
ইয়ারমুকের যুদ্ধের ইতিহাস ৩য় পর্ব
ইয়ারমুকের যুদ্ধের ইতিহাস ২য় পর্ব
ইয়ারমুকের যুদ্ধের ইতিহাস ( প্রথম পর্ব)
বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীতে উত্তেজনা
খালিদ অধিকৃত এলাকা থেকে সেনা ফিরিয়ে এনে এক জায়গায় জড়ো করার কারণে বাইজেন্টাইনরা তাদের পাঁচটি বাহিনীকে নিয়োজিত করতে বাধ্য হয়। কয়েক শতাব্দী ধরে বাইজেন্টাইনরা বৃহদাকার চূড়ান্ত যুদ্ধ এড়িয়ে চলছিল। তাদের বাহিনীর এক স্থানে জড়ো হওয়ার ফলে প্রয়োজনীয় কৌশলগত পদক্ষেপের জন্য তারা ভালোভাবে তৈরী ছিল না। সবচেয়ে কাছের কৌশলগত ঘাঁটি ছিল দামেস্ক। কিন্তু দামেস্কের নেতা মনসুর ইয়ারমুকের সমভূমিতে জড়ো হওয়া বাইজেন্টাইন বাহিনীকে প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করতে পারেননি। গ্রীষ্ম শেষ হয়ে আসছিল এবং পশুর চারণভূমি কমে আসার ফলে স্থানীয় নাগরিকদের সাথে রসদ সরবরাহ নিয়ে কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। গ্রীক সূত্রে ভাহানের বিরুদ্ধে আরবদের সাথে বৃহদাকার লড়াইয়ে না নামার জন্য হেরাক্লিয়াসের যে আদেশ ছিল তা অমান্য করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে মুসলিম বাহিনী ইয়ারমুকে জমায়েত হওয়ার কারণে ভাহানের অন্য উপায় ছিল না। বাইজেন্টাইন কমান্ডারদের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থা ছিল। ট্রাইথিরিয়াস এবং ভাহান, জারাজিস ও কানাটিরের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ছিল।খ্রিষ্টান আরব নেতা জাবালাকে বেশ উপেক্ষা করা হয়। গ্রীক, আর্মেনীয় এবং আরবদের মধ্যে এই অবিশ্বাসপূর্ণ অবস্থা বজায় ছিল। মনোফিসাইট ও ক্যালকেডনিয়ানদের মধ্যে যাজকীয় শত্রুতাও অবস্থার উপর প্রভাব ফেলেছে। এসকল শত্রুতার কারণে সমন্বয় এবং পরিকল্পনার অভাব সৃষ্টি হয় যা বাইজেন্টাইন পরাজয়ের অন্যতম কারন।
যুদ্ধ
যুদ্ধক্ষেত্র চারভাগে বিভক্ত ছিল, বাম ভাগ, মধ্যবাম ভাগ, মধ্যডান ভাগ এবং ডান ভাগ। দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেয় ফলে মুসলিমদের ডান ভাগ বাইজেন্টাইনদের বাম ভাগের মুখোমুখি ছিল।ভাহানকে হেরাক্লিয়াসের তরফ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যাতে কূটনৈতিক তৎপরতা শেষ হওয়া অবধি যুদ্ধ শুরু করা না হয়। ইরাকে তৃতীয় ইয়াজদিগার্দের সেনারা আক্রমণ শুরু করতে তখনো প্রস্তুত ছিল না বলে এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল হতে পারে। ভাহান প্রথমে গ্রেগরি এবং পরে জাবালাকে আলোচনা করতে পাঠান। তবে আলোচনা সফল হয়নি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ভাহানের আমন্ত্রণে খালিদ আলোচনা করার জন্য এসেছিলেন। তবে এক্ষেত্রেও কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। আলোচনার ফলে যুদ্ধ এক মাস পিছিয়ে যায়। অন্যদিকে খলিফা উমর পারস্যে অবস্থানরত সেনাপতি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে পার্সিয়ানদের সাথে আলোচনায় বসার নির্দেশ দেন এবং সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদিগার্দ এবং তার কমান্ডার রুস্তম ফারুখজাদ উভয়ের কাছে দূত পাঠান। ধারণা করা হয় যে তিনি সময় বৃদ্ধির জন্য এই কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন। ইতিমধ্যে তিনি ৬০০০ ইয়েমেনি সৈনিকের একটি বাহিনী খালিদের কাছে সাহায্য হিসেবে পাঠান। এই বাহিনীতে ১,০০০ জন সাহাবি ছিলেন। এসকল সাহাবিদের মধ্যে ১০০ জন বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে উচ্চশ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ যেমন জুবায়ের ইবনুল আওয়াম, আবু সুফিয়ান ও তার স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা ছিলেন।বাইজেন্টাইনদের পরাজিত করার জন্য উমর সেরা মুসলিম সৈনিকদেরকে নিযুক্ত করেছিলেন। মুসলিমদের সৈন্য সরবরাহের কার্যক্রমে বাইজেন্টাইনরা বিচলিত হয়ে উঠে। মুসলিমরা শক্তিশালী হয়ে উঠছে দেখতে পেয়ে বাইজেন্টাইন বাহিনী আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। ইয়ারমুকে পাঠানো সৈনিকরা ছোট ছোট বাহিনীতে ভাগ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে আসে ফলে প্রতিপক্ষের মধ্যে ক্রমাগত সৈনিক আসার ভীতি জন্ম নেয় এবং আক্রমণে বাধ্য করে। কাদিসিয়ার যুদ্ধেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হয়।

কাদিসিয়ার যুদ্ধ ৬৩৬ সালে রাশিদুন খিলাফত এবং সাসানীয় সাম্রাজ্যের মধ্যে সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধ মুসলিমদের পারস্য বিজয়ের অংশ এবং ইসলামি সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির প্রথম যুগে তা সংঘটিত হয়েছিল। বলা হয় যে সেই যুদ্ধের সময় বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস মিত্রতার প্রতীক স্বরূপ তার নাতনি মানইয়ানহকে সাসানীয় সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদগিরদের সাথে বিয়ে দেন।
৬৩৬ সালের ১৫ই আগস্ট প্রথমদিনের যুদ্ধ শুরু হয়। ভোরে এক মাইলের কম দূরত্বে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। বাইজেন্টাইন বাহিনীর ডান ভাগের একজন কমান্ডার জর্জ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে মুসলিমদের নিকটে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং মুসলিম পক্ষে যুদ্ধ করে নিহত হন বলে মুসলিম বিবরণগুলোতে উল্লেখ রয়েছে। মুসলিম মুবারিজুনদের সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য বাইজেন্টাইন বাহিনীর দ্বন্দ্বযোদ্ধাদের প্রেরণের মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হয়। মুবারিজুনরা ছিল বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত তলোয়ার এবং বর্শাধারী সৈনিক। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের কমান্ডারদের হত্যা করে প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙে দেয়া তাদের দায়িত্ব ছিল। দ্বন্দ্বযুদ্ধে কয়েকজন কমান্ডার নিহত হওয়ার পর দুপুরে ভাহান তার পদাতিক বাহিনীর এক তৃতীয়াংশকে পাঠান যাতে মুসলিম বাহিনীর শক্তি এবং কৌশল জানা সম্ভব হয়। সৈন্যসংখ্যা ও উন্নত অস্ত্রের কারণে তারা মুসলিম সেনা বিন্যাসের দুর্বল স্থানগুলো ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়। তবে বাইজেন্টাইন আক্রমণে লক্ষ্যের অভাব ছিল। রাজকীয় বাহিনীর অধিকাংশ সৈনিক মুসলিমদের বিরুদ্ধে সফল হতে পারেনি। কিছু ক্ষেত্রে তীব্র হলেও লড়াই মধ্যমরকমভাবে চলছিল। ভাহান রিজার্ভ হিসেবে রাখা তার দুই তৃতীয়াংশ পদাতিকদের যুদ্ধে পাঠাননি। সূর্যাস্তের পর দুই বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে নিজ নিজ ক্যাম্পে ফিরে আসে ।

যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন
প্রথম পর্যায় ১৬ই আগস্ট ভাহান একটি যুদ্ধসভায় ভোরের ঠিক পূর্বে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন যাতে মুসলিমদের ফজরের নামাজের সময় অপ্রস্তুত অবস্থায় তাদের আক্রমণ করা যায়। তিনি তার বাহিনীর মধ্যভাগের দুইটি অংশকে মুসলিমদের মধ্যভাগের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন যাতে তাদের এদিকে নিয়োজিত রেখে মুসলিমদের পার্শ্বভাগের বিরুদ্ধে মূল আক্রমণ চালানো যায়। এভাবে মুসলিমদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বের করে দেয়া বা মধ্যভাগের দিকে কোণঠাসা করে ফেলার পরিকল্পনা ছিল। যুদ্ধক্ষেত্র পর্যবেক্ষণের জন্য ভাহান আর্মেনীয় দেহরক্ষী দলের সাথে ডান ভাগে নির্মিত একটি প্যাভেলিয়নে অবস্থান নেন। তিনি আচমকা আক্রমণের জন্য বাহিনীকে প্রস্তুত হতে বলেন। বাইজেন্টাইনদের অজান্তে খালিদ আচমকা আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য রাতের বেলা সামনের দিকে সেনা মোতায়েন করেছিলেন। ফলে মুসলিমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় পায়। বাইজেন্টাইনরা মধ্যভাগের আক্রমণে সফল হতে পারেনি। ফলে মধ্যভাগ সুরক্ষিত থাকে। তবে পার্শ্বভাগে অবস্থা ভিন্ন রকম ছিল। স্লাভদের নিয়ে গঠিত বাইজেন্টাইন বাম পার্শ্বের কমান্ডার কানাটির আক্রমণ করার পর মুসলিমদের ডান ভাগ পিছু হটতে বাধ্য হয়। মুসলিমদের ডান ভাগের কমান্ডার আমর ইবনুল আস তার অশ্বারোহী সৈনিকদের পাল্টা আক্রমণের নির্দেশ দেন ফলে বাইজেন্টাইনদের আক্রমণকে প্রতিহত করে কিছু সময় অবস্থা স্থিতিশীল করে তোলা সম্ভব হয়। তবে বাইজেন্টাইনদের সংখ্যাধিক্যের কারণে মুসলিমদেরকে পিছু হটতে হয়।
দ্বিতীয় পর্যায়ঃ পার্শ্বভাগের অবস্থা বিবেচনা করে খালিদ ডান ভাগের অশ্বারোহীদেরকে বাইজেন্টাইন বাম ভাগের উত্তর অংশকে আক্রমণের নির্দেশ দেন এবং নিজে বাম ভাগের দক্ষিণ অংশের উপর তার মোবাইল গার্ডদের নিয়ে আক্রমণ চালান সেসময় মুসলিমদের ডান ভাগের পদাতিকরা সামনের দিক থেকে আক্রমণ চালায়। সেসকল সমন্বিত আক্রমণের ফলে বাইজেন্টাইনদের বাম ভাগ পিছু হটে এবং আমর পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্বের অবস্থান ফিরে পান। মুসলিমদের বাম ভাগের নেতৃত্বে ছিলেন ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান। এই অংশের অবস্থা আরো খারাপ ছিল। ডান ভাগ মোবাইল গার্ডের সহায়তা পেলেও বাম ভাগ সহায়তা পায়নি এবং বাইজেন্টাইনদের সংখ্যাধিক্যের ফলে মুসলিমদের অবস্থা সংকটজনক হয়ে উঠে এবং সৈনিকদের পিছু হটতে হয়।সেই স্থানে বাইজেন্টাইনরা সৈনিকদের সারি ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়। গ্রেগরির প্রয়োগ করা টেসটুডো ফর্মেশন ধীরে কাজ করলেও প্রতিরক্ষায় ভালো কাজ দেয়। ইয়াজিদ তার অশ্বারোহীদেরকে আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যবহার করেন। সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার পরও ইয়াজিদের সৈনিকরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ফলে কিছু সময়ের জন্য ভাহানের পরিকল্পনা সফল হয়। মুসলিমদের মধ্যভাগ অবরুদ্ধ হয় এবং পার্শ্বভাগ পিছু হটে। তবে ক্ষতি করা গেলেও উভয় পার্শ্ব ভেঙে ফেলা সম্ভব হয়নি। পিছু হটতে থাকা মুসলিমরা শিবিরে ফেরার সময় রাগান্বিত মুসলিম মহিলাদের সম্মুখীন হয়। হিন্দ বিনতে উতবা তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তারা তাবুর খুটি তুলে নিয়ে পুরুষদের যুদ্ধে যেতে বাধ্য করেন। এসময় তারা উহুদের যুদ্ধের সময় মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহার গাওয়া একটি গান আবৃত্তি করেছিলেন।
তোমরা যারা সৎ নারীর কাছ থেকে পালাও
যার সৌন্দর্য ও গুণ দুটিই আছে;
এবং তাকে কাফিরদের কাছে ছেড়ে দাও,
ঘৃণ্য ও খারাপ কাফিরগণ,
অধিকার, অপমান ও ধ্বংসের জন্য।
তার ফলে পিছু হটতে থাকা মুসলিমদের মনোবল বৃদ্ধি পায় এবং তারা পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসে।
তৃতীয় পর্যায়ঃ ডান ভাগের অবস্থান সংহত করার পর খালিদ মোবাইল গার্ডদের বাম ভাগের উপর নজর দেয়ার নির্দেশ দেন। তিনি দিরার ইবনুল আজওয়ারের অধীনে একটি বাহিনী পাঠান এবং তাকে বাইজেন্টাইন মধ্যবাম ভাগে দাইরজানের অংশের সামনে থেকে আক্রমণ করার নির্দেশ দেন। বাকি অশ্বারোহীদের নিয়ে তিনি গ্রেগরির অংশকে আক্রমণ চালান। এখানে অগ্র এবং পার্শ্বভাগ থেকে ক্রমাগত আক্রমণের জন্য বাইজেন্টাইনরা পিছু হটে। কিন্তু ফর্মেশন রক্ষা করার জন্য তাদের ধীরে পিছু হটতে হয়। সূর্যাস্তের পর উভয় বাহিনী নিজেদের মূল অবস্থানে ফিরে যায়। দাইরজানের মৃত্যু ও ভাহানের যুদ্ধ পরিকল্পনার ব্যর্থতার ফলে বাইজেন্টাইন বাহিনীর মনোবল তুলনামূলকভাবে হ্রাস পায়। অন্যদিকে সংখ্যা স্বল্পতা সত্ত্বেও খালিদের সফল আক্রমণের ফলে মুসলিমদের মনোবল বৃদ্ধি পায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

