somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিমল মিত্রের 'কড়ি দিয়ে কিনলাম' - এর দিপু কি কখনও তার কাঙ্ক্ষিত মানুষ খুঁজে পাবে?

১৭ ই মে, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অঘোর ভট্টাচার্য বা অঘোর দাদু ছিলেন বড্ড কৃপণ। পেশায় পণ্ডিত, ঘরে ঘরে পূজা দিতেন, যা পেতেন – টাকা-পয়সা- সোনার মোহর সবই রেখে দিতেন সিন্দুকে, এমনকি খাওয়ার পানটিও। আর তিনি প্রায় বলতেন, কড়ি দিয়ে সব কেনা যায়। বুঝতে পারতো না ছোট্ট দীপু। জীবনের বাঁকে বাঁকে চলতে চলতে শিখতে থাকে অনেক কিছু। মেশে অনেকের সাথে। ভাবতে থাকে - সত্যি কি কড়ি দিয়ে সব কেনা যায়? যদি কড়ি দিয়েই সব কেনা যায়, তাহলে মনুষ্যত্ব জিনিসটি কী? সেটাও কি কড়ি দিয়ে কেনা যায়?


বিমল মিত্রের এক অনন্য সৃষ্টি ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’। এই উপন্যাসের প্রতিটি পাতায় রয়েছে জীবনের চরম প্রতিচ্ছবি। দীপঙ্কর এই উপন্যাসের মূল চরিত্র হলেও সতী, লক্ষ্মী, অঘোর ভট্টাচার্য, ছিটে, ফোঁটাসহ অসংখ্য চরিত্র ও বিংশশতাব্দীর সময়কালকে কেন্দ্র করে মূল কাহিনীকে নিয়ে গেছে একটি অন্যরকম মাত্রায়। এই উপন্যাস লিখে লেখক যেন নিজ হাতে রামায়ণ লেখার ইচ্ছাটা পূরণ করেছেন। এটি দুই খণ্ডের বিশাল উপন্যাস । আর সেই দুখণ্ড মিলে কমপক্ষে পনেরশ পৃষ্ঠাতো হবেই। লেখাগুলোও ছোট – কিন্তু পাঠক পড়ার সময় মোটেও অধিক পৃষ্ঠার ক্লান্তি অনুভব করবেন না, বরং উপভোগ করতে থাকবেন পরতে পরতে নানান পটভূমি।

দিপুর বাবা ছিল না। বাবা ডাকাতের হাতে মারা যাওয়ার পর থেকেই মা-সহ অঘোর দাদুর বাড়িতে আশ্রিত হয়ে থাকতো। মা সেই বাড়িতে রান্না ও ঘরসংসারের কাজ করতো। অঘোর দাদু তাঁর নিজের নাতী ছিটে ও ফোঁটাকে আশ্রয় দিত না, তারা বাড়িতে এসেছে বুঝতে পারলে লাঠি নিয়ে তাদের তাড়া করতো। তবুও তারা ওই বুড়োর অগোচরে দিপুর মার কাছ থেকে খেয়ে পালিয়ে যেত। তাকে অঘোর দাদু ভালবাসলেও মুখে প্রকাশ করতো না।

এভাবেই তার শৈশব জীবন কেটে যাচ্ছিল এমনসময় তার সমবয়সী সতী ও লক্ষ্মী নামের দুই বোন অঘোর দাদুর বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে আসে। তাদের সাথেই জীবনের অনেকগুলো বছর কেটে যায় অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। সমাজ, রাজনীতি ও দেশের নানান পরিবর্তন, পরিবর্ধন কিংবা প্রতিহিংসাসহ ইতিহাসের বিশ্বযুদ্ধের মতো অনেক ঘটনা ঘটতে থাকে তাকে সাক্ষী রেখে। দিপু আর ছোট্ট দিপু থাকেনা, হয়ে ওঠে মিস্টার দীপঙ্কর সেন। ব্রিটিশ রেল কোম্পানির একজন বড় সাহেব।

নিজ যোগ্যতায় রেল কোম্পানিতে কেরানী থেকে বড় সাহেব পদ পর্যন্ত যাওয়া তার নিজের কাছে কল্পনাই লাগতো। নিজেকে সেই ছোট্ট দিপুই ভাবতো। সে কোনদিন অর্থের অভাবে পড়েনি কিংবা অর্থাভাব তাকে ছুঁতে পারেনি। লক্ষ্মী বয়সে বড় হওয়ায় তাকে লক্ষ্মীদি ডাকতো। আর সতীকে তার প্রাণের চেয়েও বেশি ভাল লাগলেও কখনও বলা হয়নি তার। বলতে পারেনি সে নিজের নিজস্বতাকে বাঁচাতে। মনের কষ্ট সে প্রকাশ করেনি কারো কাছে। তবুও অন্যের উপকার করে গেছে যথাসাধ্য। তবুও যেন তার কাছের মানুষগুলো একসময় ক্রমে ক্রমে দূরে সরে যায়। অর্থাভাব না থাকলেও মনের দিক থেকে সে একা হয়ে যায়।

‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ উপন্যাসে লেখক সাধারন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। দিপুর চোখেই বর্ণনা করেছেন প্রতিটি মুহূর্ত। বিশ্বযুদ্ধ সমন্ধে সাধারন মানুষ জানতে পারেনি কেন এই যুদ্ধ, কেন এই শত্রুতা। তারা জার্মান দেখেনি, ইটালী দেখেনি, আমেরিকা দেখেনি, জাপানও দেখেনি। তারা বোঝেনি কেন জার্মানী তাদের শত্রু, আবার কেন আমেরিকা তাদের বন্ধু। তারা শুধু দেখেছে, প্রচন্ড দুর্ভিক্ষ, দেখেছে প্রাণঘাতী মৃত্যু। যা কেড়ে নেয় বেঁচে থাকার আশাটুকুও। দিপু ভেবেছে এসবের জন্য দায়ী আমেরিকার ডলার, ইংলন্ডের পাউন্ড, ইটালীর লিরা, জার্মানীর মার্ক, ফ্রান্সের ফ্রাঙ্ক, জাপানের ইয়েন, আর ইন্ডিয়ার টাকা। কিন্তু দিপু অর্থাৎ দীপঙ্করকে কখনও হতাশ হতে দেখা যায়নি।

দীপঙ্কর একসময় সংসার ত্যাগী হয়ে যায়। বলে- ‘আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি। তোমরা মনে করোনা এই এত বড় পৃথিবীতে আমার কোনও আশ্রয় মিলবেনা। পৃথিবী অনেক বড়। তোমরা যত কল্পনা কর তার চেয়েও বড়। আমি একদিন আর এক জায়গা থেকে এখানে এসেছিলাম। আবার এখান থেকেও চলে যাবো। প্রয়োজন হলে পৃথিবীর সব জায়গায় আমি খুঁজবো- দেখবো - কোথায় মানুষ পাই। আমি হতাশ হইনা, হতাশ হবোনা। আমি আশা নিয়ে সারা পৃথিবী খুঁজবো – কোথাও না কোথাও মানুষ পাবোই।

আদিবাসী নেটিভ আমেরিকানদের একটি প্রবাদ অনেকটা এরকম- ‘যখন শেষ গাছটি কেটে ফেলা হবে, যখন শেষ মাছটি খেয়ে ফেলা হবে, যখন শেষ বিন্দু পানিও বিষাক্ত হয়ে যাবে, তখন বুঝবে টাকা খাওয়া যায়না। অর্থাৎ টাকাও মুল্যহীন।’ আসুন টাকা নয়, পৃথিবীতে মানুষকে খুঁজি। তাঁদের সম্মান করি। এটাই মনে শান্তি নিয়ে আসবে। আমি আমার মামির সৌজন্যে বইটি ওনার কাছ থেকে ধার নিয়ে পড়েছিলাম, তাই ওনাকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। উনি না হলে এতো সুন্দর উপন্যাস এতো দিনেও পড়া হতো কিনা সন্দেহ। তবে অনলাইন পাঠকদের জন্য খুশির সংবাদ এই যে, উপন্যাসটির পিডিএফ ফাইল এখন অনেক সাইটেই পাওয়া যায়। একই নামে কলকাতা বাংলার একটা সিনেমাও আছে। তবে উপন্যাসের মতো নিখুঁত নয় - তা হলফ করেই বলা যায়। বড় বড় সমালোচকরাই যেখানে এই উপন্যাসের ভূয়সী প্রশংসা করেন, সেখানে এ উপন্যাস নিয়ে লেখার ক্ষুদ্র প্রয়াস পাঠক মাত্রই আমাকে ক্ষমা সুন্দর চোখে দেখবেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:১১
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

থাক অহমিকায়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৫


তোমার রঙিন আকাশে নেই
যে অমাবস্যার- অন্ধকার
ঝলমল করছে শুধু চাঁদ-
ডুবছ ডুবছ সুখমারী রাত!
উড়ছ শঙ্খচিলের ডানায়;
তোমার আকাশে অমাবস্যা নাই।

আমি মাটি বন্দি হয়েছি
মরার আগেই- মরার আগেই-
স্বপ্ন দেখি শুধু হুতুম পেঁচা হব... ...বাকিটুকু পড়ুন

বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫০



বঙ্গবন্ধু: একটি নাম- যাকে ঘৃণা করার আগে একবার থামুন[

শেখ মুজিব ইতিহাসের খলনায়ক।
জাতীয় বেইমান।
পাকিস্তান ভাঙার অপরাধী।
- এই কথাগুলো আপনি বিশ্বাস করেন?
তাহলে আজ আপনাকে একটা অনুরোধ করব- একবার শুধু থামুন।

রাগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় কন্যা আমার- ৯৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৫

ফারাজা তাবাসসুম খান-
অনেকদিন তোমাকে নিয়ে লিখি না। খুব ব্যস্ত আছি। আমার সব সময় নিয়ে নিচ্ছে অফিস। আমি অফিস থেকে তোমাকে ফোন করলে তুমি কথা বলতে চাও না। আবার আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

Mystic River – জোয়ারে ফিরে আসে সবকিছু

লিখেছেন রাজসোহান, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:৩১



১৯৭৫ সালের বোস্টন। শ্রমজীবী মানুষের সাধারণ পাড়া। রাস্তায় হকি খেলছিল তিনটে বাচ্চা ছেলে। হঠাৎ বল গড়িয়ে পড়ল ড্রেনে। খেলা ওখানেই শেষ। ফুটপাতের একপাশে তখন সদ্য ঢালা ভেজা সিমেন্ট। ছেলেগুলো কাঠি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গোলাপী এখন বাসে ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:২০


দেশে আজ থেকে পিংক বাস সার্ভিস চালু হয়েছে। ঢাকা সহ আরও তিনটি বড় শহরে এই বাস চলবে। খবরটা শুনে মনে হলো, দেশ যেন হঠাৎ করেই এক ধাপ আধুনিক হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×