বলতে চাই, স্থান, কাল, পাত্রভেদে গালির ব্যবহারটা ভেবে দেখা বাঞ্ছনীয় ।
জয় তু বাংলা গালি।
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেয়ালের ছবি আর বই এর পাতায় আধিপত্য দেখে ! অথচ বন্দর আর কড়িডোরের অসম চুক্তিতে সব শিয়ালের এক রা॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:১২


দেশ বিক্রির পরীক্ষিত ঠিকাদার....



দেয়ালের ছবি দেখলেই ভারতীয় আধিপত্য, আর বন্দর বেচে দিলে নীরবতা কেন?

দেয়ালে একটা ছবি আঁকা দেখলেই যাদের মুখে ফেনা উঠে যায় - "বাংলাদেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন সেনা কর্মকর্তা কর্মকর্তার মেজর নিদাল্ল হাসানের মৃত্যুদণ্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



নিদাল হাসান (পুরো নাম: নিদাল মালিক হাসান) হলেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক মেজর এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist)।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে সংগঠিত এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

×