somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হুইলচেয়ার

১৩ ই জুলাই, ২০১৬ রাত ৯:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি এখন হাসপাতালে । বেডে শুয়ে আছি । বুকের উপর ধবধবে সাদা চাদর । মাথার নিচে শক্ত বালিস।

বালিস এতো শক্ত কেনো ? বালিস হবে নরম, তুলতুলে । শুলেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যাবো । হচ্ছে না । বালিস শক্ত হওয়ায় বারবারই আমি ভেসে উঠছি । ঘুমানো দরকার । ঘুম আনার ছোট্ট একটা ট্রিকস আছে । ভেরা গোনা । হুমায়ূণ স্যারের বইতে পেয়েছি । তবে ভেরা গুনলে আমার ঘুম আসে না । গরু গুনি । সাদা গরু । শিংবিহীন নিরীহ গরু । ঘুমের আগে নিরীহ থাকে । স্বপ্নে এরা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে । প্রায় রাতেই শিংওয়ালা বলদের গুতো খেয়ে জেগে উঠি । এখনও সেটাই চাচ্ছি । শিংওয়ালা একটা বলদ এসে কেবিনে ঢুকুবে । গুতো দেবে । জেগে দেখবো আমি সুস্থ্য । বাসায় বেডের উপর শোয়া । পা দুটোও কাটা না । আগের জাগাতেই আছে ।

একটা দিন আগেও আমি ভার্সিটিতে গেলাম । সে দিনেরই কথা । তিতলীর ঠিক পাশের সিটে বসা । ম্যাচিং করে ব্লাক শার্ট আর তিতলীর ছিলো ব্লাক শাড়ি । ক্লাসে স্যার কি পড়িয়েছেন বলতে পারছি না । তবে তিতলী কবার হেসেছে বলে দিতে পারি । পুরো ক্লাসই হা হয়ে ছিলাম । এতো মায়া কোনো মানবকন্যার থাকতে পারে ? এ উইকেই প্রপোজ করবো ভেবেছি । হলো না । পঙ্গুত্বের সাথে তিতলীকে কেনো জড়াবো ! সেও জড়াবে না । বুদ্ধিমতী মেয়ে । পঙ্গু শুনেই কেটে পরেছে । সবার সাথে একবার দেখতে এসেছে । করুণা ভরা চোখে করুণা ঢেলে গেছে । আর না । এখন সে শুধুই বন্ধু । সেটাই স্বাভাবিক । সবার কাছে ছোটো হবে । ঝগড়ার মাঝে মৌটুসিও বলবে, 'তোর বিএফ তো পঙ্গু, পা নেই' । আমার তিতলীকে কেনো কথা শুনতে হবে ! অসম্ভব ।

রিতিও ফোন দিলো । ঠিক এক বছর দু মাস পর । অনেক্ষণ কথা হলো । বিএফ এর সাথে নাকি ব্রেকআপ হয়েছে । আগেও একবার শুনেছিলাম । পরে শুনি, না । ওটা অভিমান ছিলো । এবারও হয়তো অভিমানই । আমার সাথেও হতো । বড়ো বড়ো অভিমান । অভিমান না থাকলে রিলেশনের মজাটাই মাটি । শেষবার যখন ব্রেকআপ করলো, তখনও জাস্ট অভিমান ভেবেই রিলাক্সে ছিলাম । হঠাৎ তানিয়া একদিন ফোন দিলো, "ভাইয়া, রিতিকে দেখলাম আরেকটা ছেলের সাথে । ব্যাপার কি বলোতো ?" বিশ্বাস হচ্ছিলো না । পরে দেখলাম ঘটনা সত্য । ধানমন্ডি লেকে দেখা হয়ে যায় । পরিচয় করিয়ে দেয় । দেখলেই মনে হয় ছেলে ভালো । যেমন দেখতে, তেমন কোয়ালিটি । আমার থেকে ওই ছেলের সাথেই ওকে বেশি মানিয়েছে । ভেবে দেখেছি ওরও কোনো দোষ নেই । ওমন ছেলে পেয়ে যে হাত ছাড়া করবে, সে একটা আস্ত গাধী । আমার গার্লফ্রেইন্ড কেনো গাধী হতে যাবে !

সেদিন তানিয়াকে বলেছিলাম, ভূল দেখেছো । পরে নিজেকেও বলেছি, ভূল দেখেছো ।

তানিয়া এখন ইউকে তে থাকে । হাসবেন্ড ওখানেই জব করে । অনেকদিনে কথা হয় না । একবার ফোন দিলে কেমন হয় ? পা হাড়িয়েছি জানে না বোধহয় । চমকে দেয়া যাবে ।

রিং বেজেই যাচ্ছে । কেউ ধরছে না । তৃতীয় বারে এক পুরুষ কন্ঠ ধরলো । তার কথার কোনো আগামাথা পাওয়া গেলো না । রেখে দিলাম ।

দুপুরে ছোটো ফুপি এলো । কিছুই বলে নি । স্থির চোখে বসে ছিলো । চোখ বেয়ে টপটপ পানি ঝরছিলো ।
দারোয়ান কাকা এলো । এই লোকও কাঁদছে । এতো কান্নার ভীরে ড্রাইভার সেলিম কিছুটা অপ্রস্তুত । সে কান্নার চেষ্টা করছে । পারছে না । একে দেখে আমার হাসি পেয়ে গেলো । আমারও একবার হয়েছিলো । তখন ক্লাস এইটে পড়ি । কেউ কেউ ভাবে পিচ্চি ছেলে, কেউ ভাবে বুড়ো । দুঃসম্পর্কের এক দাদা মারা গেলেন । দেখতে গেলাম । গিয়ে দেখি সবাই কাঁদছে । সমবয়সী কাজিনরাও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে । লজ্জায় পরে গেলাম । নিজের মধ্যে বিষাদ আনার চেষ্টা করছি । আসছে না । স্মূতিগুলো মনে আনার চেষ্টা করছি । আসছেও । তবে সে জন্য কান্না করার লজিক আসছে না । কি আর করার ! চোখ দুটো ছোটো করে সিলিং এ তাকিয়ে রইলাম । পাঁচ মিনিটেই ফল , এক ফোটা জল ।

আমার রক্তের গ্রুপ এবি পজেটিভ । অনেক রক্ত লেগেছে । ডোনারদের মধ্যে রিমনও ছিলো । ক্লোজ ফ্রেইন্ড না । শুধু ফ্রেইন্ড । শুধু ফ্রেইন্ড না বলে এন্টি ফ্রেইন্ডও বলা যায় । এ ছেলে সব সময় আমার বিপক্ষে থাকে । সব কাজে । এক ধরনের স্নায়ু যুদ্ধ চালায় । আমি পঙ্গু হয়ে গেছি । মনে মনে ওর খুশি হবার কথা । কিন্তু ওকে দেখে মনে হলো কষ্ট পেয়েছে ; করুণা থেকে না, ভালোবাসা থেকেই । চোখ দেখলে বোঝা যায় ।

বরুনা ভাবিও এসেছিলেন । তার পিচ্চি মেয়েটাও ছিলো । রিংকু । দেখতে হুবহু ইংরেজের বাচ্চা । দেখলেই কোলে উঠবে । কোলে উঠে ঘুড়তে যাবে । চাচ্চু বলতে পারে না । ছাছু বলে । আজও কোলে উঠলো । উঠেই গা ছোড়াছুড়ি । থাকবে না । মায়ের কোলে যাবে । পিচ্চিটাও বুঝেছে কোথাও গন্ডগোল আছে । প্রথম বারের মতো নিজেকে অসহায় লাগলো । প্রায় কান্না চলে এসেছিলো ।

ফুল ভলিউমে মিউজিক ছেড়ে ডান্স করতে ইচ্ছে হচ্ছে । উপায় নেই । হাসপাতালে মিউজিকের সিস্টেম নেই । আর খোড়াদের জন্যেতো ডান্স করারও সিস্টেম নেই । হাতের উপর দাড়িয়ে কি ডান্স করা যায় ! যায়না বোধ হয় ।

সিগারেট খাওয়া দরকার । কার কাছে বলবো ? হসপিটালে ধূমপান নিষেধ । এর পরও বাবাকে বললে একটা ব্যাবস্থা করা যেতো । তিনিও যে কই আছেন ! পঙ্গু ছেলের আশেপাশে থাকতে হয় । ভূলে গেছেন ।

পরশুই এখান থেকে মুক্তি পাবো । বাসায় চলে যাবো । মুক্তি, তবে ঠিক মুক্তিও না । পাছার নিচে একটা হুইল চেয়ার থাকবে । এরা আমার পা দুটো নিয়ে নিয়েছে । বদলে একটা হুইল চেয়ার ধরিয়ে দেবে ।

আসলেই আমার পা নেই ! কেমন যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না । স্কুল ফুটবল টিমে ফরোআর্ডে খেলতাম । একবার ডিফেল্ডারের লাথিতে পা ভেঙে গেছিলো । তখনও তেমন কষ্ট লাগে নি । ভাঙে ভাঙুক । আছে তো । আবার জোড়াও লেগে গেলো । মা ছোটোবেলায় নখ কেটে দিতো । চামড়ায় লেগে একবার রক্ত বেড়োলো । আমার সে কি কান্না ! কান্না দেখে মাও কেঁদেছিলো । আজ আমি কাঁদছি না । কাঁদার মাঝে কোনো লজিক নেই । মাও কাঁদছে না । বোবা হয়ে গেছে ।

পা দুটো খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে । ডক্টরকেও বলেছিলাম । কিছু বলে নি । একটা বার শুধু দেখতাম । হাত ছোয়াতাম । ও দুটো তো আমারই পা ।

চোখ বন্ধ করে ফেলেছি । ঘুমিয়ে পরবো । স্বপ্ন দেখবো । স্বপ্নেই মজা । সেখানে আমি হাটতে পারি । দৌড়োতে পারি । ফুটবল মাঠে ফরোআর্ডে দাড়াই । কোনো হুইলচেয়ার লাগে না ।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জুলাই, ২০১৬ রাত ৯:০৬
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আন্দোলনের সময় বেকারদের দরকার ছিল, এখন কি আর নেই?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:২০


সারজিস আলমকে দেখে একসময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে হয়তো সত্যিই নতুন কিছু আসতে যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের আইকনিক মুখ, গর্বিত ঢাবিয়ান, এনসিপির বড় নেতা। শেখ হাসিনার আমলে সকাল বিকাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

প্রশ্নটি এখন আর নিছক কল্পনা নয়।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান Makkah Joint Defence Agreement-এ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা জানেন না তাদের জন্য! কফি এনিমা (Coffee Enema)!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩

কফি এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে কোলন বা বৃহদন্ত্রে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে পেট পরিষ্কার করার একটি বিকল্প পদ্ধতি। নিচে এটি শরীরে দেওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রয়োজনীয় উপকরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিলাদুন্নবী: ভালোবাসার নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিন নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহান আদর্শের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাঁর আগমন ছিল এমন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?
====================
একটি ১১ বছরের শিশু যার বয়স খেলাধুলা, পড়াশোনা আর স্বপ্ন দেখার। সেই শিশুকে যদি যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং তার গর্ভে একটি সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×