
জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমির জীবনী
জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমি অথবা জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ বালখী, মাওলানা রুমি বা মৌলভি রুমি নামেও অনেকের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে আছেন। তবে শুধু মাত্র রুমি নামেই বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। রুমি ছিলেন ১৩ শতকের একজন ফার্সি সুন্নি মুসলিম কবি, আইনজ্ঞ, ইসলামি ব্যক্তিত্ব, ধর্মতাত্ত্বিক, অতীন্দ্রিবাদী এবং সুফী।রুমির প্রভাব দেশের সীমানা এবং জাতিগত পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে পড়েছে; ফার্সি, তাজাকিস্তানী, তুর্কি, গ্রীক, পাস্তুন, মধ্য এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলামানরা গত সাত দশক ধরে বেশ ভালভাবেই তার আধ্যাত্নিক উত্তরাধিকারকে যথাযথভাবে সমাদৃত করে আসছে।তার কবিতা সারাবিশ্বে ব্যাপকভাবে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বিভিন্ন শ্রেণীতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। রুমিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি এবং বেস্ট সেলিং পয়েট বলা হয়।রুমির সাহিত্যকর্ম বেশিরভাগই ফার্সি ভাষায় রচিত হলেও তিনি অনেক স্তবক তুর্কি, আরবি এবং গ্রীক ভাষায়ও রচনা করেছেন। তার লেখা মসনবী কে ফার্সি ভাষায় লেখা সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ হিসাবে তুলনা করা হয়।ইরান সাম্রাজ্য এবং বিশ্বের ফার্সি ভাষার লোকেরা এখনও তার লেখাগুলো মূল ভাষায় ব্যাপকভাবে পড়ে থাকে।অনুবাদসমূহও খুব জনপ্রিয় বিশেষ করে তুরস্ক, আজারবাইজান, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ এশিয়ায়। তার কবিতা ফার্সি সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে, শুধু তাই নয় তুর্কি সাহিত্য, উসমানীয় তুর্কি সাহিত্য, আজারবাইজান সাহিত্য, পাঞ্জাবের কবিতা, হিন্দী সাহিত্য, উর্দু সাহিত্যকেও অনেক প্রভাবিত করেছে। এছাড়াও অন্যান্য ভাষার সাহিত্য যেমন তুর্কীয়, ইরানী, ইন্দো-আর্য, চাগাতাই, পাশতো এবং বাংলা সাহিত্য এবং বাংলাকে প্রভাবিত করেছে।


রুমির পিতা বাহা উদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন বালখ এর একজন ধর্মতাত্ত্বিক, আইনজ্ঞ, এবং একজন অতীন্দ্রিবাদী। যিনি রুমি এর অনুসারীদের কাছে সুলতান আল-উলামা” নামে পরিচিত। সবচেয়ে জনপ্রিয় জীবনিগ্রন্থ লেখকদের মতে তিনি ছিলেন খলীফা আবু বক্কর (সাঃ)এর বংশদর, যদিও আধুনিক গবেষক-পণ্ডিতরা সেটি প্রত্যাখ্যান করেছেন।আর মায়ের দিক থেকে খোয়ারিজমীয় বংশদর দাবি করা হয়েছিল রাজবংশের সাথে যুক্ত করার জন্য কিন্তু এ দাবিও প্রত্যাখ্যান করা হয় কালক্রমিক এবং ঐতিহাসিক কারণে.সবচেয়ে সম্পূর্ণ বংশতালিকা করা হয়েছে তার পরবিরারে যা ছয় থেকে সাত প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ও যুক্ত হয়েছে হানিফাদের সাথে। তবে বাহা উদ্দিন এর মায়ের দিক থেকে নামের উৎস জানা যায়নি, কিন্তু শুধুমাত্র তিনি তাকে “মামি”শব্দে ফার্সি ভাষায় মা এর চলিতরূপ বলে উল্লেখ করেছেন এবং তিনি ছিলেন খুবই সাধারণ একজন মহিলা । রুমির মা ছিলেন মুইমিনা খাতুন। তার পারিবারিক কাজ ছিল কয়েক প্রজন্ম ধরে ইসলাম ধর্মের হানাফী মাজহাবের প্রচারণা করা এবং পরিবারের এই ঐতিহ্যকে রুমি এবং সুলতান ওয়ালাদ অব্যাহত রেখেছিলেন। যখন মঙ্গোলরা মধ্য এশিয়া দ্বারা আক্রান্ত ১২১৫ এবং ১২২০ সাল এর মধ্যে, বাহা উদ্দিন ওয়ালাদ তার পুরো পরিবার এবং একদল শিষ্য সহ পশ্চিমাভিমুখে রওনা হন। ঐতিহাসিকদের মতে যেটি রুমির শিষ্যদের দ্বারা একমত না, রুমির সাথে তখন পরাসীর সবচেয়ে জনপ্রিয় রহস্য কবি আত্তার এর দেখা হয় ইরানিয়ান শহরের নিশাপুরে। আত্তার রুমিকে দেখার সাথেসাথেই রুমির আধ্যাত্নিক বৈশিষ্ট চিনতে পেরেছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন রুমি তার পিতার পিছনে হেঁটে যাচ্ছেন এবং বললেন, একটি হ্রদের পিছনে একটি সমুদ্র যাচ্ছে”। তিনি বালককে একটি বই প্রদান করলেন “আসরারনামা” নামে যেটিতে ইহজগতে আত্নার সম্পর্কে লেখাছিল। সেই সাক্ষাতটি আঠার বছরের রুমির উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং পরবর্তিতে তার কাজের উৎসাহ হিসাবে কাজ করেছিল। নিশাপুর থেকে ওয়ালাদ এবং তার লোকজন বাগদাদ এর দিকে রওনা হন এবং অনেক পণ্ডিত ও সূফীদের সাথে সাক্ষাত করেন।বাগদাদ থেকে হজ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং তারা মক্কায় হজ্জ পালন করেন। তারপর অভিযাত্রী কাফেলার দলটি দামেস্ক,মালাত্যেয়া, এরজিকান,শিবাস,কায়সেরি এবং নিগদি পাড়ি দেন। এরপর তারা কারামান এ সাত বছর থাকেন। রুমির মা এবং ভাই উভয়েই সেখানে মারা যায়। ১২২৫ সালে,কারামানে রুমি বিবাহ করেন গওহর খাতুন কে। তাদের দুটো ছেলেঃ সুলতাম ওয়ালাদ এবং আলাউদ্দিন চালাবীর জন্ম হয়। যখন তার স্ত্রী মারা যান রুমি পুনরায় বিবাহ করেন এবং তার সে সংসারে এক ছেলে আমির আলিম চালাবী ও এক মেয়ে মালাখী খাতুনের জন্ম হয়। ১২২৮ সালের ১ই মে, আনাতোলিয়া শাসক আলাউদ্দিন কায়কোবাদ তাদেরকে আমন্ত্রণ জানান, বাহা উদ্দিন আনাতোলিয়া আসেন এবং আনাতোলিয়া এর কোনিয়াতে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন যেটি রুম সালাতানাত এর পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত।বাহা উদ্দিন মাদ্রাসা এর প্রধান শিক্ষক হন এবং যখন তিনি মারা যান তখন রুমির বয়স পঁচিশ বছর চলছিল, উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি তার পিতার পদ পান একজন ইসলামিক মৌলভি হিসাবে। বাহা উদ্দিন এর একজন ছাত্র, সৈয়দ বুরহান উদ্দিন মোহাক্কিক তীরমিযি, রুমিকে শরীয়াহ এবং তরীকা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে থাকেন বিশেষ করে তার পিতার দিকগুলো। নয় বছর ধরে তিনি সূফীবাদ শিক্ষা গ্রহণ করেন । তারপর রুমির জনজীবন শুরু হয়ঃ তিনি একজন ইসলামী ফকিহ বা আইনজ্ঞ হন, ফতওয়া প্রকাশ করেন এবং কোনিয়ার মসজিদে নৈতিকতা বক্তৃতা দিতে থাকেন। তিনি মাদ্রাসাতে একজন মৌলভি হিসাবে কাজ করেন এবং তাঁর অনুগামীদের শিক্ষা দেন। এই সময়কালে রুমি দামেস্ক ভ্রমণ করেন এবং বলা হয়ে থাকে তিনি সেখানে চার বছর অতিবাহিত করেন। দরবেশ শামস তাবরিজি,র সাথে সাক্ষাৎ হয় ১২৪৪ সালের ১৫ই নবেম্ভর যেটি তার জীবন সম্পূর্ণরুপে বদলে দেয়। একজন সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষক এবং আইনজ্ঞ থেকে রুমি একজন সাধুতে রূপান্তরিত হন। শামস মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র ভ্রমণ করেন এবং একজনকে খুঁজেন আর বলেন কে আমার সঙ্গ সহ্য করিবে। একটি কন্ঠ তাকে বলিল, “বিনিময়ে তুমি কি দিবে?” শামস উত্তর দিলেন, “আমার শির!!” কন্ঠটি আবার বলল, “তাহলে তুমি যাকে খুঁজছ সে কোনিয়ার জালাল উদ্দিন”। ১২৪৮ সালের ৫ই ডিসেম্বর রাতে রুমি এবং শামস কথা বলছিলেন, এমন সময় কেউ শামসকে পিছনের দরজায় ডাকে। তিনি বের হয়ে যান এবং এরপর আর কোথাও কখনো দেখা যায়নি। গুজব শোনা যায় যে রুমির পুত্র আলাউদ্দিন এর মৌনসম্মতিতে শামসকে হত্যা করা হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


